
২০৭০: শেষ নিঃশ্বাসের আগে
লেখক: সাদিয়া আফরিন
২০৭০ সাল
দুই হাজার সত্তর সাল।
বার্ধক্যের দোরগোড়া পেরিয়ে এসেছি বহু আগেই। মাথাভরা চুলগুলো এখন ধবধবে সাদা, মুখের চামড়ায় সময় তার গভীর ভাঁজ এঁকে দিয়েছে। কাঁপতে থাকা হাত দু’টো নিয়ে ধীরে ধীরে জানালার পাশে এসে দাঁড়ালাম।
বাইরে তাকাতেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন শূন্য হয়ে উঠল। চারপাশে কোথাও কোনো কোলাহল নেই, নেই মানুষের ছুটে চলার শব্দ, নেই সেই চেনা হর্নের আওয়াজ। শহরটা অদ্ভুত রকম নিস্তব্ধ— যেন কেউ তার কণ্ঠস্বর কেড়ে নিয়েছে।
আকাশে একের পর এক ড্রোন উড়ে যাচ্ছে— শব্দহীন, অনুভূতিহীন। নিচে রাস্তায় ড্রাইভারহীন গাড়িগুলো নিখুঁত নিয়মে ছুটে চলেছে। অথচ কোথাও কোনো মানুষের উপস্থিতি নেই।
কী অদ্ভুত!
এই শহরটাই একসময় কত ব্যস্ত ছিল— ভিড়, ধোঁয়া, চিৎকার, জীবনের তারণায় ভরা। আর আজ সবকিছু যেন মৃত, নিঃশব্দ, প্রাণহীন।
হঠাৎ দেয়ালে ঝোলানো ডিজিটাল প্যানেল থেকে শীতল এক কণ্ঠ ভেসে এলো—
“আজকের অক্সিজেন মাত্রা পাঁচ শতাংশ। বাইরে অবস্থান সীমিত রাখুন।”
আমি নিঃশ্বাস নিতে গিয়েও থমকে গেলাম। এখন নিঃশ্বাসও যেন হিসেব করে নিতে হয়।
ভাবতেই অবাক লাগে— একসময় এই বাতাস বুক ভরে টেনে নেওয়া যেত বিনা মূল্যে। আজ তা পরিমাপ করে ব্যবহার করতে হয়। কেনই বা হবে না? সেই সবুজ গাছপালা, খোলা মাঠ, বৃষ্টি ভেজা মাটি— সব তো একে একে হারিয়ে গেছে।
প্রকৃতি হারিয়েছে তার রং, আকাশ হারিয়েছে তার নীল, আর মানুষ হারিয়েছে তার কোলাহল।
হঠাৎ দরজাটা শব্দ করে খুলে গেল।
“দাদী, তুমি আবার জানালার পাশে?”— নাতির কণ্ঠে মিশে আছে বিস্ময়।
তার কানে স্বচ্ছ নিউরাল ডিভাইস, চোখের সামনে ভাসছে হালকা নীল হোলোগ্রাফিক ইন্টারফেস। মুহূর্তেই ঘরের মাঝে আলোর স্তম্ভ তৈরি হলো, আর তাতে একজন শিক্ষক ত্রিমাত্রিক অবয়বে দাঁড়িয়ে বলছেন—
“আজকের আলোচ্য বিষয়: একবিংশ শতাব্দীর পরিবেশগত ভুল সিদ্ধান্ত।”
আমি বিস্ময়ে বললাম,
“তোমরা এভাবে পড়াশোনা করো?”
সে হেসে বলল,
“দাদী, এখন তো ব্রেইন স্কিল যুগ। বই লাগে না, স্কুলও ভার্চুয়াল। আর এআই আমাদের পরীক্ষা নেয়।”
আমি ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলাম,
“তোমরা কি কখনো গাছের নিচে বসে গল্প করো? খোলা মাঠে দৌড়াও?”
তার বন্ধুরা হোলোগ্রামের ভেতর মুখভঙ্গি করল। সে হেসে বলল,
“দাদী, এটা আধুনিক যুগ। রিয়েল মাঠে এখন রেডিয়েশন বেশি। আমরা ভার্চুয়াল ইকো-পার্কে খেলি। তোমাদের আদিযুগে তো এসব ছিল না, তাই না?”
আমি জানালার বাইরে তাকালাম।
“আদি যুগ…”— মনে হলো এই কথাটাই এখন আমাদের পরিচয়।
হঠাৎ আবার সতর্কবার্তা জ্বলে উঠল—
“অক্সিজেন লেভেল: ৫%।”
নাতি দ্রুত আমার কাছে এসে নাকের কাছে ফিল্টার লাগিয়ে দিল।
“এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সেফ না দিদি।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম,
“তোমরা কি কখনো হিসাব ছাড়া নিঃশ্বাস নিয়েছ?”
সে থেমে গিয়ে বলল,
“নিঃশ্বাসও এখন রিসোর্স দাদী। আনলিমিটেড কিছু থাকে নাকি?”
তার কব্জির স্ক্রিনে লাল সংকেত জ্বলে উঠল।
“ওফ! আমাদের গ্রুপ ডিসকাশন শুরু। ২০২৬ সালের পরিবর্তনের শেষ সুযোগ নিয়ে আলোচনা।”
সে বলল,
“দাদী, তুমি তো সেই সময়ের মানুষ। পরে তোমার কাছ থেকে কিছু রিয়েল ডাটা নিয়ে নেব।”
দরজাটা আবার নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। হোলোগ্রাম মিলিয়ে গেল, ঘরটা ফাঁকা হয়ে গেল। আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম জানালার পাশে।
আকাশে যন্ত্রের ছায়া, নিঃশব্দ শহর, আর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা।
পুরোনো স্মৃতিগুলো মনে করতে করতে হঠাৎ ভেসে উঠল—
ডিজিটাল সতর্কবার্তা, “অক্সিজেন মাত্রা ৫%”। আমি শ্বাস নিতে গিয়েও থমকে গিয়েছিলাম, ড্রোনে ভরা আকাশ, কৃত্রিম মেঘ, আর নিঃশ্বাসের হিসেব।
হঠাৎ আমি নিঃশ্বাস নিতে গেলাম- বুক ভারী হয়ে এলো। চোখ বন্ধ করলাম
হঠাৎ চোখ খুলেই চমকে গেলাম, যেন সব বদলে গেল…
পাখির কাকলি, রিকশার ঘণ্টা, গাড়ির হর্ন— সব আবার কানে ভেসে উঠল। জানালার বাইরে জীবন্ত পৃথিবী। দেওয়ালে ঝুলছে ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডার।
আমি থমকে গেলাম।
আমরা কি সত্যিই ভবিষ্যতে চলে গিয়েছিলাম? নাকি সবটাই স্বপ্ন?
না… এটা শুধু স্বপ্ন নয়। এটা এমন এক সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ, যা মানুষের জন্য হতে পারে ভয়ংকর সতর্কবার্তা।
আজও আকাশ নীল, আজও গাছ আছে জঙ্গলে, আজও সময় আছে হাতে।
কিন্তু যদি আমরা না বদলাই, তাহলে একদিন সত্যিই নিঃশ্বাসশূন্য হয়ে যাবে এই পৃথিবী।
আর তখন শুধু একটি সত্যই থাকবে—
মানুষ নিজেই নিজের পৃথিবীকে নিঃশ্বাসশূন্য করে তুলেছিল।
Reporter Name 




















