আমাদের ই-পেপার পড়তে ভিজিট করুন
ই-পেপার 📄
০৮:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গল্প- বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি লিখেছেন – শেখ মিন্নাতুল মকসুদ অর্চি

  • Reporter Name
  • প্রকাশিত হয়েছে: ১০:৩৫:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৫
  • ১৭১ পড়া হয়েছে
১৩৬

গ্রামে মেলা বসেছে।চারিদিকে বাঁশীর শব্দ, নাগর-দোলায় ছেলে-পুলের চিৎকার, হৈ-হুল্লোড়। চুড়ি,মালা,টিপ,আলতা কিনতে মেয়েদের ভিড়।মাটির বাসন কিনতে ভিড় মহিলাদের। পুরুষদের আনা-গুনাও কম নয়।কি নেই মেলাতে!সবই পাওয়া যায় এখন গ্রামের মেলাতে।বিস্তারিত বলে কি আর শেষ করা যাবে!তাই আর নাই বা বললাম। এমন মেলাতেই এসেছে অবনী।না মেলা দেখতে নয়,মেলায় জিনিস বিক্রি করে পেট চালাতে।একুল-ওকুল দুকুলেই কেউ নেই অবনীর।জানে না বাবা-মার নাম,জন্ম পরিচয়, বা আত্মীয়দের ঠিকানা। অনাথ আশ্রমে থাকত আগে,এখন একাই থাকে।গ্রামের একটা সংস্থাতে উলের জিনিস বানায়,ওটা বিক্রি করেই পেট চলে ওর।আজও উলের কিছু ছোট বাচ্চাদের টুপি,সোয়েটার বিক্রি করতে মেলায় এসেছে অবনী। এই মেলাতে প্রচুর শহুরে মানুষ আসে।প্রচুর ভিড় হয় মেলাতে।যদি একটু উপার্জন হয় এই জন্যই আসা অবনীর।এদিক ওদিক ঘুরছিল অবনী।পেছন থেকে কে একজন ডাকলো,এই ফেরিওয়ানী!পিছন ফিরে অবনী দেখলো,তার বয়সীই একটা মেয়ে স্বামীর সাথে বাবু কোলে নিয়ে এক গাল হাসি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবনীকে বলছে, দেখি বাবুর জন্য টুপি,সোয়েটার দেখি!অবনী তার বুনা সবচেয়ে সুন্দর সোয়েটার, টুপিগুলো বের করলো। মেয়েটি তার স্বামীকে বললো, এই বাবুকে কোলে নাও,আমি দেখি কি কেনা যায়। মেয়েটিকে দেখেই বুঝা যায় বড়ই সুখী মানুষ, স্বামী সন্তান নিয়ে। এই বয়সে অবনীর ও এমন একটা সংসার হওয়ার কথা ছিলো। একটা সন্তান কোল জুড়ে থাকার কথা ছিল।কিন্তু এমন এতিম অনাথ মেয়েকে কে বিয়ে করবে? দেখতে অসুন্দর নয় অবনী।অসম্ভব মায়াবী চেহারা, টানা টানা চোখ, লম্বা ঢেউ তুলা চুল,ফর্সা গায়ের রং। এতিম খানায় থাকলে হয়তো তারা একটা বিয়ে দিত।কিন্তু অবনী আগেই ওখান থেকে চলে আসে পালিয়ে।এসব ভাবতে ভাবতে হটাৎ হাত থেকে কিছু টুপি পরে গেল। অবনী তুলতে চাইলেই হটাৎ একজন লোক টুপি গুলো তুলে দিলো। টুপি গুলো অবনীর হাতে দিয়ে বললো, পাশ দিয়েই যাচ্ছিলাম, পরে গেল দেখলাম আপনার হাতে অনেক জিনিস তাই তুলে দিলাম আরকি।বলে সাথে সাথেই চলে গেল। অবনী তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে।শহুরে ছেলে দেখেই বুঝা যায়,লম্বা,স্মার্ট, হ্যান্ডসাম দেখতে। হয়তোবা পরোপকারী ও।হটাৎ বাবুর মা টি বলে উঠলো, কই আমাকে ঐ টুপি টা দিন।নরম, বাবুর আরামই লাগবে মনে হয়। আরও কয়েক ঘন্টা টুপি, সোয়েটার বিক্রি করে ক্লান্ত অবনী মেলা থেকে দূরে একটা গাছের নিচে বসল।চোখ পরতেই দেখলো ঐ ছেলেটা। এখানে কিছু বাচ্চাদের হাওয়ায় মিঠাই কিনে দিচ্ছে। অবনীর ঠোঁটের কোনে একটু হাসি উঠলো ছেলেটিকে দেখে।ছেলেটি অবনীকে খেয়াল করেনি।অবনীও একটু গাছে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলো হটাৎ ভিষণ জোরে ভয়ংকর শব্দ হলো। অবনী অনুভব করলো তার শরীরে যেন আগুনের ফুলকি এসে লাগলো। তাকিয়ে দেখলো সব অন্ধকার ধোঁয়ায় ঝাপসা। কানে যেন তরঙ্গ আসলো চিৎকার, আহাজারির।অবনী দেখলো তার শরীরের কিছু অংশ যেমন হাত এর অংশ,পার গোড়ালি থেকে রক্ত ঝরছে।অবনী কিছুই বুঝতে পারছে না কি হলো। ঝাপসা চারপাশ একটু পরিষ্কার হলে দেখতে পারলো মানুষ সব ছোটাছুটি করছে। নিজের মতো করে বাঁচার চেষ্টা করছে।প্রায় সবারই এক অবস্থা রক্তাক্ত শরীর। অনেকক্ষন পর ঘোর কাটিয়ে বুঝতে পারলো অবনী যে মেলাতে বিস্ফোরণ হয়েছে, বোমা মারা হয়েছে। ছোটখাটো নয়,বড়সড় বিস্ফোরণ হয়েছে। আহত মানুষ ছোটাছুটি করছে। আত্মীয়দের ডাকছে,খুঁজছে। অবনীর বুঝতে বাকি রইলো না অনেক মানুষ মারাও গেছেন।কিছুক্ষণের মধ্যে ই পুলিশ আসলো, মেডিকেল টিম আসলো। সবাই কে জীবিত, কে মৃত দেখা রেখে মেডিকেল টিম এর কাছে ছুটে যাচ্ছে নিজের শরীরের ক্ষত সারাতে।এম্বুলেন্স দিয়ে শহরে চলে যেতে চাইছে মানুষ। এইখানে থেকে শহর অনেক দূরে সবাইকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।তাই অস্থায়ী ভাবে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য এখানেই ক্যাম্প করবে চিকিৎসকরা।অবনীর কেউ নেই,নিজের ক্ষত সারানোর তারাও নেই।তাই সে গেলো আসে পাশে মৃত, জীবিত পড়ে থাকা মানুষ গুলোর দিকে।ধরে ধরে দেখছে সে কেউ জীবিত আছে কিনা।রক্তাক্ত মানুষের ভীড়ে মধ্যে অবনী খুঁজছে জীবনের অস্তিত্ব। হটাৎ দেখা হলো ঐ ছেলেটার সাথে। দুজন মুখোমুখি। ছেলেটিও জীবিত মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে। অবনী ছেলেটিকে দেখে কাঁপা গলায় বলে উঠলো, আপনি? আপনি বেঁচে আছেন?ছেলেটিও অবনীকে দেখে অবাক হলো। বললো, হ্যাঁ। আপনি ও ঠিক আছেন? অবনী বললো, হ্যাঁ, বেঁচে আছি।অবনীর তো ছেলেটার কথা মাথা থেকে বেড়িয়েই গেছিল।কি আশ্চর্য! দুজন মুখোমুখি আবার দুজন ই জীবিত। অবনী বললো, আপনার আত্মীয়দের খুঁজছেন? কেউ আছে এখানে? ছেলেটা বললো, না,আমার কেউ নেই।আপনি কাকে খুঁজছেন? অবনী বললো, আমারও কেউ নেই।অসহায় জীবিত মানুষ খুঁজছি।তারপর চুপচাপ অল্পক্ষন দাঁড়িয়ে রইলো। মাইকিং চলছে, পুলিশ, আর্মি লাশ নিচ্ছে।আহতদের খুঁজছে।ধ্বংস স্তুপের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে অবনী ও ছেলেটা। হটাৎ অবনী বললো, আমি অবনী,আপনি?
ছেলেটি এদিক ওদিক দেখছিলো,অবনীর দিকে তাকিয়ে বললো, আমি আবির।
অবনীর যেন মনটা কেমন ভালো লাগলো। তার অপরিচিত পৃথিবীতে এই ছেলেটি অল্প পরিচিত ছিলো,যে বেঁচে আছে,ভালো আছে।অবনী অবিরকে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল হটাৎ আবির বললো, দাঁড়িয়ে না থেকে চলুন আহতদের খুঁজি।অবনীও সাই দিল তাকে।খুঁজতে খুঁজতে হটাৎ আর্তনাদ করে উঠলো অবনী।কি হয়েছে বলে দৌড়ে এসে আবির দেখলো অবনী মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। সামনে রক্তাক্ত দুটি নিথর দেহ।আর কারো নয়,যে স্বামী স্ত্রী অবনীর কাছ থেকে তাদের বাবুর জন্য টুপি কিনেছিলেন ওরা দুজন। আবির তাদের শরীর স্পর্শ করলো, ঠান্ডা শরীর। মারা গেছেন কি দুজন ই? অবনী অস্পষ্ট স্বরে জিজ্ঞেস করলো আবিরকে? আবির বললো, হুম।অবনী এদিক ওদিক তাকিয়ে হটাৎ যেন ব্যস্ত হয়ে বললো, বাবুটা? বাবুটা কোথায়?
আবির: ওদের সাথে বাবু ছিলো?
অবনী: হ্যাঁ, ছোট্ট, খুব ছোট্ট বাবু ছিল।আমার কাছ থেকে বাবুর জন্য টুপি কিনেছিলেন মেয়েটি।
আবির: নিশ্চয়ই ছিটকে পরছে কোথাও। আসুন খুঁজে দেখি।
আশে পাশে হন্নে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে একটা কাপড়ের গাট্টির মধ্যে ছোট একটা বাবু খুঁজে পেলো তারা।আবির কোলে তুলে নিলো।জীবিত না মৃত বুঝতে পারলো না ঠিক।অবনী ব্যস্ত স্বরে বললো, এই তো সেই বাবুটা।আমার টুপি পরানো।বেঁচে আছে? বলে কান্নায় ভেঙে পড়লো অবনী।আবির বললো, কান্না করবেন না।এটা কি কান্নার সময়? চলুন মেডিকেল ক্যাম্প এ নিয়ে যাই বাবুটিকে।আবির ও অবনী পাগলের মত দৌড়ে গেলো বাবুটিকে নিয়ে। অনেক খাটাখাটুনি করে ভিড় ঠেলে চিকিৎসক এর কাছে নিয়ে গেলো তারা বাবুটিকে।না,বাবুটি বেঁচে আছে।তখন রাত হয়ে গেছে অনেক টা।কটা বাজে কে জানে! আবির,অবনী একটা তাবুর ভেতর বসে আছে। অবনীর কোলে বাবুটি।বড্ড দুর্বল অবস্থা বাবুটির।কাল যদি বাবুটিকে কেউ খুঁজতে আসে।পুলিশের কাছে বাবুর ছবি দেওয়া হয়েছে। আত্মীয় স্বজন আসবে হয়তো নিতে। আবির বাবুর জন্য দুধ আনতে গেলো। এখানে রিলিফ চালু হয়েছে। সবই মোটামুটি পাওয়া যাচ্ছে। এত মানুষ শহরে নেওয়া সম্ভব নয়। এখানেই যতটা সম্ভব সার্ভিস দিচ্ছে,ডাক্তার, নার্স,আর্মি সেচ্ছাসেবীর দল।আবির অবনীও থেকে গেলো আরও এক দুদিন মানুষের সেবার জন্য।এ পর্যন্ত কেউ আসেনি বাবুটিকে নিতে।তারাই দেখাশোনা করছে।আবিরের যত্নের প্রতি মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে অবনী।আবির যেমন অন্য মানুষের সাহায্য করছে ঠিক তেমনই যত্ন করছে অবনী ও বাবুটির।অবনীর মনে দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে আবির এর জন্য।আবির ঘুনাক্ষরে ও জানে না সেটা।আবির রাগী স্বভাবের। অবনীর অনেক কথাতেই রাগের রিয়েক্ট করে।আবিরকে দেখে যত টুকু বুঝছে অবনী আবিরের মনে মেয়েদের জন্য দূর্বলতা কম,রাগ বেশি। তবুও তারা দুজন এক সাথে আছে এখন বাচ্চাটির জন্য।দুপুরের খাবার নিয়ে আবির আসলে অবনী জিজ্ঞেস করলো, বাবুটাকে কেউ নিতে এলো না? তার কি কেউ নেই তাহলে?
আবির: না কেউ আসে নি নিতে।পুলিশ সব জায়গায় ছবি ও খোঁজ নিলো।বাবুর বাবা-মার লাশ শহরে নিয়ে গেলো না কেউই।এখানেই কবর দেওয়া হয়েছে ওদের।
অবনী: আমার মত বাবুর ও কি নেই তাহলে?
আবির: হয়তো বা।
অবনী: কি হবে তাহলে বাবুটার?
আবির: আমরা না হয় ফিরে যাওয়ার সময় একটা ব্যবস্থা করে যাবো। বা এতিম খানায় দিয়ে যাবো।
অবনী: এতিমখানা! না,না তা কি করে হয়! বেশ,আমিই এই বাবুর মা হবো।আমিই বাবুটির দায়িত্ব নিবো।
কথাটা শুনে কেমন চমকে গেলো আবির।চোখ দুটিতে কেমন জল ছলছল করে উঠলো। বললো, আপনি দায়িত্ব নিবেন?
অবনী: হ্যাঁ, আমারও কেউ নেই।এক এতিম অন্য এতিমের দায়িত্ব নিবে।তাকে মানুষের মতো মানুষ করবে।মানুষের লাথি গুতা খেতে দিবো না আমি বাবুকে।পৃথিবী কত নিষ্ঠুর আমি দেখেছি।আমার স্নেহ ভালোবাসায় বড় করে তুলবো আমি এই বাবুটিকে।
হটাৎ যেন আবিরের চোখে অন্য মায়া দেখতে পেল অবনী নিজের জন্য। কতক্ষন চুপচাপ বসে রইলো দুজন। তারপর অবনী বললো, চলুন বাবুর জন্য দুধ আনি।আবির যেন অন্যমনস্ক হয়ে বললো, চলুন।
অবনী একটু সামনে যেতেই পিছন থেকে আবির চিৎকার দিয়ে উঠলো, অবনী!অবনী কিছু বুঝার আগেই একটা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলো মাটিতে।বাবুটিকে আকড়ে ধরে ছিল সে।বাবুটি ব্যাথা পেয়ে কেঁদে উঠলো। অবনী কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখলো, আবির মাটিতে পড়ে আছে উপরে নাগরদোলার একটা অংশ পড়ে। বিস্ফোরণে নাগর-দোলাটা ভেঙে এক অংশ ওখানে লটকে ছিলো কেউ খেয়াল করে নি।এটা ভেঙে পরতো অবনীর শরীরে। আবির নিচে পরেছে এখন অবনীকে বাঁচাতে গিয়ে। চিৎকার দিয়ে অবনী ছুটে গেল কাছে।সাথে আরও লোকজন এসে উদ্ধার করে নিয়ে গেলো ক্যাম্প এ।সারা শরীর রক্তাক্ত আবির এর।বড্ড ব্যাথা পেয়েছে। ডাক্তার দেখে বলেছেন ইমারজেন্সি তে নিয়ে যান।ক্রিটিকাল রোগী। অবনী কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। তার সাথে কেন এমন হয়।যাকে সে ভালবাসে কেনো তাকে বিধাতা কেড়ে নেয়।আবির তার ছিলো না কোন দিনই,তবুও তো আবিরকে সে তার মনের গহীনে ঠাই দিয়েছিলো।কেন তবে আজ এমন হলো আবিরের সাথে?কেন?তাও আবার অবনীকে বাঁচাতে গিয়ে। আরও এক দুদিন কেটে গেলো। অবনীর সেবাতে আবির এখন অনেকটাই সুস্থ। নার্স,ডাক্তার এর সাথে অবনীও যত্ন নিচ্ছে আবির এর।অনেক এ ভাবছে তারা স্বামী স্ত্রী। বাবুটিও তাদের।আজকে একজন বড় ডাক্তার এসেছেন শহর থেকে। অবনী ঐ ডাক্তার এর কাছে ছুটে গিয়ে বললো, আপা প্লিজ ওনাকে একটু দেখবেন।উনি খুব ব্যাথা পেয়েছিলেন। ডাক্তার অবনীর অস্থিরতা দেখে হেসে বললেন, উনি কে? তোমার হাসবেন্ড?
অবনী: না।
ডাক্তার আপা: হাসবেন্ড না?তবে সবাই যে বললো উনাকে তুমি অনেক কেয়ার করো?
অবনী: হ্যাঁ।
ডাক্তার আপা : তবে কে হয় উনি তোমার?
অবনী একটু লজ্জিত স্বরে বললো, আমি উনাকে ভালবাসি।
ডাক্তার আপা : ও আচ্ছা, মনের মানুষ! বাচ্চাটা তোমার নিজের? তুমি কি ওর জন্মদাত্রী?
অবনী: না,তবে আমিই ওর মা।…..
সব কথা শুনে ডাক্তার আপার ও অবনীর জন্য একটা শ্রদ্ধা চলে এলো। অবনীর জন্য গর্ব হলো একজন নারী হিসাবে। তিনি বললেন,তোমার সাথে আমি আছি অবনী তুমি সবসময় আমাকে পাশে পাবে।অবনী আবার রিকুয়েষ্ট করলো আবিরকে চেক আপ করার জন্য।আর গেলো বাবুর জন্য দুধ আনতে।
এসে যা শুনলো তা শুনে অবনীর পা থেকে মাটি সরে গেলো। শুনলো সব অবাক হয়ে।
এই ডাক্তার আপা আর কেউ না আবিরের প্রেমিকা। প্রাক্তন প্রেমিকা। যার জন্যই আবিরের মনে মেয়েদের জন্য এত রাগ জন্ম নিয়েছে।অবনী শুনলো,ডাক্তার আপা আবিরকে বলছে,তুমি প্লিজ আমাকে এখন ভুলে যাও।অবনীকে আপন করে নাও।ওর মত এমন মেয়ে আর একটি ও পাবে না।যে তোমার কিছু না দেখেই তোমাকে ভালবেসেছে।সেবা করে গেছে।যে মেয়েটি একটা এতিম শিশুর দ্বায়িত্ব নিয়েছে। তার মতো কোমল মনের ভালো মানুষ কোথায় পাবে তুমি? সে তোমার বাড়ি,গাড়ি,ব্যাংক -ব্যালেন্স কিছুই তো জানে না।…..আড়াল থেকে সব শুনে অবনী বুঝতে পারলো আবির বিশাল কোটিপতির একমাত্র ছেলে।ডাক্তার আপা তার প্রেমিকা। কষ্টে বুকটা পাথর হয়ে গেলো অবনীর।কি করবে সে আর এখানে থেকে? আবির এখন ভালো আছে।তার দেখার জন্য ডাক্তার আপা ও আছেন এখন।তার আর কাজ নেই এখানে। বাবুকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে দুফোঁটা জল চোখ থেকে ফেলে নিঃশব্দে চলে যাচ্ছিল অবনী।পিছন দিয়ে কে যেন হাত টেনে ধরলো। অবনী তাঁকিয়ে দেখলো,ডাক্তার আপা।প্রশ্ন ও বিষ্ময় নিয়ে অবনী তাকিয়ে আছে।ডাক্তার আপা বলছেন,এই বোকা মেয়ে।কোথায় যাচ্ছ তোমার ভালবাসার মানুষটিকে ছেড়ে?
অবনী কাপা গলায় বললো, তার জন্য তো এখন আপনিই আছেন আপা।
ডাক্তার আপা ধমক দিয়ে বললেন, অর্ধেক কথা শুনে বিচার করবে না।জানো কিছু? সত্য জানো?
অবনী: কি সত্য?
ডাক্তার আপা : তোমার ভালবাসার মানুষ টি ছ্যাকা খেয়েছে বুঝছ?
অবনী: না,বুঝি নাই!
ডাক্তার আপা : মানে আমি বিবাহিত। তোমার আবিরকে একা করে দিয়ে আমি বিয়ে করে ফেলেছি অন্যজনকে এখন বুঝলে! তোমার জীবনে আবির আসবে বলে আল্লাহ আমাকে তার জীবন থেকে অনেক আগেই সরিয়ে দিয়েছে।
অবনী কাঁদবে না খুশি হবে বুঝতে পারছে না।ডাক্তার আপা হটাৎ অবনীর হাতটি আবিরের হাতে দিয়ে বললো, আজকেই তোমাদের বিয়ে দিবো আমি এখানেই।অবনী লজ্জিত চোখে আবিরের দিকে তাকালো। আবির মুচকি হাসি দিয়ে জানালো এই বিয়েতে তার ও কোন আপত্তি নেই। থাকবেই বা কেন এমন একটা মেয়ে যে নিজের জন্য কিছুই ভাবে না।একটা অনাথ ছোট শিশুকে যে নিজের বলে পরিচয় দেয়।যে অন্যের জন্য কিছু না ভেবে ই সাহায্য করে তাকে নিয়ে ভাবার কিছু নেই। তাকে চোখ বন্ধ করে নিজের করা যায়। বিকালে আবির আর অবনীর বিয়ে হয়ে গেলো। অবনীর পাশে আবির বসে বললো, তুমি এখন একা বাবুর মা নও।আমি এখন বাবুর বাবা।অবনী মিষ্টি করে হেসে উঠলো। তার জীবন বড় বেদনার ছিলো। কেউ ছিল না তার।এখন তার স্বামী হয়েছে,ছেলে হয়েছে,একটা ভরা সংসার হয়েছে।তার বেদনায় যেন শান্তি এসেছে।মুগ্ধতা এসেছে তার জীবনে। তার জীবনে এখন বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি নেমেছে।

এই বিষয়ের ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সাংবাদিকের তথ্য জানুন

🎉 Shapno24 প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী 🎉

আগামী ৩১ জুলাই www.shapno24.com এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হবে।

🎊 শুভেচ্ছা কার্ড তৈরি করুন 🎊

নিজের নাম দিয়ে আকর্ষণীয় Greeting Card তৈরি করুন।

Greeting Card তৈরি করুন

গল্প- বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি লিখেছেন – শেখ মিন্নাতুল মকসুদ অর্চি

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:৩৫:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৫
১৩৬

গ্রামে মেলা বসেছে।চারিদিকে বাঁশীর শব্দ, নাগর-দোলায় ছেলে-পুলের চিৎকার, হৈ-হুল্লোড়। চুড়ি,মালা,টিপ,আলতা কিনতে মেয়েদের ভিড়।মাটির বাসন কিনতে ভিড় মহিলাদের। পুরুষদের আনা-গুনাও কম নয়।কি নেই মেলাতে!সবই পাওয়া যায় এখন গ্রামের মেলাতে।বিস্তারিত বলে কি আর শেষ করা যাবে!তাই আর নাই বা বললাম। এমন মেলাতেই এসেছে অবনী।না মেলা দেখতে নয়,মেলায় জিনিস বিক্রি করে পেট চালাতে।একুল-ওকুল দুকুলেই কেউ নেই অবনীর।জানে না বাবা-মার নাম,জন্ম পরিচয়, বা আত্মীয়দের ঠিকানা। অনাথ আশ্রমে থাকত আগে,এখন একাই থাকে।গ্রামের একটা সংস্থাতে উলের জিনিস বানায়,ওটা বিক্রি করেই পেট চলে ওর।আজও উলের কিছু ছোট বাচ্চাদের টুপি,সোয়েটার বিক্রি করতে মেলায় এসেছে অবনী। এই মেলাতে প্রচুর শহুরে মানুষ আসে।প্রচুর ভিড় হয় মেলাতে।যদি একটু উপার্জন হয় এই জন্যই আসা অবনীর।এদিক ওদিক ঘুরছিল অবনী।পেছন থেকে কে একজন ডাকলো,এই ফেরিওয়ানী!পিছন ফিরে অবনী দেখলো,তার বয়সীই একটা মেয়ে স্বামীর সাথে বাবু কোলে নিয়ে এক গাল হাসি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবনীকে বলছে, দেখি বাবুর জন্য টুপি,সোয়েটার দেখি!অবনী তার বুনা সবচেয়ে সুন্দর সোয়েটার, টুপিগুলো বের করলো। মেয়েটি তার স্বামীকে বললো, এই বাবুকে কোলে নাও,আমি দেখি কি কেনা যায়। মেয়েটিকে দেখেই বুঝা যায় বড়ই সুখী মানুষ, স্বামী সন্তান নিয়ে। এই বয়সে অবনীর ও এমন একটা সংসার হওয়ার কথা ছিলো। একটা সন্তান কোল জুড়ে থাকার কথা ছিল।কিন্তু এমন এতিম অনাথ মেয়েকে কে বিয়ে করবে? দেখতে অসুন্দর নয় অবনী।অসম্ভব মায়াবী চেহারা, টানা টানা চোখ, লম্বা ঢেউ তুলা চুল,ফর্সা গায়ের রং। এতিম খানায় থাকলে হয়তো তারা একটা বিয়ে দিত।কিন্তু অবনী আগেই ওখান থেকে চলে আসে পালিয়ে।এসব ভাবতে ভাবতে হটাৎ হাত থেকে কিছু টুপি পরে গেল। অবনী তুলতে চাইলেই হটাৎ একজন লোক টুপি গুলো তুলে দিলো। টুপি গুলো অবনীর হাতে দিয়ে বললো, পাশ দিয়েই যাচ্ছিলাম, পরে গেল দেখলাম আপনার হাতে অনেক জিনিস তাই তুলে দিলাম আরকি।বলে সাথে সাথেই চলে গেল। অবনী তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে।শহুরে ছেলে দেখেই বুঝা যায়,লম্বা,স্মার্ট, হ্যান্ডসাম দেখতে। হয়তোবা পরোপকারী ও।হটাৎ বাবুর মা টি বলে উঠলো, কই আমাকে ঐ টুপি টা দিন।নরম, বাবুর আরামই লাগবে মনে হয়। আরও কয়েক ঘন্টা টুপি, সোয়েটার বিক্রি করে ক্লান্ত অবনী মেলা থেকে দূরে একটা গাছের নিচে বসল।চোখ পরতেই দেখলো ঐ ছেলেটা। এখানে কিছু বাচ্চাদের হাওয়ায় মিঠাই কিনে দিচ্ছে। অবনীর ঠোঁটের কোনে একটু হাসি উঠলো ছেলেটিকে দেখে।ছেলেটি অবনীকে খেয়াল করেনি।অবনীও একটু গাছে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলো হটাৎ ভিষণ জোরে ভয়ংকর শব্দ হলো। অবনী অনুভব করলো তার শরীরে যেন আগুনের ফুলকি এসে লাগলো। তাকিয়ে দেখলো সব অন্ধকার ধোঁয়ায় ঝাপসা। কানে যেন তরঙ্গ আসলো চিৎকার, আহাজারির।অবনী দেখলো তার শরীরের কিছু অংশ যেমন হাত এর অংশ,পার গোড়ালি থেকে রক্ত ঝরছে।অবনী কিছুই বুঝতে পারছে না কি হলো। ঝাপসা চারপাশ একটু পরিষ্কার হলে দেখতে পারলো মানুষ সব ছোটাছুটি করছে। নিজের মতো করে বাঁচার চেষ্টা করছে।প্রায় সবারই এক অবস্থা রক্তাক্ত শরীর। অনেকক্ষন পর ঘোর কাটিয়ে বুঝতে পারলো অবনী যে মেলাতে বিস্ফোরণ হয়েছে, বোমা মারা হয়েছে। ছোটখাটো নয়,বড়সড় বিস্ফোরণ হয়েছে। আহত মানুষ ছোটাছুটি করছে। আত্মীয়দের ডাকছে,খুঁজছে। অবনীর বুঝতে বাকি রইলো না অনেক মানুষ মারাও গেছেন।কিছুক্ষণের মধ্যে ই পুলিশ আসলো, মেডিকেল টিম আসলো। সবাই কে জীবিত, কে মৃত দেখা রেখে মেডিকেল টিম এর কাছে ছুটে যাচ্ছে নিজের শরীরের ক্ষত সারাতে।এম্বুলেন্স দিয়ে শহরে চলে যেতে চাইছে মানুষ। এইখানে থেকে শহর অনেক দূরে সবাইকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।তাই অস্থায়ী ভাবে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য এখানেই ক্যাম্প করবে চিকিৎসকরা।অবনীর কেউ নেই,নিজের ক্ষত সারানোর তারাও নেই।তাই সে গেলো আসে পাশে মৃত, জীবিত পড়ে থাকা মানুষ গুলোর দিকে।ধরে ধরে দেখছে সে কেউ জীবিত আছে কিনা।রক্তাক্ত মানুষের ভীড়ে মধ্যে অবনী খুঁজছে জীবনের অস্তিত্ব। হটাৎ দেখা হলো ঐ ছেলেটার সাথে। দুজন মুখোমুখি। ছেলেটিও জীবিত মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে। অবনী ছেলেটিকে দেখে কাঁপা গলায় বলে উঠলো, আপনি? আপনি বেঁচে আছেন?ছেলেটিও অবনীকে দেখে অবাক হলো। বললো, হ্যাঁ। আপনি ও ঠিক আছেন? অবনী বললো, হ্যাঁ, বেঁচে আছি।অবনীর তো ছেলেটার কথা মাথা থেকে বেড়িয়েই গেছিল।কি আশ্চর্য! দুজন মুখোমুখি আবার দুজন ই জীবিত। অবনী বললো, আপনার আত্মীয়দের খুঁজছেন? কেউ আছে এখানে? ছেলেটা বললো, না,আমার কেউ নেই।আপনি কাকে খুঁজছেন? অবনী বললো, আমারও কেউ নেই।অসহায় জীবিত মানুষ খুঁজছি।তারপর চুপচাপ অল্পক্ষন দাঁড়িয়ে রইলো। মাইকিং চলছে, পুলিশ, আর্মি লাশ নিচ্ছে।আহতদের খুঁজছে।ধ্বংস স্তুপের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে অবনী ও ছেলেটা। হটাৎ অবনী বললো, আমি অবনী,আপনি?
ছেলেটি এদিক ওদিক দেখছিলো,অবনীর দিকে তাকিয়ে বললো, আমি আবির।
অবনীর যেন মনটা কেমন ভালো লাগলো। তার অপরিচিত পৃথিবীতে এই ছেলেটি অল্প পরিচিত ছিলো,যে বেঁচে আছে,ভালো আছে।অবনী অবিরকে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল হটাৎ আবির বললো, দাঁড়িয়ে না থেকে চলুন আহতদের খুঁজি।অবনীও সাই দিল তাকে।খুঁজতে খুঁজতে হটাৎ আর্তনাদ করে উঠলো অবনী।কি হয়েছে বলে দৌড়ে এসে আবির দেখলো অবনী মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। সামনে রক্তাক্ত দুটি নিথর দেহ।আর কারো নয়,যে স্বামী স্ত্রী অবনীর কাছ থেকে তাদের বাবুর জন্য টুপি কিনেছিলেন ওরা দুজন। আবির তাদের শরীর স্পর্শ করলো, ঠান্ডা শরীর। মারা গেছেন কি দুজন ই? অবনী অস্পষ্ট স্বরে জিজ্ঞেস করলো আবিরকে? আবির বললো, হুম।অবনী এদিক ওদিক তাকিয়ে হটাৎ যেন ব্যস্ত হয়ে বললো, বাবুটা? বাবুটা কোথায়?
আবির: ওদের সাথে বাবু ছিলো?
অবনী: হ্যাঁ, ছোট্ট, খুব ছোট্ট বাবু ছিল।আমার কাছ থেকে বাবুর জন্য টুপি কিনেছিলেন মেয়েটি।
আবির: নিশ্চয়ই ছিটকে পরছে কোথাও। আসুন খুঁজে দেখি।
আশে পাশে হন্নে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে একটা কাপড়ের গাট্টির মধ্যে ছোট একটা বাবু খুঁজে পেলো তারা।আবির কোলে তুলে নিলো।জীবিত না মৃত বুঝতে পারলো না ঠিক।অবনী ব্যস্ত স্বরে বললো, এই তো সেই বাবুটা।আমার টুপি পরানো।বেঁচে আছে? বলে কান্নায় ভেঙে পড়লো অবনী।আবির বললো, কান্না করবেন না।এটা কি কান্নার সময়? চলুন মেডিকেল ক্যাম্প এ নিয়ে যাই বাবুটিকে।আবির ও অবনী পাগলের মত দৌড়ে গেলো বাবুটিকে নিয়ে। অনেক খাটাখাটুনি করে ভিড় ঠেলে চিকিৎসক এর কাছে নিয়ে গেলো তারা বাবুটিকে।না,বাবুটি বেঁচে আছে।তখন রাত হয়ে গেছে অনেক টা।কটা বাজে কে জানে! আবির,অবনী একটা তাবুর ভেতর বসে আছে। অবনীর কোলে বাবুটি।বড্ড দুর্বল অবস্থা বাবুটির।কাল যদি বাবুটিকে কেউ খুঁজতে আসে।পুলিশের কাছে বাবুর ছবি দেওয়া হয়েছে। আত্মীয় স্বজন আসবে হয়তো নিতে। আবির বাবুর জন্য দুধ আনতে গেলো। এখানে রিলিফ চালু হয়েছে। সবই মোটামুটি পাওয়া যাচ্ছে। এত মানুষ শহরে নেওয়া সম্ভব নয়। এখানেই যতটা সম্ভব সার্ভিস দিচ্ছে,ডাক্তার, নার্স,আর্মি সেচ্ছাসেবীর দল।আবির অবনীও থেকে গেলো আরও এক দুদিন মানুষের সেবার জন্য।এ পর্যন্ত কেউ আসেনি বাবুটিকে নিতে।তারাই দেখাশোনা করছে।আবিরের যত্নের প্রতি মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে অবনী।আবির যেমন অন্য মানুষের সাহায্য করছে ঠিক তেমনই যত্ন করছে অবনী ও বাবুটির।অবনীর মনে দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে আবির এর জন্য।আবির ঘুনাক্ষরে ও জানে না সেটা।আবির রাগী স্বভাবের। অবনীর অনেক কথাতেই রাগের রিয়েক্ট করে।আবিরকে দেখে যত টুকু বুঝছে অবনী আবিরের মনে মেয়েদের জন্য দূর্বলতা কম,রাগ বেশি। তবুও তারা দুজন এক সাথে আছে এখন বাচ্চাটির জন্য।দুপুরের খাবার নিয়ে আবির আসলে অবনী জিজ্ঞেস করলো, বাবুটাকে কেউ নিতে এলো না? তার কি কেউ নেই তাহলে?
আবির: না কেউ আসে নি নিতে।পুলিশ সব জায়গায় ছবি ও খোঁজ নিলো।বাবুর বাবা-মার লাশ শহরে নিয়ে গেলো না কেউই।এখানেই কবর দেওয়া হয়েছে ওদের।
অবনী: আমার মত বাবুর ও কি নেই তাহলে?
আবির: হয়তো বা।
অবনী: কি হবে তাহলে বাবুটার?
আবির: আমরা না হয় ফিরে যাওয়ার সময় একটা ব্যবস্থা করে যাবো। বা এতিম খানায় দিয়ে যাবো।
অবনী: এতিমখানা! না,না তা কি করে হয়! বেশ,আমিই এই বাবুর মা হবো।আমিই বাবুটির দায়িত্ব নিবো।
কথাটা শুনে কেমন চমকে গেলো আবির।চোখ দুটিতে কেমন জল ছলছল করে উঠলো। বললো, আপনি দায়িত্ব নিবেন?
অবনী: হ্যাঁ, আমারও কেউ নেই।এক এতিম অন্য এতিমের দায়িত্ব নিবে।তাকে মানুষের মতো মানুষ করবে।মানুষের লাথি গুতা খেতে দিবো না আমি বাবুকে।পৃথিবী কত নিষ্ঠুর আমি দেখেছি।আমার স্নেহ ভালোবাসায় বড় করে তুলবো আমি এই বাবুটিকে।
হটাৎ যেন আবিরের চোখে অন্য মায়া দেখতে পেল অবনী নিজের জন্য। কতক্ষন চুপচাপ বসে রইলো দুজন। তারপর অবনী বললো, চলুন বাবুর জন্য দুধ আনি।আবির যেন অন্যমনস্ক হয়ে বললো, চলুন।
অবনী একটু সামনে যেতেই পিছন থেকে আবির চিৎকার দিয়ে উঠলো, অবনী!অবনী কিছু বুঝার আগেই একটা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলো মাটিতে।বাবুটিকে আকড়ে ধরে ছিল সে।বাবুটি ব্যাথা পেয়ে কেঁদে উঠলো। অবনী কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখলো, আবির মাটিতে পড়ে আছে উপরে নাগরদোলার একটা অংশ পড়ে। বিস্ফোরণে নাগর-দোলাটা ভেঙে এক অংশ ওখানে লটকে ছিলো কেউ খেয়াল করে নি।এটা ভেঙে পরতো অবনীর শরীরে। আবির নিচে পরেছে এখন অবনীকে বাঁচাতে গিয়ে। চিৎকার দিয়ে অবনী ছুটে গেল কাছে।সাথে আরও লোকজন এসে উদ্ধার করে নিয়ে গেলো ক্যাম্প এ।সারা শরীর রক্তাক্ত আবির এর।বড্ড ব্যাথা পেয়েছে। ডাক্তার দেখে বলেছেন ইমারজেন্সি তে নিয়ে যান।ক্রিটিকাল রোগী। অবনী কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। তার সাথে কেন এমন হয়।যাকে সে ভালবাসে কেনো তাকে বিধাতা কেড়ে নেয়।আবির তার ছিলো না কোন দিনই,তবুও তো আবিরকে সে তার মনের গহীনে ঠাই দিয়েছিলো।কেন তবে আজ এমন হলো আবিরের সাথে?কেন?তাও আবার অবনীকে বাঁচাতে গিয়ে। আরও এক দুদিন কেটে গেলো। অবনীর সেবাতে আবির এখন অনেকটাই সুস্থ। নার্স,ডাক্তার এর সাথে অবনীও যত্ন নিচ্ছে আবির এর।অনেক এ ভাবছে তারা স্বামী স্ত্রী। বাবুটিও তাদের।আজকে একজন বড় ডাক্তার এসেছেন শহর থেকে। অবনী ঐ ডাক্তার এর কাছে ছুটে গিয়ে বললো, আপা প্লিজ ওনাকে একটু দেখবেন।উনি খুব ব্যাথা পেয়েছিলেন। ডাক্তার অবনীর অস্থিরতা দেখে হেসে বললেন, উনি কে? তোমার হাসবেন্ড?
অবনী: না।
ডাক্তার আপা: হাসবেন্ড না?তবে সবাই যে বললো উনাকে তুমি অনেক কেয়ার করো?
অবনী: হ্যাঁ।
ডাক্তার আপা : তবে কে হয় উনি তোমার?
অবনী একটু লজ্জিত স্বরে বললো, আমি উনাকে ভালবাসি।
ডাক্তার আপা : ও আচ্ছা, মনের মানুষ! বাচ্চাটা তোমার নিজের? তুমি কি ওর জন্মদাত্রী?
অবনী: না,তবে আমিই ওর মা।…..
সব কথা শুনে ডাক্তার আপার ও অবনীর জন্য একটা শ্রদ্ধা চলে এলো। অবনীর জন্য গর্ব হলো একজন নারী হিসাবে। তিনি বললেন,তোমার সাথে আমি আছি অবনী তুমি সবসময় আমাকে পাশে পাবে।অবনী আবার রিকুয়েষ্ট করলো আবিরকে চেক আপ করার জন্য।আর গেলো বাবুর জন্য দুধ আনতে।
এসে যা শুনলো তা শুনে অবনীর পা থেকে মাটি সরে গেলো। শুনলো সব অবাক হয়ে।
এই ডাক্তার আপা আর কেউ না আবিরের প্রেমিকা। প্রাক্তন প্রেমিকা। যার জন্যই আবিরের মনে মেয়েদের জন্য এত রাগ জন্ম নিয়েছে।অবনী শুনলো,ডাক্তার আপা আবিরকে বলছে,তুমি প্লিজ আমাকে এখন ভুলে যাও।অবনীকে আপন করে নাও।ওর মত এমন মেয়ে আর একটি ও পাবে না।যে তোমার কিছু না দেখেই তোমাকে ভালবেসেছে।সেবা করে গেছে।যে মেয়েটি একটা এতিম শিশুর দ্বায়িত্ব নিয়েছে। তার মতো কোমল মনের ভালো মানুষ কোথায় পাবে তুমি? সে তোমার বাড়ি,গাড়ি,ব্যাংক -ব্যালেন্স কিছুই তো জানে না।…..আড়াল থেকে সব শুনে অবনী বুঝতে পারলো আবির বিশাল কোটিপতির একমাত্র ছেলে।ডাক্তার আপা তার প্রেমিকা। কষ্টে বুকটা পাথর হয়ে গেলো অবনীর।কি করবে সে আর এখানে থেকে? আবির এখন ভালো আছে।তার দেখার জন্য ডাক্তার আপা ও আছেন এখন।তার আর কাজ নেই এখানে। বাবুকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে দুফোঁটা জল চোখ থেকে ফেলে নিঃশব্দে চলে যাচ্ছিল অবনী।পিছন দিয়ে কে যেন হাত টেনে ধরলো। অবনী তাঁকিয়ে দেখলো,ডাক্তার আপা।প্রশ্ন ও বিষ্ময় নিয়ে অবনী তাকিয়ে আছে।ডাক্তার আপা বলছেন,এই বোকা মেয়ে।কোথায় যাচ্ছ তোমার ভালবাসার মানুষটিকে ছেড়ে?
অবনী কাপা গলায় বললো, তার জন্য তো এখন আপনিই আছেন আপা।
ডাক্তার আপা ধমক দিয়ে বললেন, অর্ধেক কথা শুনে বিচার করবে না।জানো কিছু? সত্য জানো?
অবনী: কি সত্য?
ডাক্তার আপা : তোমার ভালবাসার মানুষ টি ছ্যাকা খেয়েছে বুঝছ?
অবনী: না,বুঝি নাই!
ডাক্তার আপা : মানে আমি বিবাহিত। তোমার আবিরকে একা করে দিয়ে আমি বিয়ে করে ফেলেছি অন্যজনকে এখন বুঝলে! তোমার জীবনে আবির আসবে বলে আল্লাহ আমাকে তার জীবন থেকে অনেক আগেই সরিয়ে দিয়েছে।
অবনী কাঁদবে না খুশি হবে বুঝতে পারছে না।ডাক্তার আপা হটাৎ অবনীর হাতটি আবিরের হাতে দিয়ে বললো, আজকেই তোমাদের বিয়ে দিবো আমি এখানেই।অবনী লজ্জিত চোখে আবিরের দিকে তাকালো। আবির মুচকি হাসি দিয়ে জানালো এই বিয়েতে তার ও কোন আপত্তি নেই। থাকবেই বা কেন এমন একটা মেয়ে যে নিজের জন্য কিছুই ভাবে না।একটা অনাথ ছোট শিশুকে যে নিজের বলে পরিচয় দেয়।যে অন্যের জন্য কিছু না ভেবে ই সাহায্য করে তাকে নিয়ে ভাবার কিছু নেই। তাকে চোখ বন্ধ করে নিজের করা যায়। বিকালে আবির আর অবনীর বিয়ে হয়ে গেলো। অবনীর পাশে আবির বসে বললো, তুমি এখন একা বাবুর মা নও।আমি এখন বাবুর বাবা।অবনী মিষ্টি করে হেসে উঠলো। তার জীবন বড় বেদনার ছিলো। কেউ ছিল না তার।এখন তার স্বামী হয়েছে,ছেলে হয়েছে,একটা ভরা সংসার হয়েছে।তার বেদনায় যেন শান্তি এসেছে।মুগ্ধতা এসেছে তার জীবনে। তার জীবনে এখন বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি নেমেছে।