আমাদের ই-পেপার পড়তে ভিজিট করুন
ই-পেপার 📄
০৫:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

“নিঃশব্দ প্রার্থনার মানুষ” গল্পটি লিখেছেন লেখক মোঃ তানজিমুল ইসলাম

  • Reporter Name
  • প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:৩১:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
  • ৪১৭ পড়া হয়েছে

{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":[],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{"transform":1},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":true,"containsFTESticker":false}

৪৭৩

নিঃশব্দ প্রার্থনার মানুষ

লেখক: মোঃ তানজিমুল ইসলাম

রাত তখন প্রায় তিনটা। পুরো শহর ঘুমিয়ে আছে। দূরের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসছে কোরআন তিলাওয়াতের মৃদু সুর। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নক্ষত্র, আর ছাদের এক কোণে বসে আছে এক যুবক। হাতে তার পুরোনো ফোন, স্ক্রিনে জ্বলছে একটি পুরোনো ম্যাসেন্জার চ্যাট। শেষ মেসেজে লেখা,  “ভালো থাকবেন।”

মাত্র দুটি শব্দ। অথচ এই দুটি শব্দের ভেতরে জমে আছে হাজারো অভিমান, অগণিত কান্না আর অসমাপ্ত ভালোবাসা। সে অনেকক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের স্মৃতি কখনো হারিয়ে যায় না। তারা থেকে যায় রাতের বাতাসে, বৃষ্টির শব্দে, নির্জন ছাদের নীরবতায় কিংবা গভীর রাতের দীর্ঘশ্বাসে। আর যে মানুষটিকে সে এত ভালোবেসেছিল, তাকে সে নিজের মনে এক নামেই ডাকতো,  “বাবুর আম্মু”।

এই নামের ভেতরে ছিল মায়া, শান্তি, আর এক অদ্ভুত ভালোবাসা; এমন এক অনুভূতি, যা ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না।

পরিচয়টা হয়েছিল এক বর্ষার সন্ধ্যায়। সেদিন আকাশ ভরা কালো মেঘ। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল জানালার কাঁচে। ফেসবুকে সাহিত্য নিয়ে একটি পোস্ট পড়ছিল সে। হঠাৎ চোখে পড়ে একটি মন্তব্য,
“মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো, নিজের ব্যথা কাউকে বোঝাতে না পারা।”

লাইনটা পড়ে বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অনুভূতি জন্মেছিল। মনে হয়েছিল, এই কথার আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর কোনো কষ্ট। অনেক ভেবেচিন্তে একটি ছোট্ট মেসেজ পাঠানো হয়েছিল,
“সব কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, কিছু কষ্ট শুধু অনুভব করতে হয়।”

কয়েক মিনিট পর রিপ্লাই এলো,
“ঠিক বলেছেন।”

সেখান থেকেই শুরু।

প্রথমে সাহিত্য, কবিতা, গল্প আর বই নিয়ে কথা হতো। তারপর ধীরে ধীরে জীবনের গোপন অধ্যায়গুলোও খুলতে শুরু করলো। “বাবুর আম্মু” বাইরে থেকে খুব হাসিখুশি ছিল। সবাইকে হাসাতো, সবাইকে সাহস দিতো। কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক গভীর একাকীত্ব। কখনো গভীর রাতে লিখতো,
“জানেন, কিছু মানুষ আছে, যারা হাসতে হাসতে ভেতরে ভেঙে পড়ে।”

এই কথাগুলো পড়ে বুকের ভেতর কেমন যেন হাহাকার জেগে উঠতো। মনে হতো, মানুষটা হয়তো কাউকে খুব করে খুঁজছে,  এমন কাউকে, যে তার না বলা কান্নাগুলো বুঝবে।

দিন যেতে লাগলো। কথার পরিমাণ বাড়তে লাগলো। সকাল শুরু হতো,  “ঘুম থেকে উঠেছেন?” দিয়ে, আর রাত শেষ হতো,   “খেয়াল রাখবেন।” দিয়ে। একসময় এমন অবস্থা হলো, একদিন কথা না বললে দু’জনেরই অস্থির লাগতো।

কখন যে “বাবুর আম্মু” হৃদয়ের ভেতরে গভীর জায়গা করে নিয়েছে, সেটা বুঝতেই পারেনি সে। হয়তো সেই রাতে, যখন “বাবুর আম্মু” লিখেছিল,
“আজ খুব মন খারাপ।”

আর পুরো রাত জেগে তার জন্য দোয়া করা হয়েছিল। অথবা সেই মুহূর্তে, যখন হঠাৎ লিখেছিল,
“আপনি থাকলে মনটা শান্ত লাগে।”

এই ছোট ছোট বাক্যগুলোই ধীরে ধীরে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় অনুভূতি হয়ে উঠেছিল। রাত গভীর হলে দু’জন গল্প করতো। কখনো আকাশ নিয়ে, কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে, কখনো আবার জীবনের না বলা কষ্টগুলো নিয়ে।

একদিন “বাবুর আম্মু” হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল,
“আপনি কখনো কাউকে হারিয়েছেন?”

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর উত্তর এসেছিল,
“হ্যাঁ, অনেক মানুষকে। কিন্তু কিছু মানুষকে হারানোর ভয় সবচেয়ে বেশি লাগে।”

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা ছিল। তারপর একটি ছোট্ট রিপ্লাই,
“আমাকেও হারিয়ে ফেলবেন না তো?”

সেদিন বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়েছিল।

অনেকদিন পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হলো। বিকেলের নরম আলোয় শহরটা তখন অন্যরকম সুন্দর লাগছিল। বাতাসে ছিল হালকা শীতের ছোঁয়া। দূর থেকে যখন “বাবুর আম্মু”-কে দেখা গেল, মনে হয়েছিল সময় হঠাৎ থেমে গেছে। সাদা ওড়না, শান্ত চোখ, ঠোঁটে মিষ্টি হাসি।

প্রথম কয়েক মিনিট কেউ কোনো কথা বলতে পারেনি। শুধু দু’জন দু’জনকে দেখছিল।

তারপর “বাবুর আম্মু” মুচকি হেসে বলেছিল,
“এত চুপ কেন?”

উত্তরে শুধু বলা হয়েছিল,
“কিছু অনুভূতি শব্দ খুঁজে পায় না।”

সেদিন তারা অনেক কথা বলেছিল। স্বপ্ন, ভয়, ভবিষ্যৎ, একাকীত্ব,  সবকিছু। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ “বাবুর আম্মু” বলেছিল,
“আপনি জানেন? আপনার সাথে কথা বললে মনে হয় পৃথিবীটা একটু শান্ত।”

এই কথাটা শুনে বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা প্রশান্তি নেমে এসেছিল।

বিকেলের শেষ আলো মিলিয়ে যাওয়ার আগে “বাবুর আম্মু” হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল,
“আপনি কখনো বদলে যাবেন না তো?”

উত্তরে শান্ত কণ্ঠে বলা হয়েছিল,
“মানুষ বদলায়, কিন্তু কিছু অনুভূতি কখনো বদলায় না।”

কিন্তু সব সুন্দর গল্পের মাঝেই হঠাৎ ঝড় আসে।

একদিন “বাবুর আম্মু” বদলে যেতে শুরু করলো। আগের মতো আর মেসেজ আসতো না। অনলাইনে থেকেও উত্তর দিতো না। পুরো দিন কেটে যেত কোনো খবর ছাড়া। অনেক সাহস করে এক রাতে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল,
“আপনি কি দূরে সরে যাচ্ছেন?”

অনেকক্ষণ পর রিপ্লাই এলো,
“কিছু দূরত্ব ভালো।”

মাত্র তিনটি শব্দ। কিন্তু সেই তিনটি শব্দ যেন পুরো পৃথিবীকে নিঃশব্দ করে দিয়েছিল। সেদিন রাতভর ছাদে বসে আকাশ দেখা হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আকাশটাও আজ খুব একা। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছিল ধীরে ধীরে। আর বুকের ভেতরে জমে উঠছিল অদ্ভুত এক শূন্যতা।

তারপর শুরু হলো অপেক্ষা।

প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই ফোন হাতে নেওয়া হতো। ম্যাসেন্জার খুলে দেখা হতো। কোনো মেসেজ নেই। রাত হলে ছাদে গিয়ে আকাশ দেখা হতো। ভাবা হতো,
“আজ কি সে আমাকে মনে করেছে?”

বন্ধুরা বলতো,
“ভুলে যান।”

কিন্তু কিছু মানুষকে কি সত্যিই ভুলে যাওয়া যায়?

পুরোনো চ্যাট পড়া হতো। ভয়েস মেসেজ শোনা হতো। একটি লাইনে এসে বারবার থেমে যাওয়া হতো,
“আপনি না থাকলে আমি এত হাসতে পারতাম না।”

এই ছোট্ট বাক্যটাই আবার বাঁচিয়ে রাখতো।

সময় বদলে গেছে। এখন আর “বাবুর আম্মু” সরাসরি কোনো খোঁজ নেয় না। কোনো “কেমন আছেন?” আসে না। কোনো গভীর রাতের মেসেজ আসে না। তবুও মাঝেমধ্যে তার আশেপাশের মানুষের মাধ্যমে খবর আসে,
“সে নাকি জানতে চেয়েছিল, আপনি কেমন আছেন।”

এই ছোট্ট খবরটুকুই বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক আলো জ্বালিয়ে দেয়। মনে হয়, হয়তো সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। হয়তো দূরত্ব বেড়েছে, কিন্তু অনুভূতি পুরোপুরি মরে যায়নি।

কখনো আবার শোনা যায়,
“আপনার লেখা নাকি এখনো পড়ে।”

এই কথাগুলো শুনে নিঃশব্দে হাসি আসে। আবার চোখের কোণ ভিজেও ওঠে। কারণ কিছু সম্পর্ক কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। তারা শুধু নীরব হয়ে যায়।

তবুও কখনো “বাবুর আম্মু”-র জন্য খারাপ কিছু চাওয়া হয়নি। প্রতিটি নামাজ শেষে শুধু দোয়া করা হতো,
“হে আল্লাহ, তাকে সুখে রেখো।”

কারণ তখন বুঝে যাওয়া হয়েছিল,  ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের করে পাওয়া নয়। ভালোবাসা মানে দূরে থেকেও তার সুখের জন্য প্রার্থনা করা।

একদিন গভীর রাতে পুরোনো চ্যাট খুলে বসা হয়েছিল। ভয়েস মেসেজ শুনতে শুনতে হঠাৎ মনে হলো, মানুষটা যেন এখনো খুব কাছেই আছে। তার হাসির শব্দ আজও বুক কাঁপিয়ে দেয়। মনে পড়ে সেই কথা,
“আপনি থাকলে মনটা শান্ত লাগে।”

কিন্তু এখন আর সেই মানুষটা পাশে নেই। আছে শুধু স্মৃতি, অপেক্ষা আর নীরব প্রার্থনা।

আজও মাঝরাতে ছাদে যাওয়া হয়। আকাশ দেখা হয়। বাতাসে হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠ খোঁজা হয়। কখনো চাঁদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলা হয়,
“তুমি সুখে থাকো… আমার ভালোবাসা এতটুকুই।”

কারণ এখন বুঝে যাওয়া গেছে,  সব ভালোবাসার শেষ একসাথে হওয়া নয়। কিছু ভালোবাসা শুধু দোয়া হয়ে বেঁচে থাকে। কখনো স্মৃতিতে, কখনো রাতের নিঃশব্দ কান্নায়, কখনো কোনো নামহীন অপেক্ষায়।

কখনো মনে হয়, “বাবুর আম্মু” হয়তো বুঝতেই পারেনি কতটা ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল এই নীরবতার ভেতরে। আবার কখনো মনে হয়, হয়তো বুঝেছিল, কিন্তু সময় আর পরিস্থিতি মানুষকে অনেক কিছু থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

তবুও কোনো অভিযোগ নেই। কোনো ঘৃণা নেই। আছে শুধু এক নিঃশব্দ প্রার্থনা,

“হে আল্লাহ, তাকে সবসময় সুখে রেখো। তার জীবনের সব কষ্ট দূর করে দাও। তার হাসি যেন কখনো ম্লান না হয়।”

কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো কাউকে কাঁদাতে চায় না। সত্যিকারের ভালোবাসা দূরে থেকেও মানুষটার শান্তি কামনা করে।

আর সেই নিঃশব্দ ভালোবাসার নাম,
“বাবুর আম্মু…”

এই বিষয়ের ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সাংবাদিকের তথ্য জানুন

🎉 Shapno24 প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী 🎉

আগামী ৩১ জুলাই www.shapno24.com এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হবে।

🎊 শুভেচ্ছা কার্ড তৈরি করুন 🎊

নিজের নাম দিয়ে আকর্ষণীয় Greeting Card তৈরি করুন।

Greeting Card তৈরি করুন

“নিঃশব্দ প্রার্থনার মানুষ” গল্পটি লিখেছেন লেখক মোঃ তানজিমুল ইসলাম

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:৩১:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
৪৭৩

নিঃশব্দ প্রার্থনার মানুষ

লেখক: মোঃ তানজিমুল ইসলাম

রাত তখন প্রায় তিনটা। পুরো শহর ঘুমিয়ে আছে। দূরের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসছে কোরআন তিলাওয়াতের মৃদু সুর। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নক্ষত্র, আর ছাদের এক কোণে বসে আছে এক যুবক। হাতে তার পুরোনো ফোন, স্ক্রিনে জ্বলছে একটি পুরোনো ম্যাসেন্জার চ্যাট। শেষ মেসেজে লেখা,  “ভালো থাকবেন।”

মাত্র দুটি শব্দ। অথচ এই দুটি শব্দের ভেতরে জমে আছে হাজারো অভিমান, অগণিত কান্না আর অসমাপ্ত ভালোবাসা। সে অনেকক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের স্মৃতি কখনো হারিয়ে যায় না। তারা থেকে যায় রাতের বাতাসে, বৃষ্টির শব্দে, নির্জন ছাদের নীরবতায় কিংবা গভীর রাতের দীর্ঘশ্বাসে। আর যে মানুষটিকে সে এত ভালোবেসেছিল, তাকে সে নিজের মনে এক নামেই ডাকতো,  “বাবুর আম্মু”।

এই নামের ভেতরে ছিল মায়া, শান্তি, আর এক অদ্ভুত ভালোবাসা; এমন এক অনুভূতি, যা ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না।

পরিচয়টা হয়েছিল এক বর্ষার সন্ধ্যায়। সেদিন আকাশ ভরা কালো মেঘ। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল জানালার কাঁচে। ফেসবুকে সাহিত্য নিয়ে একটি পোস্ট পড়ছিল সে। হঠাৎ চোখে পড়ে একটি মন্তব্য,
“মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো, নিজের ব্যথা কাউকে বোঝাতে না পারা।”

লাইনটা পড়ে বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অনুভূতি জন্মেছিল। মনে হয়েছিল, এই কথার আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর কোনো কষ্ট। অনেক ভেবেচিন্তে একটি ছোট্ট মেসেজ পাঠানো হয়েছিল,
“সব কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, কিছু কষ্ট শুধু অনুভব করতে হয়।”

কয়েক মিনিট পর রিপ্লাই এলো,
“ঠিক বলেছেন।”

সেখান থেকেই শুরু।

প্রথমে সাহিত্য, কবিতা, গল্প আর বই নিয়ে কথা হতো। তারপর ধীরে ধীরে জীবনের গোপন অধ্যায়গুলোও খুলতে শুরু করলো। “বাবুর আম্মু” বাইরে থেকে খুব হাসিখুশি ছিল। সবাইকে হাসাতো, সবাইকে সাহস দিতো। কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক গভীর একাকীত্ব। কখনো গভীর রাতে লিখতো,
“জানেন, কিছু মানুষ আছে, যারা হাসতে হাসতে ভেতরে ভেঙে পড়ে।”

এই কথাগুলো পড়ে বুকের ভেতর কেমন যেন হাহাকার জেগে উঠতো। মনে হতো, মানুষটা হয়তো কাউকে খুব করে খুঁজছে,  এমন কাউকে, যে তার না বলা কান্নাগুলো বুঝবে।

দিন যেতে লাগলো। কথার পরিমাণ বাড়তে লাগলো। সকাল শুরু হতো,  “ঘুম থেকে উঠেছেন?” দিয়ে, আর রাত শেষ হতো,   “খেয়াল রাখবেন।” দিয়ে। একসময় এমন অবস্থা হলো, একদিন কথা না বললে দু’জনেরই অস্থির লাগতো।

কখন যে “বাবুর আম্মু” হৃদয়ের ভেতরে গভীর জায়গা করে নিয়েছে, সেটা বুঝতেই পারেনি সে। হয়তো সেই রাতে, যখন “বাবুর আম্মু” লিখেছিল,
“আজ খুব মন খারাপ।”

আর পুরো রাত জেগে তার জন্য দোয়া করা হয়েছিল। অথবা সেই মুহূর্তে, যখন হঠাৎ লিখেছিল,
“আপনি থাকলে মনটা শান্ত লাগে।”

এই ছোট ছোট বাক্যগুলোই ধীরে ধীরে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় অনুভূতি হয়ে উঠেছিল। রাত গভীর হলে দু’জন গল্প করতো। কখনো আকাশ নিয়ে, কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে, কখনো আবার জীবনের না বলা কষ্টগুলো নিয়ে।

একদিন “বাবুর আম্মু” হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল,
“আপনি কখনো কাউকে হারিয়েছেন?”

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর উত্তর এসেছিল,
“হ্যাঁ, অনেক মানুষকে। কিন্তু কিছু মানুষকে হারানোর ভয় সবচেয়ে বেশি লাগে।”

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা ছিল। তারপর একটি ছোট্ট রিপ্লাই,
“আমাকেও হারিয়ে ফেলবেন না তো?”

সেদিন বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়েছিল।

অনেকদিন পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হলো। বিকেলের নরম আলোয় শহরটা তখন অন্যরকম সুন্দর লাগছিল। বাতাসে ছিল হালকা শীতের ছোঁয়া। দূর থেকে যখন “বাবুর আম্মু”-কে দেখা গেল, মনে হয়েছিল সময় হঠাৎ থেমে গেছে। সাদা ওড়না, শান্ত চোখ, ঠোঁটে মিষ্টি হাসি।

প্রথম কয়েক মিনিট কেউ কোনো কথা বলতে পারেনি। শুধু দু’জন দু’জনকে দেখছিল।

তারপর “বাবুর আম্মু” মুচকি হেসে বলেছিল,
“এত চুপ কেন?”

উত্তরে শুধু বলা হয়েছিল,
“কিছু অনুভূতি শব্দ খুঁজে পায় না।”

সেদিন তারা অনেক কথা বলেছিল। স্বপ্ন, ভয়, ভবিষ্যৎ, একাকীত্ব,  সবকিছু। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ “বাবুর আম্মু” বলেছিল,
“আপনি জানেন? আপনার সাথে কথা বললে মনে হয় পৃথিবীটা একটু শান্ত।”

এই কথাটা শুনে বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা প্রশান্তি নেমে এসেছিল।

বিকেলের শেষ আলো মিলিয়ে যাওয়ার আগে “বাবুর আম্মু” হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল,
“আপনি কখনো বদলে যাবেন না তো?”

উত্তরে শান্ত কণ্ঠে বলা হয়েছিল,
“মানুষ বদলায়, কিন্তু কিছু অনুভূতি কখনো বদলায় না।”

কিন্তু সব সুন্দর গল্পের মাঝেই হঠাৎ ঝড় আসে।

একদিন “বাবুর আম্মু” বদলে যেতে শুরু করলো। আগের মতো আর মেসেজ আসতো না। অনলাইনে থেকেও উত্তর দিতো না। পুরো দিন কেটে যেত কোনো খবর ছাড়া। অনেক সাহস করে এক রাতে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল,
“আপনি কি দূরে সরে যাচ্ছেন?”

অনেকক্ষণ পর রিপ্লাই এলো,
“কিছু দূরত্ব ভালো।”

মাত্র তিনটি শব্দ। কিন্তু সেই তিনটি শব্দ যেন পুরো পৃথিবীকে নিঃশব্দ করে দিয়েছিল। সেদিন রাতভর ছাদে বসে আকাশ দেখা হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আকাশটাও আজ খুব একা। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছিল ধীরে ধীরে। আর বুকের ভেতরে জমে উঠছিল অদ্ভুত এক শূন্যতা।

তারপর শুরু হলো অপেক্ষা।

প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই ফোন হাতে নেওয়া হতো। ম্যাসেন্জার খুলে দেখা হতো। কোনো মেসেজ নেই। রাত হলে ছাদে গিয়ে আকাশ দেখা হতো। ভাবা হতো,
“আজ কি সে আমাকে মনে করেছে?”

বন্ধুরা বলতো,
“ভুলে যান।”

কিন্তু কিছু মানুষকে কি সত্যিই ভুলে যাওয়া যায়?

পুরোনো চ্যাট পড়া হতো। ভয়েস মেসেজ শোনা হতো। একটি লাইনে এসে বারবার থেমে যাওয়া হতো,
“আপনি না থাকলে আমি এত হাসতে পারতাম না।”

এই ছোট্ট বাক্যটাই আবার বাঁচিয়ে রাখতো।

সময় বদলে গেছে। এখন আর “বাবুর আম্মু” সরাসরি কোনো খোঁজ নেয় না। কোনো “কেমন আছেন?” আসে না। কোনো গভীর রাতের মেসেজ আসে না। তবুও মাঝেমধ্যে তার আশেপাশের মানুষের মাধ্যমে খবর আসে,
“সে নাকি জানতে চেয়েছিল, আপনি কেমন আছেন।”

এই ছোট্ট খবরটুকুই বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক আলো জ্বালিয়ে দেয়। মনে হয়, হয়তো সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। হয়তো দূরত্ব বেড়েছে, কিন্তু অনুভূতি পুরোপুরি মরে যায়নি।

কখনো আবার শোনা যায়,
“আপনার লেখা নাকি এখনো পড়ে।”

এই কথাগুলো শুনে নিঃশব্দে হাসি আসে। আবার চোখের কোণ ভিজেও ওঠে। কারণ কিছু সম্পর্ক কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। তারা শুধু নীরব হয়ে যায়।

তবুও কখনো “বাবুর আম্মু”-র জন্য খারাপ কিছু চাওয়া হয়নি। প্রতিটি নামাজ শেষে শুধু দোয়া করা হতো,
“হে আল্লাহ, তাকে সুখে রেখো।”

কারণ তখন বুঝে যাওয়া হয়েছিল,  ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের করে পাওয়া নয়। ভালোবাসা মানে দূরে থেকেও তার সুখের জন্য প্রার্থনা করা।

একদিন গভীর রাতে পুরোনো চ্যাট খুলে বসা হয়েছিল। ভয়েস মেসেজ শুনতে শুনতে হঠাৎ মনে হলো, মানুষটা যেন এখনো খুব কাছেই আছে। তার হাসির শব্দ আজও বুক কাঁপিয়ে দেয়। মনে পড়ে সেই কথা,
“আপনি থাকলে মনটা শান্ত লাগে।”

কিন্তু এখন আর সেই মানুষটা পাশে নেই। আছে শুধু স্মৃতি, অপেক্ষা আর নীরব প্রার্থনা।

আজও মাঝরাতে ছাদে যাওয়া হয়। আকাশ দেখা হয়। বাতাসে হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠ খোঁজা হয়। কখনো চাঁদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলা হয়,
“তুমি সুখে থাকো… আমার ভালোবাসা এতটুকুই।”

কারণ এখন বুঝে যাওয়া গেছে,  সব ভালোবাসার শেষ একসাথে হওয়া নয়। কিছু ভালোবাসা শুধু দোয়া হয়ে বেঁচে থাকে। কখনো স্মৃতিতে, কখনো রাতের নিঃশব্দ কান্নায়, কখনো কোনো নামহীন অপেক্ষায়।

কখনো মনে হয়, “বাবুর আম্মু” হয়তো বুঝতেই পারেনি কতটা ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল এই নীরবতার ভেতরে। আবার কখনো মনে হয়, হয়তো বুঝেছিল, কিন্তু সময় আর পরিস্থিতি মানুষকে অনেক কিছু থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

তবুও কোনো অভিযোগ নেই। কোনো ঘৃণা নেই। আছে শুধু এক নিঃশব্দ প্রার্থনা,

“হে আল্লাহ, তাকে সবসময় সুখে রেখো। তার জীবনের সব কষ্ট দূর করে দাও। তার হাসি যেন কখনো ম্লান না হয়।”

কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো কাউকে কাঁদাতে চায় না। সত্যিকারের ভালোবাসা দূরে থেকেও মানুষটার শান্তি কামনা করে।

আর সেই নিঃশব্দ ভালোবাসার নাম,
“বাবুর আম্মু…”