
ঢাকার উপকণ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এক গার্মেন্টস কারখানা। দূর থেকে দেখলে মনে হতো, যেন ইট-পাথরের তৈরি কোনো ক্লান্ত নগরী। প্রতিদিন ভোর হওয়ার আগেই শত শত মানুষ সেখানে এসে জড়ো হতো। কারও চোখে ঘুম, কারও মুখে দুশ্চিন্তা, কারও হাতে পুরোনো ব্যাগ। জীবনের তাগিদে সবাই ছুটে আসতো সেই কারখানায়। কারণ, এই কারখানার মেশিনের শব্দের মাঝেই লুকিয়ে ছিল তাদের সংসারের ভাত, সন্তানের বই, বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ আর ভবিষ্যতের ছোট ছোট স্বপ্ন।
কারখানার ভেতরে সারাক্ষণ চলতো মেশিনের গর্জন। সেলাই মেশিনের কাঁপন, কাপড় কাটার শব্দ, আয়রনের গরম ধোঁয়া আর শ্রমিকদের ব্যস্ত পায়ের আওয়াজ মিলে তৈরি করতো এক অদ্ভুত পরিবেশ। সেই পরিবেশেই প্রতিদিন কাজ করতো আবু রিসাত, সুজন এবং এস এম জাহিদুল। তিনজন ছিল খুব কাছের বন্ধু। কষ্টের জীবন হলেও তারা একে অপরকে সাহস দিতো, পাশে থাকতো।
আবু রিসাত ছিল খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় সংসারের পুরো দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। বৃদ্ধ বাবা অসুস্থ, ছোট দুই বোন পড়াশোনা করে, মা সারাদিন চিন্তায় থাকেন। মাস শেষে বেতন হাতে পেলেই আগে বাজার করতো, তারপর বাবার ওষুধ কিনতো। নিজের জন্য কিছু রাখার সুযোগ খুব কমই হতো।
সুজন ছিল একটু অন্যরকম। নিজের কষ্ট লুকিয়ে সবাইকে হাসানোর চেষ্টা করতো। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মজার কথা বলে পুরো লাইনের ক্লান্তি দূর করতো। তার স্বপ্ন ছিল, একদিন একটা ছোট দোকান দেবে, যেখানে তাকে আর কারও অধীনে কাজ করতে হবে না।
এস এম জাহিদুল ছিল সবচেয়ে চুপচাপ। কম কথা বলতো, কিন্তু তার প্রতিটি কথায় গভীরতা ছিল। জীবনকে সে খুব কাছ থেকে দেখেছে। তাই মানুষের কষ্ট বুঝতে পারতো সহজেই।
এই তিনজনের জীবন ছিল সাধারণ, কিন্তু তাদের মন ছিল খুব বড়।
কারখানার একজন স্টাফ ছিলেন স্যার নাসিম প্রাং। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর স্বভাবের মানুষ। কাজ ছাড়া যেন আর কিছুই বুঝতেন না। ওয়ার্কারদের প্রতি তার ব্যবহার ছিল রুক্ষ। তিনি সবসময় মনে করতেন, শ্রমিকরা অসুস্থতার অজুহাতে কাজ ফাঁকি দেয়। কেউ একটু বসে থাকলে তিনি রেগে যেতেন, কেউ ছুটি চাইলে বিরক্ত হতেন।
প্রায়ই তিনি বলতেন,
“এখানে কাজ করতে আসছো, আবেগ দেখাতে না!”
তার কথায় সবাই চুপ হয়ে যেতো। কারণ, চাকরিটাই ছিল তাদের বাঁচার শেষ ভরসা।
একদিন দুপুরে সুজনের হাতে মেশিনে কেটে যায়। রক্ত ঝরতে শুরু করে। আবু রিসাত দ্রুত তাকে ধরে বসায়। জাহিদুল পানি এনে দেয়। কিন্তু দূর থেকে নাসিম প্রাং এসে বিরক্ত গলায় বললেন,
“এত নাটক করার কী আছে? সামান্য কেটেছে!”
সুজন কিছু বললো না। শুধু মাথা নিচু করে রইলো। তার চোখের কোণে পানি জমে উঠেছিল। তখন জাহিদুল ধীরে বলেছিল,
“মানুষের কষ্ট বুঝতে না পারা সবচেয়ে বড় অসুস্থতা।”
কথাটা নাসিম প্রাং শুনেও শুনলেন না।
দিনগুলো এভাবেই চলছিল। সকালে কাজ, রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফেরা। ওভারটাইম, বকাঝকা, টার্গেট, সবকিছুর মাঝেও তারা বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিল।
হঠাৎ এক শীতের সকালে পুরো কারখানায় একটা খবর ছড়িয়ে পড়লো। স্যার নাসিম প্রাং গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কেউ বললো হার্টের সমস্যা, কেউ বললো অতিরিক্ত চাপের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
খবরটা শুনে পুরো ফ্লোর নীরব হয়ে গেল।
লাঞ্চ ব্রেকে আবু রিসাত চুপচাপ বসে ছিল। তারপর ধীরে বলল,
“মানুষটা রাগী হতে পারে, কিন্তু অসুস্থতার কষ্ট তো সবাই সমানভাবে পায়। আল্লাহ যেন উনাকে সুস্থ করে দেন।”
সুজন হাত তুলে দোয়া করলো,
“হে আল্লাহ, উনার পরিবারকে কষ্টে রাখবেন না।”
এস এম জাহিদুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমরা গরিব মানুষ হতে পারি, কিন্তু কারো বিপদে খুশি হতে শিখিনি।”
তিনজন মিলে তার জন্য দোয়া করলো।
অন্যদিকে হাসপাতালের সাদা দেয়ালের ভেতরে শুয়ে ছিলেন নাসিম প্রাং। জীবনে প্রথমবার তিনি নিজেকে অসহায় অনুভব করলেন। যে মানুষ প্রতিদিন শত মানুষের ওপর নির্দেশ দিতেন, আজ তিনি নিজেই নার্সের সাহায্য ছাড়া উঠতে পারছেন না। হাসপাতালের নিস্তব্ধ রাতে তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবছিলেন, মানুষ আসলে কত দুর্বল। সামান্য অসুস্থ হলেই সব অহংকার, সব ক্ষমতা যেন মাটিতে মিশে যায়।
একদিন একজন সহকর্মী তাকে বললেন,
“স্যার, জানেন? কিছু ওয়ার্কার আপনার জন্য দোয়া করছে।”
নাসিম প্রাং অবাক হয়ে গেলেন।
“ওয়ার্কাররা? আমার জন্য?”
“জি স্যার। আবু রিসাত, সুজন আর জাহিদুল।”
কথাগুলো শুনে তিনি চুপ হয়ে গেলেন। বুকের ভেতরে কোথাও যেন অদ্ভুত একটা অনুভূতি জন্ম নিল।
কয়েকদিন পর তিনি সুস্থ হয়ে আবার কারখানায় ফিরলেন। সবাই তাকে দেখে স্বস্তি পেল। কেউ সালাম দিল, কেউ বললো,
“স্যার, এখন কেমন আছেন?”
তিনি শুধু মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন। কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা যেন ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছিল।
তারপর একদিন হঠাৎ আবু রিসাত গুরুতর জ্বরে আক্রান্ত হলো। শরীর কাঁপছিল, মাথা ঘুরছিল। তার স্ত্রী বলেছিল,
“আজ কাজে যেও না।”
কিন্তু আবু রিসাত জানতো, একদিন কাজ না করলে সংসারে খাবার উঠবে না। তাই অসুস্থ শরীর নিয়েই সে কারখানায় এলো।
মেশিনের সামনে দাঁড়াতেই তার শরীর কাঁপতে লাগলো। সুজন তাকে ধরে বলল,
“তুই আজ বাসায় চলে যা।”
জাহিদুলও উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
“তোর অবস্থা খুব খারাপ।”
ঠিক তখনই সেখানে এসে দাঁড়ালেন নাসিম প্রাং। তিনি কড়া গলায় বললেন,
“কাজের সময় আবার কী সমস্যা?”
আবু রিসাত কাঁপা গলায় বলল,
“স্যার… শরীরটা খুব খারাপ…”
নাসিম প্রাং বিরক্ত হয়ে বললেন,
“অসুস্থ হলে চাকরি ছেড়ে দাও! এসব নাটক আমার সামনে চলবে না। কাজ ফাঁকি দেওয়ার বাহানা!”
পুরো ফ্লোর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আবু রিসাত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখ ভিজে উঠলো। সুজন সাহস করে বলল,
“স্যার, মানুষ তো অসুস্থ হতেই পারে…”
নাসিম প্রাং রেগে উঠলেন,
“তোরা সবাই একই রকম!”
তখন এস এম জাহিদুল শান্ত স্বরে বলল,
“স্যার, আমরা গরিব মানুষ। আমাদের শরীরটাই একমাত্র সম্পদ। এই শরীর অসুস্থ হলে শুধু আমরা না, আমাদের পরিবারও না খেয়ে থাকে।”
কথাগুলো যেন সরাসরি গিয়ে আঘাত করলো নাসিম প্রাংয়ের মনে। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল হাসপাতালের সেই রাতগুলোর কথা। নিজের অসহায়ত্বের কথা। আর মনে পড়ে গেল, এই মানুষগুলোই তার জন্য দোয়া করেছিল।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে আবু রিসাতের কাছে গিয়ে বললেন,
“তুমি বাসায় চলে যাও। ডাক্তার দেখাও।”
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। কারণ, এই প্রথম তারা নাসিম প্রাংকে এত নরমভাবে কথা বলতে দেখলো।
তিনি নিচু গলায় আবার বললেন,
“আর… আমার কথাগুলোর জন্য আমি দুঃখিত।”
আবু রিসাত কিছু বললো না। শুধু শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
সেদিনের পর থেকে কারখানার পরিবেশ একটু একটু করে বদলাতে শুরু করলো। নাসিম প্রাং আগের মতো রাগারাগি কম করতেন। কেউ অসুস্থ হলে খোঁজ নিতেন। কেউ সমস্যায় পড়লে শুনতেন।
একদিন পুরো ফ্লোরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন,
“আমি আগে বুঝিনি… মানুষ শুধু শ্রমিক না, তারা মানুষ। তাদেরও কষ্ট আছে, পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে।”
সেদিন অনেকের চোখ ভিজে উঠেছিল।
কারখানার মেশিনগুলো তখনও আগের মতোই শব্দ করছিল। কাজ তখনও চলছিল। কিন্তু মানুষের ভেতরের পরিবেশটা বদলে গিয়েছিল। সেখানে জন্ম নিয়েছিল নতুন এক অনুভূতি, মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান।
সন্ধ্যায় কাজ শেষে আবু রিসাত, সুজন আর এস এম জাহিদুল একসাথে কারখানা থেকে বের হচ্ছিল। আকাশে লাল সূর্যের আলো। ক্লান্ত শহর ধীরে ধীরে রাতের দিকে ঝুঁকছে।
সুজন মুচকি হেসে বলল,
“দেখছিস, মানুষ বদলাতেও পারে।”
আবু রিসাত শান্ত গলায় বলল,
“ভালোবাসা আর মানবতা কখনো বৃথা যায় না।”
এস এম জাহিদুল আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
“পদমর্যাদা মানুষকে বড় করে না… মানুষকে বড় করে তার মন।”
Reporter Name 




















