আমাদের ই-পেপার পড়তে ভিজিট করুন
ই-পেপার 📄
০৫:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

“অনূভূতি উচ্ছেদের বৈশ্বিক মেকানিজম” গল্পটি লিখেছেন -সৈয়দ হৃদয়

  • Reporter Name
  • প্রকাশিত হয়েছে: ১০:৪১:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬
  • ৪৫৪ পড়া হয়েছে
৬৩৮

অনূভূতি উচ্ছেদের বৈশ্বিক মেকানিজম
-সৈয়দ হৃদয়

পুঁজিতান্ত্রিক দানবের লালাঝরা ক্ষুধার্ত উদরে বসে আমাদের নাগরিক সুশীল সমাজ ‘কম্প্যাশন ফ্যাটিগ’-এর মতো কতিপয় ইউরোপীয় মগজপ্রসূত চাতুর্যপূর্ণ বয়ান পরম নিশ্চিন্তে চিবিয়ে, তাকে যখন মনস্তত্ত্বের সংকীর্ণ খাঁচায় পুরে পরম আয়েশ উপভোগ করে, তখন গোড়াতেই একটা মস্ত বড় গলদ থেকে যায়।

মানব-ইতিহাসের এই বর্তমান ক্রান্তিকালের গভীর, সর্বগ্রাসী, ও মজ্জাগত ব্যাধিটিকে যখন স্রেফ ব্যক্তিগত মানসিক দেউলিয়াত্ব কিংবা ক্লিনিক্যাল বিকার হিসেবে দাগায়িত করা হয়, তখন তার আসল মতলবটা বুঝতে আমাদের তেমন একটা বেগ পেতে হয় না। এর মতলব হলো, এর নেপথ্যে সচল পুঁজিতান্ত্রিক দানবের রক্তচোষা রাজনৈতিক-অর্থনীতি এবং মানুষের জ্যান্ত প্রাণসত্তাকে উচ্ছেদ করার বৈশ্বিক মেকানিজমকে বেমালুম আড়াল করে ফেলা।

বস্তুত, মানুষের বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা জ্যান্ত হাহাকারকে স্রেফ ‘মেডিকেল’ বা ‘ক্লিনিক্যাল’ পরিভাষা দিয়ে লঘু করা আর যাই হোক, কোনো বিদগ্ধ তাত্ত্বিক কসরত নয়; এ এক চরম মানবিক জালিয়াতি।

মানুষের সংবেদনশীলতা ও জৈব-চেতনা তো আর পুঁজিতন্ত্রের কোনো পেট্রোল পাম্পের তেলের ডিপো নয় যে সকাল-বিকাল স্ক্রিনের ওপর ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান কিংবা আমাদের অতি নিকটবর্তী কোনো প্রান্তিক জনপদের মানুষের ছিন্নভিন্ন লাশের বীভৎসতা গিলতে গিলতে তার মজুত ফুরিয়ে হঠাৎ একদিন শূন্য হয়ে যাবে! এই যান্ত্রিক, রৈখিক ও জড়বাদী ধারণাটিই আসলে সংকটের মূল ভুল বুর্জোয়া পাঠ।

এই ভুল পাঠের চশমা চোখে এঁটেই সুশীল সমাজ ভাবছে, মানুষের চোখ আর কানের সামনে দিন-রাত দুনিয়ার এই তামাম মরণ-রোদনের প্রদর্শনী দেখে মানুষের ভেতরের দয়া আর করুণা করার ক্ষমতা বুঝি ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটছে, তা এই সরল মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের এই আধুনিক ঔপনিবেশিক নগরসভ্যতার আসল কায়েমি খাসলতটা যদি আমরা আমাদের নিজস্ব লোকায়েত ভাব আর চৈতন্য দিয়ে না বুঝি, তবে এই সংকটের হদিস আমাদের স্থূল ও সাব-অল্টার্ন মগজে কোনোদিনও ঢুকবে না।

একটু গভীরভাবে এই কর্পোরেট নগরসভ্যতার জটিল সমীকরণটি উল্টেপাল্টে লক্ষ করলেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আপনার মস্তিষ্কে তীব্র ঝাঁকুনি দেওয়ার জন্য টেলিভিশন বা ফেসবুকের কর্পোরেট অ্যালগরিদম দুনিয়ার যে প্রদর্শনী সাজানো থাকে, তা কোনো জ্যান্ত মানুষের জীবন্ত বেদনা হিসেবে আপনার আত্মার দুয়ারে করাঘাত করে না। এখানে এক অদ্ভুত নির্মমতায় পুঁজি প্রথমে মানুষের রক্তকে চমৎকার ‘কনটেন্ট’ বা দৃশ্যগত টোপে রূপান্তরিত করে, যার ঠিক পিঠোপিঠি কোনো বহুজাতিক কোম্পানির বিলাসী গাড়ি বা প্রসাধন সামগ্রীর চটকদার বিজ্ঞাপনের লোভাতুর ইশতেহার জুড়ে দিয়ে অত্যন্ত সুচারুভাবে আপনার অবচেতনে চালান করে দেওয়া হয়।

দৃশ্য আর যন্ত্রণার এই যে চরম কমোডিফিকেশন, এটি মানুষের চেতনাকুলকে অবশ করে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত কারসাজি। কারণ, মানুষ যদি প্রতিটি বৈশ্বিক যন্ত্রণায় সমভাবে আলোড়িত ও সজাগ হতে থাকে, তবে শোষণের এই দানবীয় মেকানিজম এক মুহূর্তও টিকে থাকতে পারবে না। বিশ্বপুঁজি এটা ভালো করেই জানে।

মানুষ যখন এই করাল ব্যবস্থার ভেতর দাঁড়িয়ে এক ফোঁটা জ্যান্ত চোখের জল ফেলার স্বাধীন জায়গাটুকুও হারিয়ে ফেলে এবং বোঝে যে তার এই ভার্চুয়াল আর্তি, মোমবাতি প্রজ্বলন কিংবা ফেসবুকের ‘অ্যাংরি রিয়্যাক্ট’ শোষকের একটা চুলও নাড়াতে পারছে না, তখন নিজের স্নায়ুতন্ত্রকে স্রেফ পাগল হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদেই সে এক ধরণের পদ্ধতিগত অন্ধত্ব ও অসাড়তা নিজের ভেতরে লালন করে; যাকে সুশীল সমাজ ‘ক্লান্তিবোধ’ বলে ভ্রম করে এবং মনস্তত্ত্বের ক্লাসরুমে বসে থিসিস লেখে। বস্তুত, এটি পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার দ্বারা উৎপাদিত কাঠামোগত অবশতা।

এই কাঠামতোগত সমান্তরালে নাগরিক মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজে যে জিনিসটা অত্যন্ত চতুরতার সাথে হাজির হয়, তা হলো, এলিটিজম। শহরের এই সুশীল বা তথাকথিত বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবী শ্রেণি দুনিয়ার সমস্ত উচ্ছেদ, ক্ষুধা আর রক্তপাত থেকে নিজেকে একটা নিরাপদ শারীরিক ও মানসিক দূরত্বে রেখে নিরাসক্তির ভঙ্গিতে জাবর কাটতে ভালোবাসে।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, এক কাপ দামি কফিতে চুমুক দিতে দিতে যখন ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে টিভির পর্দায় বোমাবর্ষণের বা কোনো দাঙ্গার দৃশ্য দেখে মানুষ যন্ত্রণার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে কেবল তার ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল, আলোর ব্যবহার কিংবা ফ্রেমিংয়ের শৈল্পিক তারিফ করে, অথবা উদ্বাস্তু শিবিরের একটা হাড্ডিসার শিশুর ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকার আকুলতাকে একটা ‘পোয়েটিক এস্থেটিক্স’ বলে নিজেদের উচ্চাঙ্গ রুচির প্রমাণ দেয়, তখনই উদাসীনতা তার চূড়ান্ত নান্দনিক রূপটা পরিগ্রহ করে।

এই নির্লিপ্ততাকে দয়া করে কোনো সাধু-সন্ন্যাসীর ব্রহ্মজ্ঞান, বৈরাগ্য, কিংবা আধ্যাত্মিকতা ভেবে ভুল করবেন না। এটি আসলে এক ধরণের চরম ফ্যাশন, এক প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক দেউলিয়াত্ব ছাড়া কিছুই নয়, যেখানে মানুষ স্রেফ একটা জড় দর্শক হিসেবে এই পুঁজিতান্ত্রিক সার্কাসের একজন বাধ্য ভোক্তা মাত্র। তার সংবেদনশীলতাকেও পুঁজি এখানে চিবিয়ে গিলে খেয়েছে।

তাহলে এই সংকটের আসল গোড়াটা কোথায়? যদি আমরা আমাদের ভাবতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক জমিন থেকে এই প্রশ্ন তুলি, তবে স্পষ্ট হবে যে, এটা মূলত আমাদের ‘লাইফ-ফোর্স’ বা জ্যান্ত প্রাণসত্তার সংকট। এটি একটি গভীর ‘বায়োপলিটিক্যাল’ বা জৈব-রাজনৈতিক ফাটল, যেখানে পুঁজিতন্ত্র মানুষের ভেতরের সহজাত জৈবিক শক্তি ও দরদকে শুষে নিয়ে তাকে একটা আজ্ঞাবহ, সংবেদনহীন ‘জম্বি’তে পরিণত করেছে।

সাম্রাজ্যবাদ শুধু জমি দখল করে না, সে মানুষের মগজ আর অনুভূতির ভূগোলকেও উপনিবেশ বানিয়ে ছাড়ে। সুতরাং, এই যে ‘কম্প্যাশন ফ্যাটিগ’-এর মতো সাম্রাজ্যবাদী তাত্ত্বিক বিলাসিতা কিংবা উদাসীনতার মেকি নান্দনিকতা, একে যদি সত্যিসত্যিই ভাঙতে হয়, তবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডেস্কে বসে পশ্চিমা চশমায় চোখ রেখে বা স্রেফ মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বকথা আওড়ে কোনো ফায়দা হবে না। তাতে শোষকের জোয়াল আরও শক্ত হবে।

যেদিন আমরা ইউরোপীয় মনস্তত্ত্বের এই মরা খাঁচার জ্ঞানতাত্ত্বিক দাসত্ব ভেঙে, স্ক্রিনের মায়াজাল ভেঙে, ভার্চুয়াল রিয়্যাকশনের কর্পোরেট ভণ্ডামি ছিঁড়ে, রক্ত-মাংসের মজলুম মানুষের পাশে গিয়ে সশরীরে দাঁড়িয়ে তার রুটি-রুজি আর অস্তিত্বের লড়াইয়ের জ্যান্ত শরিক হতে পারব, ঠিক সেদিনই আধুনিক বুর্জোয়া মানুষের ওই মেকি নান্দনিক মুখোশটা আমাদের লড়াকু চেতনার এক এক কোপে ধুলোয় মিশে ছারখার হয়ে যাবে।

এই বিষয়ের ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সাংবাদিকের তথ্য জানুন

🎉 Shapno24 প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী 🎉

আগামী ৩১ জুলাই www.shapno24.com এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হবে।

🎊 শুভেচ্ছা কার্ড তৈরি করুন 🎊

নিজের নাম দিয়ে আকর্ষণীয় Greeting Card তৈরি করুন।

Greeting Card তৈরি করুন

“অনূভূতি উচ্ছেদের বৈশ্বিক মেকানিজম” গল্পটি লিখেছেন -সৈয়দ হৃদয়

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:৪১:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬
৬৩৮

অনূভূতি উচ্ছেদের বৈশ্বিক মেকানিজম
-সৈয়দ হৃদয়

পুঁজিতান্ত্রিক দানবের লালাঝরা ক্ষুধার্ত উদরে বসে আমাদের নাগরিক সুশীল সমাজ ‘কম্প্যাশন ফ্যাটিগ’-এর মতো কতিপয় ইউরোপীয় মগজপ্রসূত চাতুর্যপূর্ণ বয়ান পরম নিশ্চিন্তে চিবিয়ে, তাকে যখন মনস্তত্ত্বের সংকীর্ণ খাঁচায় পুরে পরম আয়েশ উপভোগ করে, তখন গোড়াতেই একটা মস্ত বড় গলদ থেকে যায়।

মানব-ইতিহাসের এই বর্তমান ক্রান্তিকালের গভীর, সর্বগ্রাসী, ও মজ্জাগত ব্যাধিটিকে যখন স্রেফ ব্যক্তিগত মানসিক দেউলিয়াত্ব কিংবা ক্লিনিক্যাল বিকার হিসেবে দাগায়িত করা হয়, তখন তার আসল মতলবটা বুঝতে আমাদের তেমন একটা বেগ পেতে হয় না। এর মতলব হলো, এর নেপথ্যে সচল পুঁজিতান্ত্রিক দানবের রক্তচোষা রাজনৈতিক-অর্থনীতি এবং মানুষের জ্যান্ত প্রাণসত্তাকে উচ্ছেদ করার বৈশ্বিক মেকানিজমকে বেমালুম আড়াল করে ফেলা।

বস্তুত, মানুষের বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা জ্যান্ত হাহাকারকে স্রেফ ‘মেডিকেল’ বা ‘ক্লিনিক্যাল’ পরিভাষা দিয়ে লঘু করা আর যাই হোক, কোনো বিদগ্ধ তাত্ত্বিক কসরত নয়; এ এক চরম মানবিক জালিয়াতি।

মানুষের সংবেদনশীলতা ও জৈব-চেতনা তো আর পুঁজিতন্ত্রের কোনো পেট্রোল পাম্পের তেলের ডিপো নয় যে সকাল-বিকাল স্ক্রিনের ওপর ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান কিংবা আমাদের অতি নিকটবর্তী কোনো প্রান্তিক জনপদের মানুষের ছিন্নভিন্ন লাশের বীভৎসতা গিলতে গিলতে তার মজুত ফুরিয়ে হঠাৎ একদিন শূন্য হয়ে যাবে! এই যান্ত্রিক, রৈখিক ও জড়বাদী ধারণাটিই আসলে সংকটের মূল ভুল বুর্জোয়া পাঠ।

এই ভুল পাঠের চশমা চোখে এঁটেই সুশীল সমাজ ভাবছে, মানুষের চোখ আর কানের সামনে দিন-রাত দুনিয়ার এই তামাম মরণ-রোদনের প্রদর্শনী দেখে মানুষের ভেতরের দয়া আর করুণা করার ক্ষমতা বুঝি ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটছে, তা এই সরল মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের এই আধুনিক ঔপনিবেশিক নগরসভ্যতার আসল কায়েমি খাসলতটা যদি আমরা আমাদের নিজস্ব লোকায়েত ভাব আর চৈতন্য দিয়ে না বুঝি, তবে এই সংকটের হদিস আমাদের স্থূল ও সাব-অল্টার্ন মগজে কোনোদিনও ঢুকবে না।

একটু গভীরভাবে এই কর্পোরেট নগরসভ্যতার জটিল সমীকরণটি উল্টেপাল্টে লক্ষ করলেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আপনার মস্তিষ্কে তীব্র ঝাঁকুনি দেওয়ার জন্য টেলিভিশন বা ফেসবুকের কর্পোরেট অ্যালগরিদম দুনিয়ার যে প্রদর্শনী সাজানো থাকে, তা কোনো জ্যান্ত মানুষের জীবন্ত বেদনা হিসেবে আপনার আত্মার দুয়ারে করাঘাত করে না। এখানে এক অদ্ভুত নির্মমতায় পুঁজি প্রথমে মানুষের রক্তকে চমৎকার ‘কনটেন্ট’ বা দৃশ্যগত টোপে রূপান্তরিত করে, যার ঠিক পিঠোপিঠি কোনো বহুজাতিক কোম্পানির বিলাসী গাড়ি বা প্রসাধন সামগ্রীর চটকদার বিজ্ঞাপনের লোভাতুর ইশতেহার জুড়ে দিয়ে অত্যন্ত সুচারুভাবে আপনার অবচেতনে চালান করে দেওয়া হয়।

দৃশ্য আর যন্ত্রণার এই যে চরম কমোডিফিকেশন, এটি মানুষের চেতনাকুলকে অবশ করে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত কারসাজি। কারণ, মানুষ যদি প্রতিটি বৈশ্বিক যন্ত্রণায় সমভাবে আলোড়িত ও সজাগ হতে থাকে, তবে শোষণের এই দানবীয় মেকানিজম এক মুহূর্তও টিকে থাকতে পারবে না। বিশ্বপুঁজি এটা ভালো করেই জানে।

মানুষ যখন এই করাল ব্যবস্থার ভেতর দাঁড়িয়ে এক ফোঁটা জ্যান্ত চোখের জল ফেলার স্বাধীন জায়গাটুকুও হারিয়ে ফেলে এবং বোঝে যে তার এই ভার্চুয়াল আর্তি, মোমবাতি প্রজ্বলন কিংবা ফেসবুকের ‘অ্যাংরি রিয়্যাক্ট’ শোষকের একটা চুলও নাড়াতে পারছে না, তখন নিজের স্নায়ুতন্ত্রকে স্রেফ পাগল হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদেই সে এক ধরণের পদ্ধতিগত অন্ধত্ব ও অসাড়তা নিজের ভেতরে লালন করে; যাকে সুশীল সমাজ ‘ক্লান্তিবোধ’ বলে ভ্রম করে এবং মনস্তত্ত্বের ক্লাসরুমে বসে থিসিস লেখে। বস্তুত, এটি পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার দ্বারা উৎপাদিত কাঠামোগত অবশতা।

এই কাঠামতোগত সমান্তরালে নাগরিক মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজে যে জিনিসটা অত্যন্ত চতুরতার সাথে হাজির হয়, তা হলো, এলিটিজম। শহরের এই সুশীল বা তথাকথিত বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবী শ্রেণি দুনিয়ার সমস্ত উচ্ছেদ, ক্ষুধা আর রক্তপাত থেকে নিজেকে একটা নিরাপদ শারীরিক ও মানসিক দূরত্বে রেখে নিরাসক্তির ভঙ্গিতে জাবর কাটতে ভালোবাসে।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, এক কাপ দামি কফিতে চুমুক দিতে দিতে যখন ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে টিভির পর্দায় বোমাবর্ষণের বা কোনো দাঙ্গার দৃশ্য দেখে মানুষ যন্ত্রণার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে কেবল তার ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল, আলোর ব্যবহার কিংবা ফ্রেমিংয়ের শৈল্পিক তারিফ করে, অথবা উদ্বাস্তু শিবিরের একটা হাড্ডিসার শিশুর ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকার আকুলতাকে একটা ‘পোয়েটিক এস্থেটিক্স’ বলে নিজেদের উচ্চাঙ্গ রুচির প্রমাণ দেয়, তখনই উদাসীনতা তার চূড়ান্ত নান্দনিক রূপটা পরিগ্রহ করে।

এই নির্লিপ্ততাকে দয়া করে কোনো সাধু-সন্ন্যাসীর ব্রহ্মজ্ঞান, বৈরাগ্য, কিংবা আধ্যাত্মিকতা ভেবে ভুল করবেন না। এটি আসলে এক ধরণের চরম ফ্যাশন, এক প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক দেউলিয়াত্ব ছাড়া কিছুই নয়, যেখানে মানুষ স্রেফ একটা জড় দর্শক হিসেবে এই পুঁজিতান্ত্রিক সার্কাসের একজন বাধ্য ভোক্তা মাত্র। তার সংবেদনশীলতাকেও পুঁজি এখানে চিবিয়ে গিলে খেয়েছে।

তাহলে এই সংকটের আসল গোড়াটা কোথায়? যদি আমরা আমাদের ভাবতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক জমিন থেকে এই প্রশ্ন তুলি, তবে স্পষ্ট হবে যে, এটা মূলত আমাদের ‘লাইফ-ফোর্স’ বা জ্যান্ত প্রাণসত্তার সংকট। এটি একটি গভীর ‘বায়োপলিটিক্যাল’ বা জৈব-রাজনৈতিক ফাটল, যেখানে পুঁজিতন্ত্র মানুষের ভেতরের সহজাত জৈবিক শক্তি ও দরদকে শুষে নিয়ে তাকে একটা আজ্ঞাবহ, সংবেদনহীন ‘জম্বি’তে পরিণত করেছে।

সাম্রাজ্যবাদ শুধু জমি দখল করে না, সে মানুষের মগজ আর অনুভূতির ভূগোলকেও উপনিবেশ বানিয়ে ছাড়ে। সুতরাং, এই যে ‘কম্প্যাশন ফ্যাটিগ’-এর মতো সাম্রাজ্যবাদী তাত্ত্বিক বিলাসিতা কিংবা উদাসীনতার মেকি নান্দনিকতা, একে যদি সত্যিসত্যিই ভাঙতে হয়, তবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডেস্কে বসে পশ্চিমা চশমায় চোখ রেখে বা স্রেফ মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বকথা আওড়ে কোনো ফায়দা হবে না। তাতে শোষকের জোয়াল আরও শক্ত হবে।

যেদিন আমরা ইউরোপীয় মনস্তত্ত্বের এই মরা খাঁচার জ্ঞানতাত্ত্বিক দাসত্ব ভেঙে, স্ক্রিনের মায়াজাল ভেঙে, ভার্চুয়াল রিয়্যাকশনের কর্পোরেট ভণ্ডামি ছিঁড়ে, রক্ত-মাংসের মজলুম মানুষের পাশে গিয়ে সশরীরে দাঁড়িয়ে তার রুটি-রুজি আর অস্তিত্বের লড়াইয়ের জ্যান্ত শরিক হতে পারব, ঠিক সেদিনই আধুনিক বুর্জোয়া মানুষের ওই মেকি নান্দনিক মুখোশটা আমাদের লড়াকু চেতনার এক এক কোপে ধুলোয় মিশে ছারখার হয়ে যাবে।