
আবেদন-স্মারকলিপির পরও মিলছে না এমপিও
এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত বিএম ও কারিগরি শিক্ষকদের চরম দুর্ভোগ
যোগদানের মাস পেরোলেও বেতনহীন হাজারো শিক্ষক, অনিশ্চয়তা, হতাশা ও মানবেতর জীবনযাপন
স্টাফ রিপোর্টার | স্বপ্ন ২৪ ডট কম
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দক্ষ, যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। দীর্ঘ প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া, লিখিত পরীক্ষা, ভাইভা এবং মেধাতালিকার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা দেশের শিক্ষা খাতকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তবে সম্প্রতি সপ্তম গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত দেশের বিভিন্ন বিএম কলেজ ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ, যোগদানের তিন থেকে চার মাস অতিবাহিত হলেও এখনো তাদের এমপিওভুক্তি সম্পন্ন হয়নি। ফলে সরকারি বেতন-ভাতা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে তাদের। নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পরীক্ষা কার্যক্রম, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করলেও মাসের পর মাস বেতন না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।
শিক্ষকরা জানান, তারা এনটিআরসিএ’র নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। চাকরিতে যোগদানের পর নতুন স্বপ্ন ও আশায় জীবন শুরু করলেও বাস্তবতা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটছে তাদের।
একাধিক শিক্ষক বলেন, চাকরিতে যোগদানের পর অনেকেই নতুন বাসা ভাড়া নিয়েছেন, কেউ পরিবার নিয়ে নতুন শহরে এসেছেন, আবার কেউ ধার-দেনা করে চাকরিতে যোগদান করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও বেতন না পাওয়ায় এখন তাদের জীবন হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তায় ভরা।
শিক্ষকদের অভিযোগ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক ইতোমধ্যে এমপিও সুবিধা পেয়েছেন। অথচ কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা এখনো এমপিও জটিলতায় আটকে আছেন। একই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও এক অংশের শিক্ষক বেতন পাচ্ছেন আর অন্য অংশ বঞ্চিত হচ্ছেন, এমন পরিস্থিতিকে বৈষম্যমূলক বলেই মনে করছেন তারা।
দ্রুত এমপিওভুক্তি ও বকেয়া বেতন প্রদানের দাবিতে সম্প্রতি কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর আবেদন ও স্মারকলিপি প্রদান করেছেন শিক্ষকরা। স্মারকলিপিতে তারা উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন বেতনহীন অবস্থায় চাকরি করায় অনেক শিক্ষক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় চলছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে ধার-দেনা করে সংসার পরিচালনা করছেন।
একজন শিক্ষক বলেন,
“আমরা নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছি, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করছি, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনে কাজ করছি। অথচ নিজের পরিবারটাকেই ঠিকভাবে চালাতে পারছি না। কয়েক মাসেও বেতন না পাওয়া সত্যিই কষ্টদায়ক।”
আরেক শিক্ষক বলেন,
“চাকরিতে যোগদানের পর পরিবারে অনেক আশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে এখন পরিবার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। ঈদ সামনে, অথচ এখনো বেতন নেই। মানবিক দিক বিবেচনা করে দ্রুত এমপিও ও বকেয়া বেতন চালু করা উচিত।”
শিক্ষকদের দাবি, দেশের উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গঠনে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই। সরকার ও বিভিন্ন মহল থেকেও বারবার কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন সময় দক্ষ জনশক্তি গঠন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন বলেও শিক্ষকরা উল্লেখ করেন। কিন্তু বাস্তবে এই খাতের শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে এখনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় শিক্ষকদের মানসিক চাপও বাড়ছে। অনেক শিক্ষক জানান, শিক্ষার্থীদের সামনে হাসিমুখে পাঠদান করলেও অন্তরে তারা গভীর অনিশ্চয়তা ও হতাশা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ বাবা-মায়ের চিকিৎসা করাতে পারছেন না, কেউ আবার সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
ঈদকে সামনে রেখে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। অন্যান্য চাকরিজীবীরা যখন পরিবার নিয়ে ঈদের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন এসব শিক্ষক এখনো বেতন ও এমপিওর আশায় দিন গুনছেন। অনেকের পরিবারে ঈদের কেনাকাটা তো দূরের কথা, নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করতেও কষ্ট হচ্ছে।
শিক্ষকরা মনে করছেন, প্রশাসনিক জটিলতা ও ধীরগতির কারণে তাদের এই দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে মেধাবী তরুণদের মধ্যে কারিগরি শিক্ষাখাতে কাজ করার আগ্রহ কমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
তাদের প্রধান দাবিগুলো হলো,
- দ্রুত এমপিওভুক্তির জটিলতা নিরসন করতে হবে।
- যোগদানের তারিখ থেকে বকেয়াসহ বেতন প্রদান করতে হবে।
- কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন শিক্ষকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ করতে হবে।
- ভবিষ্যতে যেন নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা এ ধরনের ভোগান্তির শিকার না হন, সে বিষয়ে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
- ঈদের আগেই জরুরি ভিত্তিতে এমপিও কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।
শিক্ষকরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি মানবিক ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, তারা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করতে চান, দক্ষ ও যোগ্য প্রজন্ম গড়ে তুলতে চান। কিন্তু দীর্ঘদিন বেতনহীন অবস্থায় দায়িত্ব পালন করা একজন শিক্ষকের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও অপমানজনক হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিএম কলেজ ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এসব নবনিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক দ্রুত এমপিওভুক্তি ও বকেয়া বেতন চালুর আশায় দিন গুনছেন।
Reporter Name 




















