
গল্প- অবন্তীর অনুরক্তি
লেখা – শেখ মিন্নাতুল মকসুদ অর্চি
আজ অবন্তীর বড় বোন শ্রাবন্তীর বিয়ে।বিরাট ধুমধাম করে বিয়ে না হলেও মুটামুটি ভালো আয়োজন হয়েছে বাসায়।কমিউনিটি সেন্টারে না হয়ে বাসাতেই বিয়ে হবে।ছাদে লোক খাওয়ানো হবে,বিয়ে পরানো ও আন্দর বাসার ভিতরেই।সারা ফ্ল্যাট বাসা সাজানো হয়েছে মরিচবাতি দিয়ে।ছাদে সুন্দর করে ডেকোরেশন করা হয়েছে। ডুয়িং রুম ও শ্রাবন্তীর রুমটাও সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। বাসায় বিয়ে তাই বাসায় লোকজন গিজগিজ করছে।প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, ছেলে-মেয়ে ভর্তি। অবন্তীর এইসব ভীড় ভাট্টা একদম ভালো লাগছে না।বড্ড বিরক্ত লাগছে তার।ইচ্ছে করছে নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে শুয়ে একটু কাঁদতে। তারও উপায় নেই তার রুমেও লোকজন ভর্তি। গোমড়া মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে।তার মন খুবই খারাপ।একদম সাজতেও ইচ্ছে করছে না তার।পার্লার থেকে মেয়ে এসেছে কয়েকজন। শ্রাবন্তীকে সাজাচ্ছে। সবাই জোর করছে অবন্তীকে সেও যেন সাজে।অবন্তীর ছোট খালার মেয়ে তৃষা বড্ড পাকনা মেয়ে জোর করে অবন্তীকে নিয়ে গেলো শ্রাবন্তীর ঘরে।গিয়ে বললো, দেখো তো তোমরা অবন্তী আপু কেমন মুখ গোমড়া করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাকে ভালো করে সাজিয়ে দাও। অবন্তীর ছোট খালাও মেক আপ করছিলেন হেসে বললেন, বড় বোনের বিয়ে,আজ বিয়ে করে শশুড়বাড়ি চলে যাবে বোনটা,মন তো খারাপ হবেই।কিন্তু এই কারণে অবন্তীর মন খারাপ না,অন্য একটা কারণ যা কাউকে বলা যাবে না।আবার নিজের মধ্যে লুকিয়ে সহ্যও করা যাবে না,দম বন্ধ করে মরতে হবে তাকে।অবন্তীর থেকে শ্রাবন্তী বয়সে খুব বেশি বড় নয় দেড় বছরের বড়। তারা পিঠপিঠি।তাদের মধ্যে সারাদিন ঝগড়া লেগেই থাকে। কিন্তু শ্রাবন্তীকে অবন্তী ভীষণ ভালোবাসে।কিন্তু এই বিয়েটা হোক তা অবন্তী চায় না কিছুতেই চায় না।কিন্তু বড় বোনের বিয়ে ভেঙে যাক তার বদনাম হোক,পরিবারের বদনাম হোক তাও সে চায় না।সে আছে ভীষণ মুসকিলে অথৈ সমুদ্রে হাবুডুবু অবস্থায়। কিছু কইতেও পারে না,সইতেও পারে না।সবাই অনেক সাজিয়ে দিতে চাইলো কিন্তু সে সাজলো না।অনেক জোরাজুরির পর তার জন্য আনা নতুন জামাটা পড়লো। অবন্তী বসে বসে দেখছে শ্রাবন্তীর মুখ হাসি হাসি।শ্রাবন্তী মন ভরে সাজছে,সবার সাথে কথা বলছে।অথচ সে তো অবন্তীকে বলেছিলো,এই বিয়ে সে করবে না।তার মত নেই এই বিয়েতে। পাত্রকেও তার পছন্দ নয় তাহলে এত সাজছে কেনো! এত খুশিই বা কেন বুঝতে পারছে না সে।পাত্রকে কেনো পছন্দ নয় তাও অবন্তী বুঝতে পারে না।তার মতে তিহুন ভাইয়া মানে পাত্র দেখতে খুবই সুন্দর, স্মার্ট, হ্যান্ডসাম, উচ্চশিক্ষিত। তার বাবার বন্ধুর ছেলে। তিহুন ভাইয়াকে তো অবন্তীর খুবই ভালো লাগে। প্রায়ই আসতো বাসায়।অবন্তীর জন্য চকলেট আনতো,অবন্তীর সাথে হেসে কথাও বলতো।তখন শ্রাবন্তী বাসায় ছিলো না,ভার্সিটিতে পড়তো হলে থাকতো। শ্রাবন্তী ও তিহুনের পারিবারিক ভাবে বিয়ে ঠিক হলো কিছুদিন আগে।দুজনের মধ্যে তেমন মিল নেই।দুজন ই পরিবারের চাপে পড়ে বিয়েতে রাজি হয়েছে।এই বিয়েটা হলে তাদের বাবাদের বন্ধুত্ব ও ব্যবসা দুইটাতেই লাভ হবে সম্পর্ক দৃঢ় হবে তাই বিয়ে করা।শ্রাবন্তী তো তিহুনকে দেখতেই পারে না।নাম শুনলেই রাগ করে তাহলে কেন বিয়ে করছে তা অবন্তী বুঝতে পারছে না।বিয়ে না করুক তিহুনকে কিছু বললে ভালো লাগে না অবন্তীর। মনে একটা চাপা রাগ হয়।তিহুন ভাইয়া তার চোখে দেখা শ্রেষ্ঠ সুপুরুষ। এসব চিন্তায় যখন অবন্তী ধ্যানমগ্ন ছিলো তখন সোরগোল এলো, এই বর এসেছে,বর এসেছে।গেইট ধরো,জামাইকে আটকাও।অবন্তী গেলো না,চুপ করে বসে রইলো। গেইট ধরতে তার ইচ্ছে করছে না। তার অন্য কাজিনরা ফুল,শরবত, মিষ্টি নিয়ে গেছে গেইট ধরতে।হটাৎ অবন্তীর ভীষণ দেখতে ইচ্ছে হলো বর বেশে তিহুনকে দেখতে কেমন লাগছে।শ্রাবন্তীর দিকে তাকিয়ে দেখলো সে,শ্রাবন্তী কার সাথে যেন মোবাইলে কথা বলছে।সে তখন গুটিগুটি পায়ে হেটে চললো, তিহুনকে এক নজর দেখবে বলে।অবন্তী গেইট ধরতে গেলো না দূর থেকে দাঁড়িয়ে তিহুনকে ভিড়ের মধ্যে খুঁজতে লাগলো। হটাৎ দেখা গেলো বর বেশে তিহুনকে,সাদা সেরোয়ারি,লাল উড়না,সাদা পাগড়ি মাথায়।দেখতে অপূর্ব লাগছে সুদর্শন, সুপুরুষ। কিন্তু মুখটা কেমন মলিন,শুকনো হাসি নেই।মনে হচ্ছে জোর করে কেউ ধরে নিয়ে এসেছে বিয়ে করানোর জন্য।কিন্তু অবন্তীর বাসায় যে আগে আসতো কত হাসি হাসি থাকতো তিহুন।তবে আজ এমন গম্ভীর কেন! অবন্তী আরও একটু পিছিয়ে গেলো। বর গেইট দিয়ে ডুকে ছাদে চলে গেলো সেখানে বর এর বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।অনেক গুলো টাকা পেয়ে কাজিনরা খুবই খুশি।টাকা আর ফুলের ডালি নিয়ে তৃষা এদিকে আসছিলো হটাৎ অবন্তীকে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো, কি হলো আপু? তুমি গেইট ধরলে না কেন? নিজের বোনের বিয়ের গেইট ধরতে গেলে না? নিজের দুলাভাই এর সাথে তো প্রথম মজাটাই মিস করলে তুমি।কেন গেলে না হুম,বলো!হটাৎ অবন্তী কেমন ধমকে উঠে বললো, যাহ তো! বিরক্ত করিস না।আমার ভালো লাগছে না, মাথা ধরেছে।আর দুলাভাই আবার কি? তিহুন ভাইয়াকে আগে থেকেই চিনি,ভাইয়া ডাকি।আজ আপুর সাথে বিয়ে বলে দুলাভাই ডাকবো নাকি!তৃষা হটাৎ এমন ব্যবহারে অবাক হলো। অবন্তী ও কোন সময় রাগ করে না, ধমকের সুরে কথা বলে না।তাহলে আজ কি হলো আর তৃষাই এমন কি বললো তাকে।তৃষা ভ্রু কুচকে কিছু একটা আন্দাজ করার চেষ্টা করলো তারপর কিছু না বলে চলে গেলো। হটাৎ অবন্তীর যেন কান্না পেলো।সব ঝাপসা দেখছে সে।কেনো তার এমন লাগছে তা কাউকে বুঝাতে পারছে না সে।তার মনে হলো কেউ নির্দিষ্ট মানুষটাকে না চেয়েও পেয়ে যায় তারপর তার ঠিকঠাক মূল্যও দিতে জানে না।আর কেউ কেউ অনেক সাধনা করেও সে মানুষটিকে পায় না।অবন্তী অনুভব করলো তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। সে তারাতাড়ি তা হাত দিয়ে মুছে ফেললো। কেউ দেখলে কি ভাববে!আর এসব কি ভাবছে সে।আজ তার বোন শ্রাবন্তীর বিয়ে হয়ে যাবে তিহুনের সাথে।ভাগ্যে যা লিখা আছে তাই তো হবে তাতে এত কষ্ট পাওয়ার কি আছে তার!যার ভাগ্যে যে লেখা, জন্ম,মৃত্যু, বিয়ে তো নাকি আগে থেকেই নির্ধারিত তাহলে! অবন্তী মনে মনে ভাবলো তিহুন যদি তার ভাগ্যে লেখা থাকতো।আজ যদি বর বেশে তিহুন তার জন্য আসতো। আচ্ছা তাকে বউ সাজে কেমন লাগতো! হটাৎ কেমন ধাক্কা খেলো মনে, ছি!ছি!কিসব ভাবছে সে।এটা কি করে সম্ভব! শ্রাবন্তী তার বড় বোন,তারই তো আগে বিয়ে হবে।তাদের পরিবারের নিয়মই এটা,আগে বড় জনের বিয়ে হবে তারপর ছোট জনের।বহু বছরের ধারাবাহিকতা এটা তাদের পরিবারের। এই নিয়ম ভাঙলে নাকি অকল্যাণ হয় তাদের পরিবারের। একবার নিয়ম ভেঙে অবন্তীর মেঝু ফুপিকে রেখে ছোট ফুপিকে বিয়ে দেওয়া হলো। কিছুদিন পরেই তালাক হয়ে গেলো ফুপির।সংসার করা হলো না আর মেয়েটির। তাই অবন্তীর বাবার কড়া নির্দেশ আগে বড় মেয়ের বিয়ে তারপর ছোট মেয়ের।কিন্তু এই বিয়েটা যে অবন্তী মন থেকে মেনে নিতে পারছে না।তার সমস্ত মন বিদ্রোহ, চিৎকার করতে চাইছে।বলতে চাইছে তিহুন এই বিয়ে করবেন না,আমি আপনাকে ভালোবাসি। কিন্তু কি করে সে তার মনের অনুরক্তি করবে!এ যে সমাজ বিরুদ্ধ। বড় বোনের স্বামীকে ভালোবাসা, পাপ,অন্যায়, ধর্মবিরুদ্ধ। আচ্ছা বিয়ের পর কি ভাবে তাদের দুজনকে এক সাথে দেখবে অবন্তী। তার কি বুক ফেটে কান্না আসবে না!না,এটা দেখা সম্ভব নয়। তিহুন অন্য কারও তাও আবার তার নিজের বড় বোনের স্বামী তা কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না সে।এই যন্ত্রণা থেকে মৃত্যু শ্রেয়।হ্যাঁ, মৃত্যুই এখন একমাত্র মুক্তির পথ।বিয়ে হবার আগেই,তিহুনের মুখ থেকে কবুল শুনার আগে অবন্তী নিজেকে শেষ করে দিবে।এ জীবন সে আর রাখবে না।যেই ভাবা সেই কাজ,অবন্তী ছুটে গেলো রান্না ঘরে। রান্না ঘর ফাঁকা, সব রান্না বাহিরে হচ্ছে তাই কেউ নেই আজ রান্না ঘরে। অবন্তী এদিক ওদিক তাকিয়ে শেল্ফ এ রাখা একটা ছুরি দেখতে পেলো।তারপর কোনো কিচ্ছু আর চিন্তা না করে হাতের শিরা কাটবে বলে যেই গেলো তখনই তার হাতটা কে যেন চেপে ধরলো। অবন্তী তাকিয়ে দেখলো তৃষা।তৃষা হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিয়ে বিষ্মিত হয়ে বললো, একি করছিলে তুমি?অবন্তী হটাৎ হাউমাউ করে কেঁদে বলে উঠলো, আমি আর বাঁচতে চাই না। তৃষা অবাক,কিন্তু কেন?অবন্তী কিছু বললো না,তৃষাকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলো। তৃষা অনেক বুদ্ধিমতি,সে আন্দাজ করে বললো, তুমি তিহুন দুলাভাইকে ভালোবাসো? অবন্তী চুপ করে ছিলো। কিন্তু তৃষা তো চুপ থাকার মেয়েই নয়,নাছুড়বান্দা।এক সময় অবন্তী স্বীকার করলো তার ভালোবাসার কথা।তৃষা শুনে হতবাক।সে বিষ্ময়ে বললো, তাহলে বলো নি কেন আগে? অবন্তী কেঁদে কেঁদে বললো, কাকে বলবো আমি! আপুর সাথে বিয়ে ঠিক হলো। আর এই বাড়ির নিয়মই তো আগে বড় মেয়ের বিয়ে হবে।
তৃষা: তাই বলে বলবে না কিছু।
অবন্তী : না,কিভাবে বলতাম।সবাই আপুর সাথে হটাৎ বিয়ে ঠিক করে ফেললো। আমি কি নির্লজ্জ নাকি যে বলবো, আপুকে না আমাকে বিয়ে দাও!আমি তিহুনকে ভালোবাসি।
তৃষা: তিহুন কাকে ভালোবাসে? তোমাকে না শ্রাবন্তী আপুকে?
অবন্তী : কাউকেই না। তবে যা বুঝতে পেরেছি আপুকে উনার পছন্দ হয়নি।বিয়ে ঠিক হবার পরেও ওদের মধ্যে কোনো দেখা বা কথা হয় নি।
তৃষা: তাহলে এখন কি হবে?
অবন্তী কেঁদে বললো, আমি মরে যেতে চাই।তৃষা অবন্তীকে সামলাচ্ছিলো এমন সময় শ্রাবন্তীর রুম থেকে সোরগোল এলো। চাপা গলায় কি যেন বলছে মহিলারা।তৃষা অবন্তীকে চুপ করিয়ে নিয়ে গেলো দেখতে কি হয়েছে।সেখানে গিয়ে যা শুনলো তাতে অবন্তীর বিষ্ময়ের শেষ নেই।শ্রাবন্তী ঘরে নেই।মানে! শ্রাবন্তী পালিয়ে গেছে।যখন বরযাত্রী এলো তখন শ্রাবন্তী পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেছে তার প্রেমিকের সাথে।কি সর্বনাশের কথা! একি করলো শ্রাবন্তী!অবন্তীর মাথায় কিছুই ডুকলো না।শ্রাবন্তীর মনে এই ছিলো! তাই এত হাসিখুশি ছিলো সে।অবন্তী কিছুই টের পায় নি।তাকে কিছুই বলে নি শ্রাবন্তী।পালিয়েই যদি যাবে তাহলে এত সুন্দর করে বউ সাজে সাজলো কেন? অবন্তী কিছুই বুঝতে পারছে না। কি হবে এখন? হটাৎ বাহির থেকে উচ্চস্বরে কথা শুনা যাচ্ছে। অবন্তীর বাবা প্রচন্ড রাগে চিৎকার করছেন।দৌড়ে গেলো সবাই সেখানে।গিয়ে দেখলো অবন্তীর মা অজ্ঞানের মতো সোফায় বসা।তাকে অবন্তীর এক ফুপি ধরে রেখেছেন। অবন্তীর বাবা কাকে যেন ফোনে বলছেন,যেখান থেকে পারিস খোঁজে আন মেয়েকে।আমি কিছুই জানি না।আজ বিয়ে না হলে আমার মান সম্মান সব যাবে।বদজাত মেয়ে কোথাকার! পালিয়ে যাবার আগে একবার আমাদের কথা ভাবলো না।অবন্তীর হাত-পা কাঁপছে। কি হবে এবার! তার বুকে পাথর রেখে সেতো তার ভালোবাসার মানুষটিকে তার আপুকে দিয়েই দিয়েছিলো। কি করলো এটা আপু! দুপুর গড়িয়ে বিকেলে খবর এলো শ্রাবন্তী পালিয়ে গিয়ে তার ভার্সিটির প্রেমিককে কাজি অফিসে বিয়ে করেছে।শুনে অবন্তীর বাবার মাথায় রক্ত উঠে গেলো। এখন কি হবে? তার মান সম্মান তো কিছুই রইলো না।তিহুনের বাবাও রাগারাগি করছেন।তার মান সম্মানই বা কি বাকি রইলো!বউ ছাড়া বাড়ি গিয়ে সব আত্মীয় লোকজনকে তিনি কি জবাব দিবেন যে, বউ বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে গেছে। ছি!ছি!কি লজ্জার বিষয় এটা।তিহুনকে পছন্দ নয় তা বললেই হতো। এমন নাটক করে লোক হাসিয়ে বিয়ের দিন পালিয়ে যাবার কোনো মানেই হয় না।এটা তিহুনের জন্যই বড্ড অপমানজনক।তিহুন মাথা নিচু করে সোফায় বসে আছে। মুখ শুকনো, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।অবন্তীর তিহুনের জন্য বড্ড মায়া লাগছে,এখন থেকে কি সবাই তিহুনকে নিয়ে হাসাহাসি করবে? সবাই বলবে,ব্যাটা বিয়ে করতে গিয়েছিলো কিন্তু বউ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পালিয়ে গেছে।কি লজ্জার বিষয়! অবন্তীর কল্পনা করলো সবাই তিহুনের দিকে আঙুল তুলে হাসছে এমন বিভদ্স কল্পনা করে অবন্তী একটু জুড়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। পাশেই অবন্তীর ছোট খালা ছিলো অবন্তীকে জড়িয়ে ধরে বললো, কি হয়েছে? কাঁদছিস কেন? ভয় পাচ্ছিস? শ্রাবন্তীর জন্য টেনশন হচ্ছে? অবন্তী কেঁদেই চললো। ছোট খালা ডাক দিলো তৃষাকে।বললো, দেখ তো অবন্তীর কি হলো! তৃষা বললো, বিয়ে হবে না তো আর কাঁদছো কেন? অবন্তী কেঁদে বললো, আমার তিহুন ভাইয়ার জন্য ভীষণ মায়া লাগছে। আজ তার বিয়ে না হলে লোকে কি বলবে তাকে।সবাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে।পরে যদি অপমান সইতে না পেরে কিছু করে বসেন উনি। তার থেকে আজ বিয়েটা হয়েই যেতো। আমি তো সব ছেড়ে নিরবে সহ্য করে নিয়েছিলাম।হটাৎ তৃষার মনে একটা বুদ্ধি খেলে যায়।সে তার মাকে কানে কানে কি যেন বলে।অবন্তীর ছোট খালা মাথা নাড়িয়ে কি যেন ইশারা দিয়ে অবন্তীর বাবার কাছে গিয়ে অবন্তীর বাবাকে কি যেন বলে।শুনে যেন অবন্তীর বাবার মুখটা হটাৎ খুশিতে চকচক করে উঠে। আনন্দিত হয়ে বলে, বাহ! ভালো বুদ্ধি! এটা তো আগে ভাবি নি।তারপর তিহুনের বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলে,দেখ বন্ধু। আমার ছোট শালী আমাকে একটা প্রস্তাব দিয়েছে,তুমি রাজি থাকলে…।তিহুনের বাবা বিষ্মৃত হয়ে বললেন,কি প্রস্তাব! অবন্তীর বাবা হেসে বললেন, আমার ছোট মেয়ে অবন্তীকে তুমি তো খুব ভালো করেই চিনো।যদি আমার বড় মেয়ের বদলে ছোট মেয়ে তোমার ঘরের বউ হয়ে যায়,তোমার কি তাতে কোন আপত্তি আছে? বিয়ে হয়ে গেলো, লোক জানাজানি হলো না।দুই পরিবারের সম্মান বাঁচলো।তিহুনের বাবা হতবাক হলেন কিছুটা তারপর অট্টহাসি দিয়ে বললেন, এটা তো খুবই ভালো প্রস্তাব। অবন্তী মামনিকে বউ করে নিতে আমাদের কারোই আপত্তি নেই।বরং আমরা তো প্রথমে ভেবেছিলাম অবন্তীকে বউ করে নেওয়ার কথাই।তুমিই তো বাধা দিলে বললে, বড় মেয়ে রেখে ছোট মেয়েকে বিয়ে দিবে না।এতে বাড়ির অমঙ্গল হবে।অবন্তীর বাবা বললেন, না এখন আর কোনো অসুবিধা নেই। পাজি মেয়েটা তো আগে বিয়ে করেই ফেললো। এখন আর অমঙ্গল এর প্রশ্নই উঠে না।তিহুন কি বলে সে রাজি তো? তিহুন হেসে মাথা দিয়ে সম্মতি জানায় সে রাজি।অবন্তীকে সে বিয়ে করবে।অবন্তী এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো স্তব্ধ হয়ে। এগুলো কি হচ্ছে তা কিছুই সে বুঝতে পারছে না।সব যেন মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। যে মানুষটাকে সে হারিয়ে ফেলেছিলো, তার বড় বোনের সাথে বিয়ে হবার কথা ছিলো হটাৎ এখন তারই সাথেই তার বিয়ে হবার কথা হচ্ছে। আবার আজকেই! অবন্তীর মাথা যেন ঘুরছে।মনে হচ্ছে শূন্যে ভাসছে সে।এটা স্বপ্ন নাকি বাস্তব তা বুঝতে পারছে না সে।ঘোর এর মধ্যে চলে গেলো সে।হটাৎ এক ধাক্কায় ঘোর কাটলো তার।তৃষা ধাক্কা দিলে বললো, এই আপু খালু কি বলছেন শুনতে পারছো না? অবন্তী তাকিয়ে দেখলো, তার বাবা তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করছেন,মা এই বিয়েতে তোমার মত আছে? অবন্তী হটাৎ যেন বোবা হয়ে গেলো। সে যাকে ভালোবাসে তার সাথে বিয়ের কথায় সে রাজি তা অবন্তীর চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে কিন্তু অবন্তী মুখ দিয়ে কিছুই বলতে পারছে না।স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।অবন্তীর বাবা আবার জিজ্ঞেস করলেন কিন্তু অবন্তী মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে স্তব্ধ হয়ে। তখন ওর ছোট খালা বলে উঠলো, আহ! দুলাভাই দেখছেন না মেয়েটা লজ্জা পাচ্ছে। ও রাজি আছে।আপনি বিয়ের আয়োজন করুন।কিছুক্ষণ পরেই অবন্তী ও তিহুনের বিয়ে হয়ে গেলো। সবাই হাসিখুশি এই বিয়েতে।দুই পরিবারের সম্মান বাঁচলো। শুধু অবন্তী যেন ঘোরের মধ্যে আছে।তার বিয়ে হয়ে গেলো তাও আবার তার ভালোবাসার মানুষটির সাথে।ভাবতেই শিউরে উঠছে সে।কবুল বলার সময় ও যে কত কষ্টে উচ্চারণ করেছে সে শব্দটি একমাত্র সেই জানে।স্বাক্ষর দিয়েছে কাঁপা কাঁপা হাতে।শুধু দেখেছে তিহুনের নামের পাশে সে তার নামটি লিখে দিয়েছে। সমস্ত অন্তর আত্মা কাঁপছে তার। এটা খুশি,আতঙ্ক, আবেগ নাকি অন্য কিছু সে বুঝতে পারছে না। কেমন ঘোর লাগছে,মাথা ঘোরাচ্ছে। আবার এক আজানা ভয় হচ্ছে মনে।আচ্ছা তিহুন সেচ্ছায় বিয়েটা করেছে তো? নাকি শুধু পরিবারের সম্মান বাঁচাতে এই বিয়ে।তিহুন তো তার মনের অনুরক্তি জানে না সে কি মেনে নিবে অবন্তীকে।নাকি বাড়ি গিয়ে বোনের কৃতকার্যের শাস্তি তাকে দিবে।অবন্তী আর ভাবতে পারছে না তার গায়ে কাটা দিচ্ছে। এমন সময় সবাই তিহুনকে নিয়ে ঘরে ঢুকলো আন্দর করাবে বলে।অবন্তী কাঠ হয়ে বসে ছিলো। সবাই তিহুনকে বললো বউ উরনাটা সরিয়ে অবন্তীর মুখ দেখতে।তিহুন ঘোমটা সরালো কিন্তু অবন্তী তিহুনের দিকে তাকাতে পারলো না চোখ বন্ধ করে রাখলো।এক অজানা আতঙ্ক গ্রাস করলো তাকে।যদি দেখে তিহুন মুখ কালো করে ঘৃণার চোখে তাকিয়ে আছে তাহলে যে সে এটা সহ্য করতে পারবে না।অনেক বলার পরে সাহস করে অবন্তী চোখ খুলে দেখলো একরাশ হাসি মুখে,চোখে পুলক নিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তিহুন তাকিয়ে আছে অবন্তীর দিকে।সকালে বরবেশে গেইট ফিরানোর সময় যেমন উদ্ধিগ্ন দেখাচ্ছিলো তাকে,এখন তার ছিটে ফোটাও নেই। স্নিগ্ধ হাসি মাখা মুখ।দেখে মন জুড়িয়ে গেলো অবন্তীর । তার মানে কি তিহুনের পছন্দ ছিলো অবন্তীকে। এই বিয়েতে তার অমত নেই। খুশি মনে বিয়ে করেছে।তিহুনও ভালোবাসে অবন্তীকে।খুশিতে মনটা নেচে উঠলো অবন্তীর।সাথে সাথে চোখ থেকে দুফোঁটা অশ্রু টপটপ করে পড়লো গাল বেয়ে।সেই অশ্রুতে মিশে আছে তিহুনের জন্য অবন্তীর অনুরক্তি।
Reporter Name 




















