
অন্ধকার থেকে আলোতে
(একটি হেদায়েতের গল্প)
লেখিকা : আয়েশা নূর
যে হৃদয় অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিল, সেই হৃদয়ই একদিন আলো খুঁজে পেল- অস্থিরতার মাঝে শুরু হলো তার হেদায়েতের পথে ফিরে আসার যাত্রা।
ফ্রি মিক্সিং – নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশায় উভয়ের নৈতিকতা অবক্ষয় হচ্ছে । তারা আজ নিজেদের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলতে বসেছে । নারী-পুরুষ কেউ ই বাদ নেই । সকলেই নৈতিকতা অবক্ষয়ের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে, কিশোর কিশোরী থেকে শুরু করে বৃদ্ধ / বৃদ্ধাও বাদ যায়নি এই দলে। এই দলেরই একজন মেয়ে ছিল ফায়রা জারিন । সে দিন-রাত ছেলেদের সাথে আড্ডায় মশগুল থাকতো । ফ্রি মিক্সিংয়ের এই পরিণতি হিসেবে সে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছিলো এক অনাকাঙ্ক্ষিত অপকর্মে । সেই অপকর্মের দিকে পা বাড়াবে বাড়াবে এমতাবস্থায় তার মনে অস্থিরতা শুরু হলো,হঠাৎ তার শরীর খারাপ লাগছিল তাই সে তার বন্ধুদেরকে বলে বাসায় চলে আসে । আর এই চলে আসাতেই তার জীবনের আমূল পরিবর্তন ঘটে । সে বাসায় আসার পর অস্থিরতা যেন বেড়েই চলছিল। তার বুকের ভেতরটা অজানা এক অস্বস্তিতে ভারী হয়ে উঠছিল, যেন কিছু একটা তাকে ভিতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সে একটু শান্তি খুঁজছিলো কিন্তু কোথায় প্রকৃত শান্তি আছে তা তার সঠিক জানা নেই ।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে বলেছেন- নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।
সূরা আর-রাদ ১৩:২৮
সে বরাবরের মতো শান্তি খুজতে চলে গেলো সোশ্যাল মিডিয়ায় সে ভাবলো গান ই হয়তো তার অন্তরকে শীতল করবে কিন্তু না ! তার অন্তর তো গানেও পরিতৃপ্ত হচ্ছে না । সে হতাশায় নিমজ্জিত হলো । গান শুনে শান্তি পাবে কি করে ? গান শুনাও তো হারাম (বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ এবং অশ্লীল, কুরূচি সম্পন্ন কথা শ্রবণ হারাম) । এক হারাম থেকে বাঁচতে অন্য হারামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে সে। কিন্তু কই ? শান্তি তো মেলে না! তার হাত নিউজফিড স্ক্রল করেই চলেছে যেন শেষ হতেই চায় না । হঠাৎ ই তার সামনে একটি ইসলামিক ভিডিও আসলো । সে এক প্রকার বিরক্ত হয়েই স্ক্রল করতে চাইল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে আবারও একই ধরনের ভিডিও সামনে চলে এলো। সে একটু থেমে গেলো। কিন্তু সে তা দেখতে বা শুনতে ইচ্ছুক না , কেননা সে তার ধর্মের বিধি-নিষেধকে বাড়াবাড়ি কিছু মনে করতো। কিন্তু এখানেই যে আছে শান্তি তা কি সে জানতো ?
যতই নিউজফিড স্ক্রল করছে ততই ইসলামিক ভিডিও আসছে । এবার তার ভ্রু কুঁচকে গেলো, মনে প্রশ্ন জাগলো—সে তো এসব ইসলামিক ভিডিও দেখে না তাহলে এগুলো বার বার সামনে আসছে কেন ? সাধারণত মানুষ যা বেশি দেখে তাই তার নিউজফিডে ঘুরে বেড়ায় । কিন্তু এখন তো দেখছি তার বিপরীত কিছু হচ্ছে । তবে কি এতে কোনো রহস্য আছে?
তার মনে এক অদ্ভুত কৌতূহল জন্ম নিলো । আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কি তবে এই ভিডিওর মাধ্যমেই তাকে হেদায়েত দান করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন? নাকি অন্য কিছু? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই ভালো জানেন ।
অতঃপর সে কিছুটা বিরক্তি এবং কৌতুহল নিয়েই একজন ইসলামিক স্কলারের ভিডিও দেখা শুরু করলো, কিছুক্ষণ দেখতেই তার বিরক্তি যেন আরো বাড়ছিলো কোনো কথার মানে সে খুজে পাচ্ছিলো না। খুজে পাবেই বা কি করে? সে তো ইসলামি বিধিনিষেধ সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেনা ; কখনো যথাযথ ভাবে পালনও করেনি । তার পরিবার তাকে ইসলাম পালনে উৎসাহিত করেনি কেননা তার পরিবার ছিল মডারেট মুসলিম, মনমতো ধর্ম পালন করেন ।যেটা মনে হয় সেটাই পালন করে আর যেটা মন চায়না সেটা পালন করেনা । নিজের ইচ্ছানুযায়ী ধর্ম পালন করে । প্রতিটি বিষয়েরই যে নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে, কিছু নিয়ম – শৃঙ্খলা থাকে সেটা তার পরিবার মানতে নারাজ ।
একপর্যায়ে সে ভিডিওটি বন্ধ করে দিবে এমন সময় সে কিছু প্রশান্তিময় কথা শুনে । কথাগুলো তার কানে নয়, সরাসরি যেন হৃদয়কে স্পর্শ করেছে । তার আঙুল আর স্ক্রল করতে পারছে না , সে সেখানেই থেমে গেছে স্ক্রিনের উপর। ভিডিওটির মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে জানতে তার আগ্রহ দ্বিগুণ বেড়ে যায় । পুরো ভিডিওটি দেখা শেষ হতে না হতেই তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো, গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো—সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কি ছিল তার কান্নার কারণ ?
সে জানতে পেরেছিল তার অন্তরের প্রশান্তি কোথায় এবং কার কাছে আছে, সে বুঝতে পেরেছিলো তার করা প্রতিটা কাজ কত জঘন্য ছিল, সে প্রতিনিয়ত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নাফরমানিতে লিপ্ত ছিল , প্রতিনিয়ত সে গুনাহের সাগরে ডুবে ছিল অথচ মহান রব তাকে ধ্বংস করে দেননি বরং সংশোধনের পথ দেখিয়েছেন । মেয়েটি নিজের ভুল বুঝতে পেরে কাঁদতে কাঁদতে তওবা করলো ।
কুরআনে কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।
সূরা আজ-যুমার ৩৯:৫৩
যখন মানুষ গুনাহ ছেড়ে খালেস অন্তরে তওবা করে তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন এবং তার সমস্ত গুনাহ নেকী দ্বারা পূর্ণ করে দেন ।
কুরআনে কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন,তবে যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে-আল্লাহ তাদের মন্দ কাজগুলোকে ভালো কাজে পরিবর্তন করে দেন।
সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭০
মহান রব্বুল আলামীন অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু । গুনাহ মাফ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো – অনুতপ্ত হৃদয় নিয়ে খাস তওবা করা, সাথে সাথে পাপ কাজটি ছেড়ে দেওয়া, ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা ।
অতঃপর জারিন উত্তমরূপে ওযু করে অনুতপ্ত হৃদয় নিয়ে রবের দরবারে উপস্থিত হলো ।নিজেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার রহমতের চাদরে আবৃত করার জন্য সে প্রস্তুতি নিচ্ছে । সে নত মস্তকে লুটিয়ে পড়লো সেজদায় । সেজদা থেকে মাথা যেন উঠতেই চায়না । সে জানতো সেজদার মাধ্যমেই বান্দা তার রবের অতি নিকটে চলে যায়। তাই সে তার সেজদা দীর্ঘ করলো রবের রহমতের স্পর্শ পাওয়ার জন্য, তার হৃদয়ের সাগরে যে ঢেউয়ের তোলপাড় শুরু হয়েছে সে তা দূর করার জন্য দীর্ঘ সালাত আদায় করছে । তার হৃদয়ের সাগরে যে ঢেউ তোলপাড় করছে তার অশ্রুসিক্ত চোখেই তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
দীর্ঘক্ষন সালাত আদায়ের পর সে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করছে যা সে ইতিপূর্বে কখনো পায়নি । পাবেই বা কি করে সে তো ঠিকমতো সালাত ই আদায় করতো না। আজ সে সত্যপথ সম্পর্কে জেনেছে, প্রকৃত সুখ – প্রশান্তি কোথায় আছে এবং কার কাছে আছে তা উপলব্ধি করেছে । সে এখন বুঝতে পেরেছে কিভাবে অন্তরে শান্তি পাওয়া যাবে ।
সালাত শেষে হতে না হতেই সে সিদ্ধান্ত নিলো সে পরিপূর্ণ দ্বীন পালন করবে। তার জন্য যা করতে হয় সে তা করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে । সে তার বাকি জীবন কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক চলার চেষ্টা করবে ইন শা আল্লাহ । শুরু হলো তার দ্বীনের পথে যাত্রা । কিন্তু এ পথে চলা কি এতই সহজ ?
প্রতিনিয়ত দুঃখ-কষ্ট স্বীকার করতে হয় সে তা জেনেও এ পথে পা বাড়িয়েছে কেননা সে উপলব্ধি করেছে এতেই সুখ রয়েছে ।বাইরের লোকজনের কথায় বা আচরণে তার খুব একটা খারাপ লাগতো না কিন্তু যখন নিজের আপনজনেরা তাকে কটু কথা বলতো, তাকে গালমন্দ করতো, তাকে শারীরিক-মানসিকভাবে নির্যাতন করতো । তখন তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হতো আর চোখ হতো অশ্রুসিক্ত । সে সবকিছু সহ্য করেছে একমাত্র রবের সন্তুষ্টির জন্য। আসলে পুরো দুনিয়ার মানুষ যদি রক্তাক্ত করে ফেলে তাও মানুষ ততোটা কষ্ট পায়না যতটা কষ্ট পায় আপনজনদের দেয়া সামান্য আঘাতেই,মনে হয় যেন হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে । কিন্তু তাই বলেই কি তার এই নতুন পথচলা বন্ধ করে ফেলতে হবে?
আমাদের আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদের কথা একটু চিন্তা করলেই আমরা দেখা পাবো পরম সুখ- শান্তির । তাদেরকেও প্রতিনিয়ত কষ্ট দিয়েছে তাদেরই আপনজনেরা । একজন পিতা হওয়ার পরেও যদি নিজ সন্তান হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে কষ্ট দিতে পারে এবং হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম যদি তা চুপচাপ মেনে নিতে পারেন , দ্বীনের পথে অবিচল থাকতে পারেন তবে আমরা কেন পারবো না ?
আমাদের নবি হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনেও তো কম ঝড় ঝাপটা আসেনি , তাকেও বরণ করে নিতে হয়েছে অগণিত দুঃখ-যন্ত্রণা । আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতই দয়ালু ছিলেন যে এত কষ্ট সহ্য করার পরেও তিনি দ্বীনকে ছেড়ে দেননি। কাফেররা তাকে প্রলোভন দেখিয়েছিল নবি করিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা চাইবেন তাই তারা দিবে তবুও যেন ইসলাম প্রচার বন্ধ করে দেয় । কিন্তু না! তিনি তো সত্য ধর্মের বাহক ! তিনি চন্দ্র-সূর্য এনে দেয়ার বিনিময়েও নিজের দ্বীনকে ত্যাগ করবেন না ।
কতশত সাহাবি / সাহাবিয়া আছেন যারা দ্বীনের জন্য কতশত দুঃখ-যন্ত্রণা বরণ করে নিয়েছেন । ইসলামের প্রথম মহিলা শহিদ হযরত সুমাইয়্যা রাঃ তিনিও তো ছিলেন একজন নারী । সত্য ধর্ম পালন পরিত্যাগ না করার কারণে কাফেররা তাকে অসহনীয় নির্যাতন করেছে ,শারীরিক মানসিক কোনো নির্যাতনই বাদ যায়নি অতঃপর তিনি দুনিয়া ত্যাগ করে মহান রব্বুল আলামীনের সান্নিধ্যে চলে গেছেন শহিদি মর্যাদার অধিকারী হয়ে । তিনি একজন নারী হয়ে যদি এত নির্মম অত্যাচার সহ্য করতে পারেন, শত সহস্র কষ্টের পরেও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার উপর বিশ্বাস করে,ভরষা করে দ্বীনের পথে অবিচল থাকতে পারেন তাহলে জারিন কেন পারবে না এগুলোই ছিল জারিনের মনোভাবনা ।সকল কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানুষকে মহাপুরষ্কার হিসেবে জান্নাত দান করবেন ইন শা আল্লাহ ।আর সেই আশাতেই জারিন তার নতুন জীবনের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চললো ।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সকলকে সঠিক দ্বীন বুঝার এবং পালন করার তৌফিক দান করুন আমীন ।
Reporter Name 




















