
তৃতীয় প্রহরের নারী
আসমা বিনতে মাহবুব
রাত প্রায় তিনটা।ফ্যানটা ক্লান্ত গলায় ডাকছে।সেলাই মেশিনের একঘেয়ে আর্তনাদ।
এত গভীর রাতেও থেমে নেই এক নারী।
জীবনের সাথে লড়ে যে প্রতিদিন নিজেকেই হারিয়ে দিচ্ছে।
আমি তাকে দেখে অবাক হই।মানুষের শরীরেরও তো সীমা আছে, ব্যথারও তো শেষ আছে— সে যেন সব ভুলে গেছে।
স্বামীহারা সংসার, দুই নাড়িছেঁড়া ধনকে একটু সুখ দিতে দিনের পর দিন নিজের সব শখ-আহ্লাদ নিমিষেই কুরবানি দিচ্ছে।এ কোনো গল্পের চরিত্র নয়। সে আমার মজো আপু।যার জীবনের ইতিহাস কলমে ধরা সহজ নয়।
যখন আপুর প্রথম স্বামী মারা যায়
তখন আমার বয়স হয়তো ছয়। মৃত্যু মানে বুঝতাম না।তাই ভাইয়ার মৃত্যুর খবর শুনেও বেদানাহত হলাম না। মেজো আপুর স্বামী সম্পর্কে ফুফাতো ভাই যাকে লালন পালন করেছেন আমার আম্মু। আমাদের পাশেই নতুন ভিটেমাটি নিয়ে ঘর করে আপুর সাথে সংসার পেতেছেন।বিয়ের এক বছরের মাথায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।কোলের ছেলেটার বয়স মাত্র চল্লিশ দিন।চল্লিশ দিনের দিনই বাবা হারা হয়ে গেল।স্বপ্নগুলো নিমিষেই ছাই।
তখন প্রিয়জন হারানোর শূন্যতা মাপার বয়স হয়নি।কিন্তু আপুর বুকের ভেতর সেদিন কেমন ঝড় বয়েছিল।আজও ভাবার সাহস পাই না। ফুপির সাথে আপু কিছুদিন থাকলেও নানান ঝামেলা কারনে
বাচ্চা কোলে আমাদের বাসায়ই ঠাঁই নিলেন।
বাবাহীন সাতজনের সংসারে আরও দুটো পেট যেন পাথরের উপর পাথর।তবুও আম্মু আঁচল পেতে সব আগলে নিলেন।আপু বোঝা হতে চাননি। তাই সেলাই শিখলেন।
দিন-রাত মেশিনের ঘর্ঘর শব্দে নিজের কান্না ডুবিয়ে দিলেন।
কারণ অভাবের কষাঘাতটা তিনি বুঝতেন।
সময়ের পরিক্রমায় ছেলেটা বড় হলো।মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হলো
কিন্তু খরচ? টাকার সংকটটা বুঝতে পেরে আপুর ঘুম হারাম।
ভাইয়া মারা যাওয়ার পর অনেক প্রস্তাব এসেছে। জোর করেও রাজি করানো যায়নি। অনেকে বুঝাতো তোর জীবন পড়ে আছে, বিয়ে করে নে।”_
মা ছাড়া ছেলে নষ্ট হয়ে যায় এটা ভেবে আপু রাজি হতেন না।
কিন্তু ছেলের মাদ্রাসার খরচ, ছেলেকে মানুষ করার চিন্তা—এই একটা বোঝা আপুকে নুইয়ে দিল।
প্রায় ছয় বছর পর রাজি হলেন চার সন্তানের বাবাকে বিয়ে করতে।
উদ্দেশ্য একটাই— ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করবে।
নিজের সুখের জন্য না, ছেলের ভবিষ্যতের জন্য।ঘরোয়া আয়োজনে আপুর বিয়ে হয়ে গেল।
সেদিন আপুর ছয় বছরের অনাথ ছেলের কান্না দেখে সবাই কেঁদেছিল।
বারো বছরের আমি আপুর নতুন শ্বশুরবাড়িতে পা রাখতেই চোখের পানি টলমল করছে । লুকাতে চাইলাম, পারলাম না। সবাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করছিল— “কী হয়েছে তোর?” আমি নিজেও জানতাম না কী হয়েছে।বোঝার মতো বোধ তখনও হয়নি। শুধু ভাগ্নের মলিন মুখটা বারবার চোখের সামনে ভাসছিল। তাই নিজেকে আটকাতে পারিনি।
বিশাল বাড়ি, বড়লোক স্বামী, আপু এবার নিশ্চয়ই অনেক সুখী হবে।
কিন্তু হায়! ক্ষত যার, সে জানে প্রাসাদও শ্মশান।
এক বছর পর আপুর কোলজুড়ে এলো এক কন্যা সন্তান।তাতে কারো কারো মুখ ভার হলো।যদিও আগের ঘরের চার সন্তানের কথায় আপুকে বিয়ে করেছিলেন ভাইয়া তবুও আপুকে তারা আপন ভাবতে পারেনি কোনো কালে।
বাবার ভয়ে নামেমাত্র মান্য করলো।
আপু সব দোষ নিজের কাঁধে নিয়ে সহ্য করে গেলেন।
সৎ মা’র কলঙ্ক মুছতে গিয়ে নিজেকেই মুছে ফেললেন।দুবছর পর আপুর নতুন স্বামী ক্যান্সার নিয়ে ফিরলেন।
আপু নিজের শেষ বিন্দু রক্ত দিয়ে হলেও তাকে বাঁচাতে চাইলেন। কিন্তু আল্লাহর লিলা বুঝা বড় দায়। ভাইয়া ও চলে গেলেন পরপারে।সেবার আপুর চোখে জল দেখিনি। দেখেছি মরুভূমি।
যেখানে জীবনের হিসাব মেলাতে গিয়ে ফল আসে ‘শূন্য’।
তারপর মানুষের মুখোশ খুলে গেল।
“স্বামী খাওয়া নারী”তকমা জুটলো।
অস্ত্র ছাড়াই যে মানুষ খুন করা যায়— সেদিন বুঝলাম। আপুর স্বামীর আগের স্ত্রী যাকে কিনা পরকিয়ার অপরাধে ডিভোর্স দিলো সে এসে চার সন্তানের সাহস নিয়ে শক্তি সঞ্চার করে ঘর দখল করলো।
শেষে সেই বাড়িতেও আপুর ঠাঁই হলো না।
অধিকার থেকেও বঞ্চিত হলেন।জীবনের কি নির্মম পরিহাস?
শৈশবে বাবাহীন বিভীষিকা।
কৈশোরে স্বামীহারা বৈধব্য।
যৌবনে ছেলের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে নিজের জীবনটাই বাজি।এ যেন ধৈর্য্যর পরিক্ষা।
সব হারিয়েও আজো আপু থেমে নেই।
এখনও লড়ছেন। একটু সুখের আশায়।
Reporter Name 




















