
অন্ধকার ভেদ করে
নুসরাত জান্নাত নাজিফা
জীবনের বাঁকে বাঁকে এমন কিছু অধ্যায় লুকিয়ে থাকে, যা একসময় মনে হয় দুঃসহ পর্বতের মতো অনতিক্রম্য; তখন মনে হয়, এখানেই বুঝি জীবনের শেষ রেখা টানা হলো। কিন্তু কালের ব্যবধানে, স্মৃতির আয়নায় যখন সেই দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকাই, তখন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই—ওই কণ্টকাকীর্ণ পথগুলোই ছিল রবের পক্ষ থেকে আমার জন্য সবচেয়ে স্নিগ্ধ নেয়ামত, সবচেয়ে দরদি পরিকল্পনা।
আমার জীবনের উপাখ্যানও ঠিক তেমনই এক বিস্ময়কর আখ্যান। ২০২০ সাল, বুকভরা উচ্ছ্বাস আর চোখজোড়ায় হাজারো রঙিন স্বপ্ন নিয়ে এসএসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫-এর মুকুট মাথায় পরে মহসিন কলেজের প্রাঙ্গণে পা রাখলাম; ভেবেছিলাম, এবার বুঝি স্বাধীনতার আকাশে ডানা মেলে উড়বো, নতুন বইয়ের ঘ্রাণে, নতুন বন্ধুর কলকাকলিতে ভরে উঠবে আমার দিনলিপি।
কিন্তু বিধাতার পরিহাস দেখো, ঠিক তখনই বিশ্বজুড়ে নেমে এলো করোনা নামক এক অদৃশ্য মহামারির ঘন কালো ছায়া; স্কুল-কলেজের লোহার গেটে ঝুলে পড়ল তালা, চারদিকের কোলাহল থেমে গেল নিমেষে, আর আমার উচ্ছ্বাস ডুবে গেল অনলাইন ক্লাসের নিষ্প্রাণ স্ক্রিনের নীরবতায়। সেই সংকটের মাঝেই আমার পারিবারিক আকাশেও জমতে লাগল দুর্যোগের মেঘ; একসময় নিরুপায় হয়ে আশ্রয় নিলাম নানুবাড়ির উঠোনে, যেখানে খালা-মামাতো বোনদের প্রাণখোলা হাসি আর আড্ডার মাঝে কিছুদিনের জন্য হলেও ভুলে ছিলাম বিষণ্ণতার কথা।
তখনও টের পাইনি, আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক মহেন্দ্রক্ষণ একদম দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিন বিকেলের ম্লান আলোয় বড় মামা নিতান্ত সহজ সুরে বললেন, “তুমি তো ঘরেই অলস বসে আছ, চাইলে মাদরাসার হোস্টেলে গিয়ে দ্বীনি ইলম অর্জন করতে পারো।” কথাটি বাক্য হিসেবে ছিল অতি সাধারণ, কিন্তু তীরের মতো বিঁধে গেল আমার হৃদয়ের গভীরে; মুহূর্তেই আমার সমস্ত চিন্তার জগৎ ওলট-পালট হয়ে গেল।
আমি ভাবতে বসলাম, এত মায়ার বাঁধন, এত চেনা উঠোন, এত আপনজনের মমতা ছেড়ে কি আমি যেতে পারব সেই অচেনা চার দেয়ালের গণ্ডিতে? হোস্টেলের নীরস জীবন কি সইবে আমার এই অভ্যস্ত মন? অসংখ্য দ্বিধা, নিঃশব্দ কান্না আর হাজারো প্রশ্নের জালে আটকে থেকে অবশেষে আমি এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিলাম—নিজেকে ভাঙবো, গড়বো, রবের সন্তুষ্টির পথে পা বাড়াবো।
পরদিন স্নেহময়ী আম্মু আমার হাত ধরে বাজারে গেলেন, হোস্টেলের প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিস কিনে দিলেন মায়াভরা হাতে; আর তারপর একসময় এলো সেই নির্মম বিদায়ের ক্ষণ। সারা রাত নির্ঘুম কাটলো, অন্ধকার ঘরের নীরবতা ছিঁড়ে শুধু একটি প্রশ্নই প্রতিধ্বনিত হলো—সত্যিই কি আমি পাড়ি জমাচ্ছি এক নতুন জীবনের দিকে?
অবশেষে ভর্তি হলাম আবু সহাত মহিলা মাদরাসার আঙিনায়। প্রথম দিন অফিসকক্ষে ডাক পড়ল, শ্রদ্ধেয়া প্রধান শিক্ষিকা কিছু প্রশ্নোত্তরের পর আমাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন শর্ট কোর্সে; সেখানে প্রথম শ্রেণি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত সমস্ত পাঠ একসাথে পড়ানো হতো।নাহু-সরফের বর্ণমালাও তখন আমার কাছে ছিল দুর্বোধ্য এক রহস্য; ক্লাসরুমে যখন আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট মেয়েরা সাবলীল ভাষায় জটিল মাসআলার উত্তর দিত, তখন আমার বুকের ভেতর হুহু করে উঠত, মনে হতো আমি বুঝি ভুল নক্ষত্রের নিচে জন্মেছি।
কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা কখনো তাঁর পথের পথিককে নিঃসঙ্গ ছেড়ে দেন না; মাদরাসার উস্তাযারা, বড় আপুরা—সকলেই আমাকে স্নেহ-মমতার চাদরে জড়িয়ে নিলেন, শুধু ইলমের দরস দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না, আমার ভেঙে পড়া মনটাকেও তাঁরা জোড়া লাগালেন অদৃশ্য ভালোবাসার সুতোয়। রাতের নিঝুম প্রহরে, যখন চারদিক নিস্তব্ধ, আমি আমার জায়নামাজ বিছিয়ে অশ্রুসজল নয়নে কতবার যে ফরিয়াদ করেছি তার ইয়ত্তা নেই; সিজদার অতলে মাথা রেখে কেঁদে কেঁদে বলতাম, “হে আমার রব, আমার চরিত্রকে সৌন্দর্যের চাদরে ঢেকে দিন, আপনার দ্বীনের গভীর বুঝ দান করুন, এই কিতাবের জটিল ইবারতগুলো আমার হৃদয়ে বোধগম্য করে দিন।”
সেই অশ্রুর সাক্ষী ছিল না কেউ, সাক্ষী ছিলেন শুধু আরশের মালিক, যিনি বান্দার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের খবর রাখেন। ধীরে ধীরে, খুব ধীরে, আমার মনের আকাশ থেকে কুয়াশা কেটে যেতে লাগল; যে মেয়েটি একদিন নিজেকে চরম অযোগ্য ভাবত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সেই মেয়েটির হাত ধরেই খুলে দিলেন সাফল্যের সোনালি দরজা; প্রতিটি শ্রেণিতে, প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি আমাকে দান করলেন সর্বোত্তম ফলাফলের তাওফিক।
আজ আমি দৃঢ় কণ্ঠে, বিনয়ের সাথে স্বীকার করি—এই সমস্ত অর্জনের পেছনে আমার নিজস্ব কোনো কৃতিত্ব নেই, সমস্ত গৌরব, সমস্ত সাফল্য আমার রবের অশেষ অনুগ্রহের দান মাত্র। চার বছরের দীর্ঘ পথচলায়, আলহামদুলিল্লাহ, আমি মাদরাসার মেধাবী ছাত্রীদের সারিতে নিজের নাম লেখাতে পেরেছি; অর্জন করেছি উস্তাযাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা, আপুদের আন্তরিক দোয়া আর সকলের অগাধ আস্থা।
তবুও আমি কখনো বিস্মৃত হইনি সেই কষ্টের দিনগুলোর কথা—যখন ছোট ছোট মেয়েদের সামনে নিজেকে বড় অসহায়, বড় পরগাছা মনে হতো; যখন নীরবে, নিভৃতে বালিশ ভিজিয়ে কাঁদতাম; যখন নিজের ভবিষ্যতের পথটা ছিল ঘোর অন্ধকারে ঢাকা। আজও মাঝে মাঝে অতীতের পানে ফিরে তাকাই, আর বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে ভাবি—কোথায় ছিলাম আমি, আর আমার মেহেরবান রব আমাকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছেন!
Reporter Name 




















