
গল্পের নাম: চরিত্রহীন
লেখক: মোঃ জাহিদুল ইসলাম জাহিদ
সংসার শব্দটি ছোট হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে বিশাল এক জগৎ। বিশ্বাস, ভালোবাসা, ত্যাগ আর সহনশীলতার সুতোয় গাঁথা এক পবিত্র মসজিদ যেন সংসার। কিন্তু সেই মসজিদে যদি একদিন লালসার ঝড় ওঠে? যদি বিশ্বাসের আলো নিভে যায়? তখন মানুষের হৃদয়ের ভেতরে জন্ম নেয় এক গভীর শূন্যতা, যার শব্দ কেউ শোনে না শুধু অনুভব করে।
মিলির জীবনও একসময় এমনই এক স্বপ্ন দিয়ে শুরু হয়েছিল।
বিয়ের দিনটিতে সে ছিলো লাল শাড়িতে মোড়া এক নববধূ।
চোখে নতুন জীবনের আলো। সে মনে করেছিল আজ থেকে শুরু হবে এক নতুন অধ্যায়, যেখানে থাকবে ভালোবাসা, নিরাপত্তা আর শ্রদ্ধা।
তার স্বামীর নাম ছিল আরমান।
প্রথম প্রথম সবকিছুই সুন্দর ছিল। নতুন সংসার, নতুন মানুষ, নতুন স্বপ্ন। আরমান তাকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যেত, গল্প করত, মাঝে মাঝে ছোট ছোট উপহার এনে দিত। মিলি তখন মনে করত এই মানুষটিই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
কিন্তু মানুষের ভেতরের সত্য কখনো কখনো খুব ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।
বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই মিলি লক্ষ্য করতে লাগল আরমান বদলে যাচ্ছে। সে অনেক রাত করে বাসায় ফিরতে শুরু করল। ফোনে কারো সাথে লুকিয়ে কথা বলত। মিলি কাছে গেলেই হঠাৎ ফোনটা রেখে দিত।
প্রথমে সে ভাবত হয়তো অফিসের চাপ, হয়তো বন্ধুবান্ধবের আড্ডা।
কিন্তু একদিন সত্য নিজেই সামনে এসে দাঁড়াল।
সেদিন বিকেলে আরমান গোসল করতে গিয়েছিল। তার ফোনটা টেবিলের উপরেই পড়ে ছিল। হঠাৎ একটা মেসেজ ভেসে উঠল।
গত রাতটা খুব সুন্দর ছিল… আবার কবে দেখা হবে?
মিলির বুকটা যেন হঠাৎ কেঁপে উঠল।
হাত কাঁপতে কাঁপতে সে ফোনটা হাতে নিল। মেসেজগুলো খুলে দেখল। সেখানে ছিলো অসংখ্য গোপন কথা অন্তরঙ্গ, নিষিদ্ধ, লজ্জাজনক।
সেই মুহূর্তে মনে হলো যেন তার জীবনের আকাশে সূর্যগ্রহণ লেগেছে।
আরমান যখন বাথরুম থেকে বের হলো, মিলি শান্ত গলায় শুধু একটি প্রশ্ন করল
এই মেয়েটা কে?
আরমান প্রথমে অস্বীকার করল। বলল অফিসের কলিগ।
কিন্তু সত্য বেশিদিন লুকিয়ে থাকে না। কিছুদিনের মধ্যেই মিলি বুঝে গেল এটা শুধু একজন নারী নয়।
আরমানের জীবনে অনেক নারী ছিল।
কখনো অফিসের সহকর্মী, কখনো পুরোনো বান্ধবী, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত কেউ।
মিলি তখন বুঝতে পারল সে এমন একজন মানুষের সাথে সংসার করছে, যার কাছে ভালোবাসা নয়, লালসাই প্রধান।
তবুও জীবন থেমে থাকে না।
সময়ের সাথে তাদের সংসারে জন্ম নিল দুই সন্তান একটি মেয়ে আর একটি ছেলে।
মেয়েটি বড় হয়ে পড়াশোনার জন্য চলে গেল ইংল্যান্ডে। ছেলেটি পড়তে পড়তে পাড়ি জমাল কানাডায়।
মিলি ভেবেছিল সন্তানদের জন্য হলেও হয়তো আরমান বদলে যাবে। কিন্তু মানুষ যদি নিজের ভেতরের অন্ধকার বদলাতে না চায়, তাকে বদলানো যায় না।
বছরের পর বছর একই ছাদের নিচে থেকেও তাদের মাঝে জন্ম নিল এক অদৃশ্য দূরত্ব।
কথা কমে গেল। হাসি হারিয়ে গেল।
একদিন মিলি রাস্তায় ভয়াবহ এক দুর্ঘটনার শিকার হলো।
একটি দ্রুতগামী গাড়ি তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়।
অনেক দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল তাকে। জীবন বেঁচে গেলেও তার পায়ে স্থায়ী সমস্যা হয়ে গেল। আগের মতো হাঁটতে পারত না সে।
সেই সময় মিলি ভেবেছিল হয়তো আরমান একটু বদলাবে, একটু সহানুভূতি দেখাবে।
কিন্তু মানুষের চরিত্র যদি শূন্য হয়, সেখানে সহানুভূতিরও জন্ম হয় না।
আরমান আগের মতোই নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকল।
মিলি ধীরে ধীরে নিজের ভেতর গুটিয়ে গেল।
তার মেয়ের বিয়ে হলো বিদেশেই। মেয়ের জামাই ভদ্র মানুষ হলেও সময়ের সাথে দূরত্ব বাড়তে লাগল। ফোনে কথাবার্তা কমে গেল।
ছেলেও কানাডায় নিজের সংসারে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
একসময় মিলি বুঝতে পারল তার চারপাশের পৃথিবীটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
এখন তার দিন কাটে এক ছোট্ট ঘরের ভেতর।
ঘরের জানালার পাশে একটি পুরোনো চেয়ার। সেখানে বসে সে মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
পায়ের ব্যথা এখন অনেক বেড়ে গেছে। বয়সও তাকে দুর্বল করে দিয়েছে।
তবুও সময় কাটানোর জন্য সে আবার পুরোনো অভ্যাসগুলো ফিরিয়ে এনেছে।
কবিতা লিখে।
পুরোনো গান গায়।
কখনো কখনো নিজের লেখা কবিতা আস্তে আস্তে পড়তে থাকে।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় অপেক্ষা এখন ফোনের রিংটোন।
ইংল্যান্ড থেকে মেয়ের ফোন আসবে এই আশায়।
কানাডা থেকে ছেলের ফোন আসবে এই আশায়।
ফোনটা বেজে উঠলেই তার চোখে আলো জ্বলে ওঠে।
কিন্তু অনেক দিন এমন যায় ফোন বাজে না।
তখন ঘরের নীরবতা আরও ভারী হয়ে ওঠে।
একসময় যে মিলি হাসিখুশি ছিল, স্বপ্নে ভরা ছিল সেই মিলি যেন আজ আর নেই।
তার জায়গায় বসে আছে এক ক্লান্ত, অসুস্থ, নিঃসঙ্গ মানুষ।
তার চোখে এখন শুধু স্মৃতির ছায়া।
রাতের বেলা মাঝে মাঝে সে পুরোনো ডায়েরি খুলে বসে।
সেখানে লেখা আছে তার কবিতা, তার কান্না, তার জীবনের ইতিহাস।
কখনো কখনো সে নিজের লেখা কবিতাটা আস্তে করে পড়ে
“আমার নীরবতা দুর্বলতা নয়,
এ নীরবতা একদিন ঝড় হয়ে উঠবে
কিন্তু এখন সেই ঝড়ের শক্তিও আর তার মধ্যে নেই।
শুধু আছে এক দীর্ঘশ্বাস।
জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মিলি এখন বুঝেছে
মানুষের সবচেয়ে বড় একাকীত্ব হলো তখন,
যখন সে ভরা সংসারের মাঝেও একা হয়ে যায়।
একদিন সন্ধ্যায় জানালার পাশে বসে মিলি আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।
সূর্য ডুবে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে।
আকাশে লাল আলো ছড়িয়ে পড়ছিল।
মিলি মনে মনে বলল
হয়তো আমার জীবনও এমনই এক গোধূলি।
তার চোখে তখন অদ্ভুত এক শান্তি।
কারণ সে জানে
জীবন তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে,
তবুও তার ভেতরের মানুষটা এখনো মরে যায়নি।
সে এখনো কবিতা লিখতে পারে।
এখনো গান গাইতে পারে।
আর এখনো অপেক্ষা করতে পারে
দূর দেশের ফোনের শব্দের জন্য।
সেই অপেক্ষার ভেতরেই যেন বেঁচে আছে
এক নিঃসঙ্গ, তবুও মিলি ভাবে তার গভীর মানবিক জীবনের গল্পটা নষ্ট হয়নি এক চরিত্রহীন মানুষের জন্য।তার জীবনের সব কিছু শেষ হয়ে গেলেও ভিতরের মানুষটা
বেঁচে আছে এখনো নতুন বসন্তের গল্পে।
Reporter Name 




















