আমাদের ই-পেপার পড়তে ভিজিট করুন
ই-পেপার 📄
০৮:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেষতত্ত্ব গল্পটি লিখেছেন ইরি অতনু

{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":["local"],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{"transform":1},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":true,"containsFTESticker":false}

২৪৪

শিরোনাম-মেষতত্ত্ব
কলমে- ইরি অতনু

​অনির্বাণ শহরতলীর এক মোড়ে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক সিগন্যালের দিকে তাকিয়ে ছিল। লাল বাতি জ্বলছে, অথচ একদল মানুষ জেব্রা ক্রসিং উপেক্ষা করেই উল্টো দিকের ভিড়ে মিশে যাওয়ার জন্য মরিয়া। অনির্বাণের মনে হলো, এরা কি সত্যিই মানুষ, নাকি আধুনিক যুগের একেকটি ‘মেষ’? যাদের নিজস্ব কোনো গতিপথ নেই, কেবল সামনের জন যেদিকে যাচ্ছে, সেদিকেই অন্ধভাবে ছুটে চলা।
​অনির্বাণ প্রতিদিন দেখে, সমাজের প্রতিটি স্তরে এক অদ্ভুত মানসিক দাসত্ব গেঁড়ে বসেছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য আজ ডাস্টবিনে রাখা পুরনো খবরের কাগজের মতো মূল্যহীন।

সেদিন তার ছোট ভাই তূর্যর সাথে কথা হচ্ছিল। তূর্য মেধাবী, কিন্তু সে অস্থির। অনির্বাণ তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই বড় হয়ে কী হতে চাস?” তূর্যর উত্তর ছিল সোজাসাপ্টা— “সবাই তো এখন অমুক বিষয়ে পড়ছে, আমাকেও ওদিকেই যেতে হবে। ওখানেই নাকি ক্যারিয়ার।” অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শিক্ষা এখন আর জ্ঞান অর্জনের তৃষ্ণা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে নিজেকে ফেলে ‘পণ্য’ হিসেবে গড়ে তোলার কারখানা। নিজস্ব সৃজনশীলতা বা মৌলিক চিন্তার চেয়ে সবাই এখন ‘ট্রেন্ড’ বা হিড়িকের পেছনে ছুটছে। কেউ নিজেকে চেনার চেষ্টা করছে না।

অফিসে যাওয়ার পথে অনির্বাণ দেখেছে রাজনৈতিক মিছিলে স্লোগান দিচ্ছে একদল যুবক। তাদের অনেকেরই জানা নেই তারা কেন সেখানে দাঁড়িয়ে। অথচ উত্তেজনায় তারা ফুটছে। এটা এক বিশাল গণ-মনস্তত্ত্ব। রাজনীতির মাঠে কিংবা অর্থনীতির বাজারে—ব্যক্তি তার বিবেককে বিসর্জন দিয়ে দলের বা গোষ্ঠীর স্রোতে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে। বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে চায়ের দোকানে হাহাকার ঠিকই চলে, কিন্তু সেই সমস্যা সমাধানে গঠনমূলক কোনো উদ্যোগের চেয়ে একে অপরকে অন্ধভাবে দোষারোপ করার মধ্যেই সবাই সার্থকতা খুঁজে পায়। এখানে যুক্তির চেয়ে আবেগ আর অনুকরণই প্রধান।

সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় অনির্বাণের যখন সে দেখে আমাদের সমসাময়িক সংস্কৃতিকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন ‘ভাইরাল’ হওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। কেউ একজন একটি অদ্ভুত কাজ করলে হাজার হাজার মানুষ তার অনুকরণ শুরু করে। নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে মানুষ এখন যান্ত্রিক প্রতিকৃতি। কেউ কবিতা পড়ে না, কেউ সূর্যাস্ত দেখে না; সবাই ব্যস্ত সেই সূর্যাস্তের সাথে একটি ‘পারফেক্ট’ সেলফি তুলে ভিড়ের মধ্যে নিজেকে জাহির করতে। মানুষের নিজস্ব রুচি বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই।

সেদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামল। অনির্বাণ দেখল, সবাই ছাতা মাথায় দিয়ে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছে। কিন্তু সে থামল। সে ভাবল, সবাই যেদিকে দৌড়াচ্ছে, তাকেও কি সেদিকেই যেতে হবে? সমাজ আজ এক গভীর সংকটে—যেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতার চেয়ে জিপিএ বড় হয়ে উঠেছে, অর্থনীতিতে সততার চেয়ে মুনাফা বড়, আর রাজনীতিতে দর্শনের চেয়ে পেশীশক্তি।
​অনির্বাণ ঠিক করল, সে আর এই মেষপালের অংশ হবে না। সে অন্ধভাবে কাউকে অনুসরণ করবে না। সে পড়বে সেই বইগুলো যা কেউ পড়ে না, ভাববে সেই কথাগুলো যা কেউ ভাবে না। সমাজ জাগরণের মূল চাবিকাঠি তো এখানেই—নিজস্বতার উদ্বোধন।
​সেদিন বাড়ি ফেরার পথে সে তূর্যকে ফোন করে বলল, “তূর্য, তুই কি হবি সেটা তুই নিজে ঠিক করিস। ভিড়ের অংশ হওয়া সহজ, কিন্তু নিজের রাস্তা তৈরি করতে অনেক সাহস লাগে। সেই সাহসী মানুষটাই হ।”
​অনির্বাণ জানে, রাত শেষ হলে সূর্য উঠবেই। কিন্তু সেই সূর্যের আলোয় কারা নিজেদের স্বকীয়তা চিনতে পারবে, সেটাই আসল প্রশ্ন। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য আর সুস্থ চিন্তার মাধ্যমেই এই আধুনিক মেষতত্ত্ব বা মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি সম্ভব।

এই বিষয়ের ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সাংবাদিকের তথ্য জানুন

🎉 Shapno24 প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী 🎉

আগামী ৩১ জুলাই www.shapno24.com এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হবে।

🎊 শুভেচ্ছা কার্ড তৈরি করুন 🎊

নিজের নাম দিয়ে আকর্ষণীয় Greeting Card তৈরি করুন।

Greeting Card তৈরি করুন

মেষতত্ত্ব গল্পটি লিখেছেন ইরি অতনু

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭:৪৫:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
২৪৪

শিরোনাম-মেষতত্ত্ব
কলমে- ইরি অতনু

​অনির্বাণ শহরতলীর এক মোড়ে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক সিগন্যালের দিকে তাকিয়ে ছিল। লাল বাতি জ্বলছে, অথচ একদল মানুষ জেব্রা ক্রসিং উপেক্ষা করেই উল্টো দিকের ভিড়ে মিশে যাওয়ার জন্য মরিয়া। অনির্বাণের মনে হলো, এরা কি সত্যিই মানুষ, নাকি আধুনিক যুগের একেকটি ‘মেষ’? যাদের নিজস্ব কোনো গতিপথ নেই, কেবল সামনের জন যেদিকে যাচ্ছে, সেদিকেই অন্ধভাবে ছুটে চলা।
​অনির্বাণ প্রতিদিন দেখে, সমাজের প্রতিটি স্তরে এক অদ্ভুত মানসিক দাসত্ব গেঁড়ে বসেছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য আজ ডাস্টবিনে রাখা পুরনো খবরের কাগজের মতো মূল্যহীন।

সেদিন তার ছোট ভাই তূর্যর সাথে কথা হচ্ছিল। তূর্য মেধাবী, কিন্তু সে অস্থির। অনির্বাণ তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই বড় হয়ে কী হতে চাস?” তূর্যর উত্তর ছিল সোজাসাপ্টা— “সবাই তো এখন অমুক বিষয়ে পড়ছে, আমাকেও ওদিকেই যেতে হবে। ওখানেই নাকি ক্যারিয়ার।” অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শিক্ষা এখন আর জ্ঞান অর্জনের তৃষ্ণা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে নিজেকে ফেলে ‘পণ্য’ হিসেবে গড়ে তোলার কারখানা। নিজস্ব সৃজনশীলতা বা মৌলিক চিন্তার চেয়ে সবাই এখন ‘ট্রেন্ড’ বা হিড়িকের পেছনে ছুটছে। কেউ নিজেকে চেনার চেষ্টা করছে না।

অফিসে যাওয়ার পথে অনির্বাণ দেখেছে রাজনৈতিক মিছিলে স্লোগান দিচ্ছে একদল যুবক। তাদের অনেকেরই জানা নেই তারা কেন সেখানে দাঁড়িয়ে। অথচ উত্তেজনায় তারা ফুটছে। এটা এক বিশাল গণ-মনস্তত্ত্ব। রাজনীতির মাঠে কিংবা অর্থনীতির বাজারে—ব্যক্তি তার বিবেককে বিসর্জন দিয়ে দলের বা গোষ্ঠীর স্রোতে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে। বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে চায়ের দোকানে হাহাকার ঠিকই চলে, কিন্তু সেই সমস্যা সমাধানে গঠনমূলক কোনো উদ্যোগের চেয়ে একে অপরকে অন্ধভাবে দোষারোপ করার মধ্যেই সবাই সার্থকতা খুঁজে পায়। এখানে যুক্তির চেয়ে আবেগ আর অনুকরণই প্রধান।

সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় অনির্বাণের যখন সে দেখে আমাদের সমসাময়িক সংস্কৃতিকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন ‘ভাইরাল’ হওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। কেউ একজন একটি অদ্ভুত কাজ করলে হাজার হাজার মানুষ তার অনুকরণ শুরু করে। নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে মানুষ এখন যান্ত্রিক প্রতিকৃতি। কেউ কবিতা পড়ে না, কেউ সূর্যাস্ত দেখে না; সবাই ব্যস্ত সেই সূর্যাস্তের সাথে একটি ‘পারফেক্ট’ সেলফি তুলে ভিড়ের মধ্যে নিজেকে জাহির করতে। মানুষের নিজস্ব রুচি বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই।

সেদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামল। অনির্বাণ দেখল, সবাই ছাতা মাথায় দিয়ে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছে। কিন্তু সে থামল। সে ভাবল, সবাই যেদিকে দৌড়াচ্ছে, তাকেও কি সেদিকেই যেতে হবে? সমাজ আজ এক গভীর সংকটে—যেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতার চেয়ে জিপিএ বড় হয়ে উঠেছে, অর্থনীতিতে সততার চেয়ে মুনাফা বড়, আর রাজনীতিতে দর্শনের চেয়ে পেশীশক্তি।
​অনির্বাণ ঠিক করল, সে আর এই মেষপালের অংশ হবে না। সে অন্ধভাবে কাউকে অনুসরণ করবে না। সে পড়বে সেই বইগুলো যা কেউ পড়ে না, ভাববে সেই কথাগুলো যা কেউ ভাবে না। সমাজ জাগরণের মূল চাবিকাঠি তো এখানেই—নিজস্বতার উদ্বোধন।
​সেদিন বাড়ি ফেরার পথে সে তূর্যকে ফোন করে বলল, “তূর্য, তুই কি হবি সেটা তুই নিজে ঠিক করিস। ভিড়ের অংশ হওয়া সহজ, কিন্তু নিজের রাস্তা তৈরি করতে অনেক সাহস লাগে। সেই সাহসী মানুষটাই হ।”
​অনির্বাণ জানে, রাত শেষ হলে সূর্য উঠবেই। কিন্তু সেই সূর্যের আলোয় কারা নিজেদের স্বকীয়তা চিনতে পারবে, সেটাই আসল প্রশ্ন। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য আর সুস্থ চিন্তার মাধ্যমেই এই আধুনিক মেষতত্ত্ব বা মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি সম্ভব।