
ঝড়ের পরের ভালোবাসা
জেরিন জাহান দিশা
টিনা ও রিপনের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই এক অন্যরকম বন্ধুত্ব ছিল। সেই বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে গভীর প্রেমে পরিণত হয়। গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে তারা হাত ধরে হেঁটে বেড়াত। কখনো সরিসার ফুলের ভিতর দাঁড়িয়ে মোবাইল দিয়ে সেলফি তুলত, কখনো হেসে খেলে কাদা-পানি মাখামাখি করত। তাদের হাসি আর আনন্দ যেন গ্রামের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ত।
বছর দুয়েকের প্রেমের পর তারা বিয়ে করে। গ্রামে প্রাইমারী স্কুলে চাকরি পায় দুজনে। রিপন ও টিনার সংসার ভালোই চলছিল। সকালে স্কুল, বিকেলে একসাথে ঘরে ফিরে চা খাওয়া, সন্ধ্যায় গ্রামের রাস্তায় হাত ধরে হাঁটা—সবকিছু ছিল নিরবধি সুখের।
কিন্তু জীবন সবসময় মধুর নয়। এক দুর্ঘটনার দিনই সব বদলে গেল। রিপন একটা বাইক দূর্ঘটনায় মারা যায়। সেই মুহূর্তের আঘাত টিনার ভেতর যেন এক আমফান ঝড় তৈরি করে। মন, হৃদয়, রক্ত—সবকিছুই ধ্বংসের মতো। ঝড় যেন থামছে না। স্কুলের ক্লাসরুম, রাস্তাঘাট, বটগাছের ছায়া—সব কিছুই তাকে রিপনের স্মৃতিতে আটকে রাখত।
শেষমেশ টিনাকে পোস্টিং দেওয়া হয় খলিসাকুন্ডি প্রাইমারী স্কুলে। গ্রামের পরিবেশ নতুন, কিন্তু ঝড়ের ধ্বংসের মত ভাঙা মনকে শান্ত করতে পারছে না। গ্রামটি বড়, অলিগলি, ছোটখাটো রাস্তা, অসংখ্য স্কুল, কলেজ ও মসজিদ। গ্রামজুড়ে মানুষ খুব সৌম্য আর অতিথিপরায়ণ।
টিনা ভাড়া থাকে আনিছুর রহমানের বাড়িতে। বাড়িটা তাকে খুব ভালো লেগেছে। বড় খোলা উঠান, পেছনে ছোট্ট বাগান, আশেপাশে শান্ত পরিবেশ। বাড়ির দরজা থেকে এক মিনিট হাঁটলেই বিশাল মাঠ। মাঠে গরু ও ছাগল চরছে, পাখির ডাক, বাতাসের মিষ্টি গন্ধ—সবকিছু মিলিয়ে যেন শান্তি খুঁজে পেতে সহায় করছে।
প্রতিদিন সকালে টিনা মাঠের পাশে হাঁটতে বের হয়। মাঠের ভিজে থাকা কচি ঘাস, সূর্যের আলো, পাখির গান—সবকিছু তাকে মনে করিয়ে দেয়, জীবন চলতে থাকে, ঝড়ের পরেও বিকেল আসে। কিন্তু হারানো ভালোবাসার খালি জায়গা তাকে প্রতিনিয়ত টানে।
টিনা বারান্দায় বসে কফিতে চুমুক দিচ্ছিল। হঠাৎ খেয়াল করল আকাশে কালো মেঘ ছেয়ে আছে। চারিদিকে ধুলো উড়ছে। আশেপাশের লোকজন ঘরের জানালা বন্ধ করছে। কেউ কেউ জামাকাপড় তুলছে। টিনাও বারান্দা থেকে উঠে ঘরের জানালা বন্ধ করছে, ছাদ থেকে জামাকাপড় তুলছে।
টানা তিন ঘণ্টা ঝড় চলতে থাকে। ডাঃ আনিছুর রহমান ও তার সহধর্মিণী টিনাকে মেয়ের মতো ভালোবাসে। ডাঃ আনিছুর রহমানের একটি মেয়ে, দিশা, বাইরে চাকরি করে মনোবিজ্ঞান নিয়ে। দিশা ছুটিতে এসেছে বাড়িতে। টিনার সাথে তার খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। টিনা দিশাকে তার জীবনের সব ঘটনা খুলে বলে। দিশা টিনাকে বলে, “শোন আপু, মানুষের জীবন কাকে কখন কোন দিকে নিয়ে যাবে কেউ জানে না।”
আমরা শোকাহত হয় বেশি যাদের প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। তারা আঘাত করলে কিছুই ভালো লাগেনা। তবে জানো, ওই সময়টা একা কাটাতে ইচ্ছা করে। কিন্তু একা থাকলে নানা ধরনের আজেবাজে চিন্তা হয়। মনে হয় যেন মরে গেলে ভালো হতো। কিন্তু এই কথাটা সমস্যা সমাধানে আসে না। আমরা তখন ধৈর্য্য ধরে মনের ভিতর ওই ঝড়ের সাথে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি।
আমরা অনেকেই মন খারাপ নিজের ভেতরে রেখে দিয়ে মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলি। কিন্তু ভেতরে ক্ষত থেকে যায়। তবে শোন, এই যে আজ বিকেলে ঝড় উঠতে দেখছো, চারিদিকে দেখ কত গাছের ডাল ভেঙে পড়ে আছে, কত পাখির বাসা ভেঙে গেছে, কত পাখি তার প্রিয় মানুষকে হারিয়েছে। তুমি ঝড় থামলে আমার সাথে বাইরে যাবে। তোমাকে আমি বাইরের ঝড়ের প্রমাণ দেখাব।
ঝড় থামলে দিশা টিনাকে বাইরে নিয়ে গেল। কাঁঠাল গাছের ডাল ভেঙে গেছে, আর আম গাছে আম পড়ে ছেয়ে আছে। ছেলেমেয়েরা কুড়াচ্ছে। দিশাও টিনা বাড়ি থেকে বস্তা ও ডালি নিয়ে আম কুড়িয়ে রেখে দিল। হঠাৎ দিশা খেয়াল করল, তাদের ভেটুল গাছে যে পাখির বাসা ছিল, সেটি ভেঙে গেছে। পাখিটা আবার বাসা তৈরি করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিশা টিনাকে বিষয়টা দেখালো। দিশা বলল, “কি বুঝলে আপু? সবাই ঝড়ের সম্মুখীন হয়।”
তাই বলে ভেঙে পড়তে নেই। পাশের ডোবা থেকে ব্যাঙ জোরে জোরে ডাকছে। ছেলেমেয়েরা বৃষ্টির কাদামাটিতে ছেচুড় খেলছে। হাঁস-মুরগিগুলো বাইরে বের হওয়ার জন্য ডাকাডাকি করছে। গরুছাগল ডাকছে। মাটিতে বাঁশের পাতা, আম ও কাঁঠালের পাতা পড়ে ছেয়ে আছে।
মাটিতে পড়া পাতা আর ঝরাপাতার গন্ধে টিনা বুঝল, ঝড় শেষ হলেও জীবন ধীরে ধীরে নতুন আলো আর শান্তি পায়
মাটিতে পড়া পাতা আর ঝরাপাতার গন্ধে টিনা বুঝল, ঝড় শেষ হলেও জীবন ধীরে ধীরে নতুন আলো আর শান্তি পায়।
সূর্য ধীরে ধীরে মেঘের ফাঁক দিয়ে ঝলমল করে উঠল। পাশে মাঠে শিশুরা খেলছে, পাখিরা গান গাইছে। বাতাসে ঘাসের সুবাস মিশে টিনার মনে হলো, জীবন এখনও সুন্দর।
দিশা টিনার হাত ধরে বলল, “দেখো, ঝড় শেষ হয়েছে। এখন নতুন গল্প শুরু করার পালা।” টিনা হেসে মাথা নাড়ল। সে বুঝল, হারানো প্রেমের স্মৃতি তাকে শক্তিশালী করেছে। ধীরেসুস্থে, টিনা আবার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।
Reporter Name 



















