আমাদের ই-পেপার পড়তে ভিজিট করুন
ই-পেপার 📄
০৬:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

“মানুষ উৎপাদনের খরা, শিকড় বিচ্ছিন্নতার চোরাবালি ও আত্মিক পচন” মানুষ উৎপাদনের খরা: শিকড় বিচ্ছিন্নতার চোরাবালি ও আত্মিক পচন – লিখেছেন প্রবন্ধটি -সৈয়দ হৃদয়

  • Reporter Name
  • প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:২০:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
  • ৩৩৬ পড়া হয়েছে
৩৭৩

মানুষ উৎপাদনের খরা: শিকড় বিচ্ছিন্নতার চোরাবালি ও আত্মিক পচন
-সৈয়দ হৃদয়

একটি সমাজ যখন তার চিন্তার পরিমণ্ডলে ও সংস্কৃতির অস্থি-মজ্জায় পচতে শুরু করে, তার পয়লা আলামত হলো, সে নিজের জমিনে প্রকৃত মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন, আত্মিক আলোয় বলীয়ান মানুষ উৎপাদনের জৈবনিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। একটা সময়ে গিয়ে এই উৎপাদন প্রক্রিয়াটাই সে সমূলে বন্ধ করে দেয়।

এই বন্ধ্যাত্বই সমাজকে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করায়। জমিনে উৎপাদনে খরা নামলে মানুষ না খেয়ে মরে, কিন্তু মানুষের উৎপাদনে খরা নামলে গোটা সমাজটাই একটা জ্যান্ত লাশ হয়ে টিকে থাকে। আমাদের বর্তমান দশা অবিকল এই লাশের মতো। বাইরে শোরগোল আছে, বুর্জোয়া বাজারের চাকচিক্য আর করপোরেট জৌলুসের কমতি নাই; কিন্তু ভেতরে কোনো আধ্যাত্মিক স্পন্দন নাই।

এই যে মানুষ পয়দা করার কারখানাটা সমূলে বন্ধ হয়ে যাওয়া, এই আত্মিক পচনটা কোনো হুট করে ধেয়ে আসা প্রাকৃতিক সুনামি নয়। এর পেছনে অতি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে কলোনিয়াল দাসত্ব আর বুর্জোয়া ব্যবস্থার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক লিগ্যাসি।

এই লিগ্যাসির প্রকৃতি বুঝতে হলে আমাদের প্রথাগত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে ‘এপিস্টেমোলজিক্যাল’-এর জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা প্রায়ই কলোনিয়ালিজমকে কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের মানদণ্ডে মেপে নিজেদের ঐতিহাসিক দায় সেরে ফেলি। কিন্তু এর চেয়ে সহস্রগুণ বড় ধ্বংসযজ্ঞ যে আমাদের ভাবনার প্রণালীতে, আমাদের ‘হস্তী-মজ্জায়’ বুলডোজার চালিয়েছে, তা অনুভবের প্রজ্ঞা ও সাহসও আমরা হারিয়ে ফেলেছি।

দেখুন, কলোনিয়াল প্রভু সশরীরে চলে গেছে বটে, কিন্তু আমাদের মগজের কোটরে রেখে গেছে তার দাসত্বের গভীর বিষাক্ত শিকড়। সে অতি সন্তর্পনে আমাদের শিখিয়েছে নিজেদের ভাষা, নিজেদের সংস্কৃতি এবং নিজেদের জমিনের দিকে অবজ্ঞা ও সংশয়ের চোখে তাকাতে।

এই আত্ম-অবিশ্বাসের জমিনে, চিন্তার এই সর্বনাশা ও পঙ্গুব্যবস্থার গর্ভ থেকে যে দেশীয় বুর্জোয়া ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির বিকাশ ঘটেছে, তারা মূলত অাত্মপরিচয়হীন পরজীবী পরগাছা। এদের নিজস্ব কোনো বৌদ্ধিক আলো নেই, নেই কোনো মৌলিক চিন্তার সক্ষমতা। কলোনিয়াল শিক্ষার জাঁতাকল এদের কেবল করজোড়ে অনুকরণ করতে শিখিয়েছে, উদ্ভাবন করতে নয়। তারা ধার করা পশ্চিমা তাত্ত্বিক বুলি আউড়ে নিজেদের ‘আধুনিক’, ‘প্রগতিশীল’ বা ‘মুক্তমনা’ প্রমাণের এক মর্মান্তিক, সস্তা ও ব্যর্থ কসরত করে যাচ্ছে মাত্র। ফলে, চিন্তার জগৎ হয়ে পড়েছে চরম পরনির্ভরশীল।

এই পরনির্ভরশীলতারই একটা ভয়াবহ দিক আছে। একটি সমাজ যখন তার ঐতিহ্যের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তার অনিবার্য পরিণতি ঘটে আত্মিক শূন্যতায় ও কপটতায়। এই শূন্যতার চোরাবালিতে ভণ্ডামির পচন সহজেই ডালপালা মেলে।

যখন এই অভ্যন্তরীণ ফাঁপা রূপটা আর কোনোভাবেই প্রগতি বা আধুনিকতার বাহারি মলাটে লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না, তখনই নিজেদের নৈতিক দেউলিয়াত্ব ঢাকতে পুঁজিপতিরা নতুন চাল চালে। বুর্জোয়া শ্রেণি তার নিজস্ব টিকি বাঁচানোর তাগিদে বাজারে ছুড়ে দেয় তখন মেকি ধার্মিকতা ও সস্তা সাধুত্বের এক তীব্র প্রতিযোগিতামূলক সামাজিক তামাশা।

আমাদের বুঝতে হবে, বর্তমান পুঁজিতান্ত্রিক বাজারে সাধুতা আর নৈতিকতা কোনো অন্তরে আলো ফেলার পরম সাধনা নয়। এই যে, আজ চারপাশে ‘ভালো মানুষ’ সাজার যে তীব্র হিড়িক আমরা লক্ষ করছি, তা কোনো রূহানি জাগরণের বহিঃপ্রকাশ নয়। একে পরমার্থিক ভাব মনে করলে, কর্পোরেট পুঁজির তৈরি গোলকধাঁধায় খেই হারাতে হবে। কারণ, নৈতিকতা কোনো পরিধেয় বস্ত্র বা লেবাস নয় যে, সকাল-বিকাল তার ইস্ত্রি করা জৌলুস ও চাকচিক্য দেখিয়ে হাটে-বাজারে বা নাগরিক মজলিশে বুর্জোয়া হাততালি কুড়াতে হবে।

সমাজ আজ এমন এক চোরাবালিতে আটকে গেছে, যেখানে ধার্মিকতার লেবাসধারী মানুষের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, অথচ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ ও সংবেদনশীলতা কর্পূরের মতো উবে গেছে। বুর্জোয়া ব্যবস্থা এই মেকি সাধুত্বকে একধরণের সামাজিক লাইসেন্স বা পাসপোর্ট হিসেবে ব্যবহার করে, যার আড়ালে চাপা পড়ে যায় পুঁজিপতি শ্রেণির চরম লুণ্ঠন, লিপ্সা, রাহাজানি আর মানবিক অবক্ষয়।

বর্তমানে কে কার চেয়ে কত বড় সাধু, কে কত বেশি খাঁটি; তার এই নোংরা ও প্রতিযোগিতামূলক কোন্দল মূলত একধরণের মনস্তাত্ত্বিক প্রলেপ। এটি এক গভীর ভণ্ডামি, যা মানুষের আসল বিপ্লবী চেতনা ও শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে রাখার আফিম হিসেবে কাজ করে। ।

এই আফিমের ঘোর থেকে বাঁচতে হলে, আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের মূল ধারণোগুলোকে আবার নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। বিশেষ করে, এই প্রেক্ষাপটে ‘মুক্তবুদ্ধি’ ধারণাটিকেও নতুন করে যাচাই করা জরুরি। আমাদের দ্ব্যর্থহীনভাবে বুঝতে হবে, আজকে আমরা মুক্তবুদ্ধি বলতে যে ধার করা পশ্চিমা তত্ত্ব আওড়ানো বুঝি, তা চরম বিভ্রান্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব ছাড়া কিছুই না। প্রকৃত মুক্তবুদ্ধি হলো নিজের জমিনে পা রেখে, নিজের মাটির গন্ধ শুঁকে, নিজের মানুষের ভাষায় সত্যকে উচ্চারণ করার আদিম সাহস।

কলোনিয়াল ও বুর্জোয়া লিগ্যাসি সবচেয়ে বড় শত্রুতাটা করে খোদ এই সাহসের সাথে। সে এমন এক জাঁতাকল কায়েম করে, যা কোনো মৌলিক ভাবুককে সহ্য করতে পারে না। এই বাস্তবতাই আমাদের সামনে এক কঠিন ঐতিহাসিক দায় উপস্থিত করে। যে-ই এই ব্যবস্থার মেকি মুখোশটা টেনে খুলে দিতে চায়, সমাজ তার সর্বশক্তি দিয়ে তাকে স্তব্ধ করে দেয়।

শৃঙ্খলিত এই চিন্তাকাঠামো ভাঙার লোক নেই বলেই আজ আমাদের প্রাজ্ঞ মানুষদের আকাল চলছে। আর ঠিক এই কারণেই, নতুন কোনো ভাবুক, নতুন কোনো দার্শনিক, কিংবা কোনো প্রকৃত দ্রষ্টা এই জমিনে আর পয়দা হচ্ছে না।

তবে এই জড়ত্বই আমাদের শেষ নিয়তি হতে পারে না, এই নিথরতার দেয়াল ভাঙার তাগিদ আজ আমাদের নিজেদের ভেতর থেকেই আসতে হবে। অতএব, এই আত্মিক বন্দিদশা ও মগজ-তাড়িত দাসত্ব থেকে মুক্তির কোনো তৈরি ফর্মুলা বা ধার করা পশ্চিমা প্রেসক্রিপশন আমাদের উদ্ধার করতে পারবে না।

তাই আমাদের প্রথম ও প্রধান ঐতিহাসিক কাজ হলো, এই কলোনিয়াল ও বুর্জোয়া মনস্তত্ত্বের বিরুদ্ধে এক আপসহীন, দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক লড়াই শুরু করা। আমাদের সজ্ঞান ও সগৌরবে ফিরে যেতে হবে নিজেদের জমিনে, খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষের লৌকিক ভাব-ভাষার গভীরে। তা না হলে, ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া ছাড়া এই মেরুদণ্ডহীন পঙ্গু সমাজের আর কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না।

এই বিষয়ের ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সাংবাদিকের তথ্য জানুন

🎉 Shapno24 প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী 🎉

আগামী ৩১ জুলাই www.shapno24.com এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হবে।

🎊 শুভেচ্ছা কার্ড তৈরি করুন 🎊

নিজের নাম দিয়ে আকর্ষণীয় Greeting Card তৈরি করুন।

Greeting Card তৈরি করুন

“মানুষ উৎপাদনের খরা, শিকড় বিচ্ছিন্নতার চোরাবালি ও আত্মিক পচন” মানুষ উৎপাদনের খরা: শিকড় বিচ্ছিন্নতার চোরাবালি ও আত্মিক পচন – লিখেছেন প্রবন্ধটি -সৈয়দ হৃদয়

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:২০:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
৩৭৩

মানুষ উৎপাদনের খরা: শিকড় বিচ্ছিন্নতার চোরাবালি ও আত্মিক পচন
-সৈয়দ হৃদয়

একটি সমাজ যখন তার চিন্তার পরিমণ্ডলে ও সংস্কৃতির অস্থি-মজ্জায় পচতে শুরু করে, তার পয়লা আলামত হলো, সে নিজের জমিনে প্রকৃত মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন, আত্মিক আলোয় বলীয়ান মানুষ উৎপাদনের জৈবনিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। একটা সময়ে গিয়ে এই উৎপাদন প্রক্রিয়াটাই সে সমূলে বন্ধ করে দেয়।

এই বন্ধ্যাত্বই সমাজকে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করায়। জমিনে উৎপাদনে খরা নামলে মানুষ না খেয়ে মরে, কিন্তু মানুষের উৎপাদনে খরা নামলে গোটা সমাজটাই একটা জ্যান্ত লাশ হয়ে টিকে থাকে। আমাদের বর্তমান দশা অবিকল এই লাশের মতো। বাইরে শোরগোল আছে, বুর্জোয়া বাজারের চাকচিক্য আর করপোরেট জৌলুসের কমতি নাই; কিন্তু ভেতরে কোনো আধ্যাত্মিক স্পন্দন নাই।

এই যে মানুষ পয়দা করার কারখানাটা সমূলে বন্ধ হয়ে যাওয়া, এই আত্মিক পচনটা কোনো হুট করে ধেয়ে আসা প্রাকৃতিক সুনামি নয়। এর পেছনে অতি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে কলোনিয়াল দাসত্ব আর বুর্জোয়া ব্যবস্থার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক লিগ্যাসি।

এই লিগ্যাসির প্রকৃতি বুঝতে হলে আমাদের প্রথাগত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে ‘এপিস্টেমোলজিক্যাল’-এর জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা প্রায়ই কলোনিয়ালিজমকে কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের মানদণ্ডে মেপে নিজেদের ঐতিহাসিক দায় সেরে ফেলি। কিন্তু এর চেয়ে সহস্রগুণ বড় ধ্বংসযজ্ঞ যে আমাদের ভাবনার প্রণালীতে, আমাদের ‘হস্তী-মজ্জায়’ বুলডোজার চালিয়েছে, তা অনুভবের প্রজ্ঞা ও সাহসও আমরা হারিয়ে ফেলেছি।

দেখুন, কলোনিয়াল প্রভু সশরীরে চলে গেছে বটে, কিন্তু আমাদের মগজের কোটরে রেখে গেছে তার দাসত্বের গভীর বিষাক্ত শিকড়। সে অতি সন্তর্পনে আমাদের শিখিয়েছে নিজেদের ভাষা, নিজেদের সংস্কৃতি এবং নিজেদের জমিনের দিকে অবজ্ঞা ও সংশয়ের চোখে তাকাতে।

এই আত্ম-অবিশ্বাসের জমিনে, চিন্তার এই সর্বনাশা ও পঙ্গুব্যবস্থার গর্ভ থেকে যে দেশীয় বুর্জোয়া ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির বিকাশ ঘটেছে, তারা মূলত অাত্মপরিচয়হীন পরজীবী পরগাছা। এদের নিজস্ব কোনো বৌদ্ধিক আলো নেই, নেই কোনো মৌলিক চিন্তার সক্ষমতা। কলোনিয়াল শিক্ষার জাঁতাকল এদের কেবল করজোড়ে অনুকরণ করতে শিখিয়েছে, উদ্ভাবন করতে নয়। তারা ধার করা পশ্চিমা তাত্ত্বিক বুলি আউড়ে নিজেদের ‘আধুনিক’, ‘প্রগতিশীল’ বা ‘মুক্তমনা’ প্রমাণের এক মর্মান্তিক, সস্তা ও ব্যর্থ কসরত করে যাচ্ছে মাত্র। ফলে, চিন্তার জগৎ হয়ে পড়েছে চরম পরনির্ভরশীল।

এই পরনির্ভরশীলতারই একটা ভয়াবহ দিক আছে। একটি সমাজ যখন তার ঐতিহ্যের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তার অনিবার্য পরিণতি ঘটে আত্মিক শূন্যতায় ও কপটতায়। এই শূন্যতার চোরাবালিতে ভণ্ডামির পচন সহজেই ডালপালা মেলে।

যখন এই অভ্যন্তরীণ ফাঁপা রূপটা আর কোনোভাবেই প্রগতি বা আধুনিকতার বাহারি মলাটে লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না, তখনই নিজেদের নৈতিক দেউলিয়াত্ব ঢাকতে পুঁজিপতিরা নতুন চাল চালে। বুর্জোয়া শ্রেণি তার নিজস্ব টিকি বাঁচানোর তাগিদে বাজারে ছুড়ে দেয় তখন মেকি ধার্মিকতা ও সস্তা সাধুত্বের এক তীব্র প্রতিযোগিতামূলক সামাজিক তামাশা।

আমাদের বুঝতে হবে, বর্তমান পুঁজিতান্ত্রিক বাজারে সাধুতা আর নৈতিকতা কোনো অন্তরে আলো ফেলার পরম সাধনা নয়। এই যে, আজ চারপাশে ‘ভালো মানুষ’ সাজার যে তীব্র হিড়িক আমরা লক্ষ করছি, তা কোনো রূহানি জাগরণের বহিঃপ্রকাশ নয়। একে পরমার্থিক ভাব মনে করলে, কর্পোরেট পুঁজির তৈরি গোলকধাঁধায় খেই হারাতে হবে। কারণ, নৈতিকতা কোনো পরিধেয় বস্ত্র বা লেবাস নয় যে, সকাল-বিকাল তার ইস্ত্রি করা জৌলুস ও চাকচিক্য দেখিয়ে হাটে-বাজারে বা নাগরিক মজলিশে বুর্জোয়া হাততালি কুড়াতে হবে।

সমাজ আজ এমন এক চোরাবালিতে আটকে গেছে, যেখানে ধার্মিকতার লেবাসধারী মানুষের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, অথচ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ ও সংবেদনশীলতা কর্পূরের মতো উবে গেছে। বুর্জোয়া ব্যবস্থা এই মেকি সাধুত্বকে একধরণের সামাজিক লাইসেন্স বা পাসপোর্ট হিসেবে ব্যবহার করে, যার আড়ালে চাপা পড়ে যায় পুঁজিপতি শ্রেণির চরম লুণ্ঠন, লিপ্সা, রাহাজানি আর মানবিক অবক্ষয়।

বর্তমানে কে কার চেয়ে কত বড় সাধু, কে কত বেশি খাঁটি; তার এই নোংরা ও প্রতিযোগিতামূলক কোন্দল মূলত একধরণের মনস্তাত্ত্বিক প্রলেপ। এটি এক গভীর ভণ্ডামি, যা মানুষের আসল বিপ্লবী চেতনা ও শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে রাখার আফিম হিসেবে কাজ করে। ।

এই আফিমের ঘোর থেকে বাঁচতে হলে, আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের মূল ধারণোগুলোকে আবার নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। বিশেষ করে, এই প্রেক্ষাপটে ‘মুক্তবুদ্ধি’ ধারণাটিকেও নতুন করে যাচাই করা জরুরি। আমাদের দ্ব্যর্থহীনভাবে বুঝতে হবে, আজকে আমরা মুক্তবুদ্ধি বলতে যে ধার করা পশ্চিমা তত্ত্ব আওড়ানো বুঝি, তা চরম বিভ্রান্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব ছাড়া কিছুই না। প্রকৃত মুক্তবুদ্ধি হলো নিজের জমিনে পা রেখে, নিজের মাটির গন্ধ শুঁকে, নিজের মানুষের ভাষায় সত্যকে উচ্চারণ করার আদিম সাহস।

কলোনিয়াল ও বুর্জোয়া লিগ্যাসি সবচেয়ে বড় শত্রুতাটা করে খোদ এই সাহসের সাথে। সে এমন এক জাঁতাকল কায়েম করে, যা কোনো মৌলিক ভাবুককে সহ্য করতে পারে না। এই বাস্তবতাই আমাদের সামনে এক কঠিন ঐতিহাসিক দায় উপস্থিত করে। যে-ই এই ব্যবস্থার মেকি মুখোশটা টেনে খুলে দিতে চায়, সমাজ তার সর্বশক্তি দিয়ে তাকে স্তব্ধ করে দেয়।

শৃঙ্খলিত এই চিন্তাকাঠামো ভাঙার লোক নেই বলেই আজ আমাদের প্রাজ্ঞ মানুষদের আকাল চলছে। আর ঠিক এই কারণেই, নতুন কোনো ভাবুক, নতুন কোনো দার্শনিক, কিংবা কোনো প্রকৃত দ্রষ্টা এই জমিনে আর পয়দা হচ্ছে না।

তবে এই জড়ত্বই আমাদের শেষ নিয়তি হতে পারে না, এই নিথরতার দেয়াল ভাঙার তাগিদ আজ আমাদের নিজেদের ভেতর থেকেই আসতে হবে। অতএব, এই আত্মিক বন্দিদশা ও মগজ-তাড়িত দাসত্ব থেকে মুক্তির কোনো তৈরি ফর্মুলা বা ধার করা পশ্চিমা প্রেসক্রিপশন আমাদের উদ্ধার করতে পারবে না।

তাই আমাদের প্রথম ও প্রধান ঐতিহাসিক কাজ হলো, এই কলোনিয়াল ও বুর্জোয়া মনস্তত্ত্বের বিরুদ্ধে এক আপসহীন, দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক লড়াই শুরু করা। আমাদের সজ্ঞান ও সগৌরবে ফিরে যেতে হবে নিজেদের জমিনে, খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষের লৌকিক ভাব-ভাষার গভীরে। তা না হলে, ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া ছাড়া এই মেরুদণ্ডহীন পঙ্গু সমাজের আর কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না।