আমাদের ই-পেপার পড়তে ভিজিট করুন
ই-পেপার 📄
০৬:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেঘনার বাঁশি থেকে চন্দ্রনাথের চূড়া 🖊️ মুহাম্মদ কাউছার আলম রবি

  • Reporter Name
  • প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
  • ৯৪ পড়া হয়েছে
১১৯

মেঘনার বাঁশি থেকে চন্দ্রনাথের চূড়া
🖊️ মুহাম্মদ কাউছার আলম রবি

​পৃথিবীর সমস্ত হিসেবি মানুষ যখন শুক্রবারের অলস সকালে ঘুম ভাঙার প্রতীক্ষায়, আমরা তখন হাজীগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে ট্রেনের হুইসেলের অপেক্ষা করছি। হঠাৎ করেই মনের ভেতর উঁকি দিয়েছিল আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টিকে দেখার তীব্র ব্যাকুলতা। যেই কথা, সেই কাজ! গন্তব্য ঠিক হলো চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চন্দ্রনাথ পাহাড় ও গহীন অরণ্যের সুপ্তধারা ঝর্ণা। ১৯ শে জুনের সেই সকালটা আমাদের পাঁচ সহকর্মীর জীবনে যে এভাবে রোমাঞ্চ আর স্মৃতির পসরা সাজিয়ে বসবে, তা কে জানত!

​আমাদের দলে ছিলেন অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে চলা শ্রদ্ধেয় তাহের সাহেব, আড্ডার প্রাণ হাস্যরসিক মোর্শেদ সাহেব, নতুন চাকুরিপ্রাপ্ত এবং দলের একমাত্র ‘খাঁটি অবিবাহিত’ তানিম সাহেব, আর সদ্য বিবাহিত, লাজুক ও সদা হাস্যোজ্জ্বল তাফসির আহমেদ সাহেব। আর সাথে ছিলাম আমি, প্রকৃতির রূপসুধা পানের এক ব্যাকুল যাত্রী।

​সকালের ‘মেঘনা এক্সপ্রেস’ যখন হাজীগঞ্জ স্টেশন ছাড়ল, আমাদের আনন্দের পারদ তখন তুঙ্গে। ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই চোখ জুড়িয়ে গেল রেললাইনের দুপাশে সবুজ ফসলি জমি, ছোট ছোট বসতি আর সারি সারি খেজুরগাছে ঝুলে থাকা পাকা থোকা থোকা খেজুর। ট্রেনের ভেতরের পরিবেশটা আরও চমৎকার হয়ে উঠল যখন খাবার গাড়িতে হাশেম চাচার আন্তরিক আপ্যায়নে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিলাম।

​চলন্ত ট্রেনেই জমে উঠল লুডু খেলা আর আড্ডা। এই আড্ডার মাঝেই সবার নজর কাড়লেন আমাদের সদ্য বিবাহিত তাফসির সাহেব। একটু পর পর পকেট থেকে ফোন বের করে নববধূর সাথে ভাব বিনিময়! আহ, তাঁর সেই লাজুক মুখচ্ছবি আর অনাবিল হাসি দেখে তানিম সাহেব ফোড়ন কাটলেন, “ভাই, বিয়ে তো করলেন, আমাদের এভাবে ঈর্ষায় না পোড়ালে হতো না?” তাফসির সাহেবের লাজুকতা যেন ট্রেনের কামরায় এক টুকরো রোমান্টিকতার হাওয়া বইয়ে দিল। এর মাঝেই চলতে ফিরতে আমাদের স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পর্বটাও বেশ জমজমাটভাবে সম্পন্ন হলো।

​সীতাকুণ্ডে নেমে যখন চন্দ্রনাথের পাদদেশে পৌঁছালাম, তখন চারপাশের অগণিত পর্যটকের ভিড় আর আকাশচুম্বী পাহাড় দেখে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, আমরা প্রায় ১২০০ ফুট উপরের পাহাড়ি পথ সফর করতে শুরু করলাম! চারপাশের ঘন বৃক্ষরাজি, বুনো ফুল, বিলাতি গাব আর লেবু গাছের সুবাসে চারপাশটা ছিল মায়াবী। পথের ক্লান্তি দূর করতে আমরা কখনো পাহাড়ি আনারস খেলাম, আবার কখনো চুমুক দিলাম ঠাণ্ডা লেবুর শরবতে। গাছের ডালে ডালে বানরের দলের লাফালাফি আমাদের পাহাড়ি পথচলাকে আরও আনন্দময় করে তুলছিল। তাফসির সাহেব তাঁর ক্যামেরার পারদর্শিতা দিয়ে এই সব সুন্দর মুহূর্ত ফ্রেমবন্দী করতে লাগলেন।

​কিন্তু চ্যালেঞ্জটা শুরু হলো পাহাড়ের চূড়া থেকে নামার সময়। কিছু কিছু জায়গায় খাড়া সিঁড়িগুলো এতই বিপজ্জনক ছিল যে, উপর থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে বুকটা ধক করে উঠল। একপর্যায়ে আমাদের মনেও কিছুটা ভয়ের সঞ্চার হয়েছিল। ঠিক তখনই আমাদের অনুপ্রাণিত করল আশেপাশের কিছু প্রবীণ মানুষ আর শিশুরা। মনে মনে ভাবলাম, ষাট-সত্তর বছরের এই বুড়ো-বুড়ি ও ছোট শিশুরা যদি হাসিমুখে এই পথ পাড়ি দিতে পারে, তবে আমরা কেন পারব না? ইনশাআল্লাহ, আমরাও পারব।”

​সেদিন পাহাড় থেকে এক পরম শিক্ষা পেলাম। এই বিশাল আকৃতি নিয়ে পাহাড় যেন আমাদের বিনয়ী ও মহৎ হওয়ার শিক্ষা দেয়। পাহাড় আমাদের কানে কানে বলে গেল “হারার আগেই হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। জীবনে সফল হতে হলে সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে পরিশ্রমী হতে হবে, নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করতে হবে।”

​পাহাড়ের শিক্ষা বুকে নিয়ে আমরা যখন ‘সুপ্তধারা ঝর্ণা’র দিকে এগোলাম, তখন চারপাশের নীরবতা ভেঙে ঝর্ণার পতনের শব্দ আমাদের সম্মোহিত করল। ঝর্ণার অবিরাম ধারায় নেমে আসা হিমশীতল পানিতে যখন আমরা গা ভেজালাম, তখন পাহাড় ভাঙার সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল।

​ঝর্ণার পাড়েই ঘটল এক মজাদার ঘটনা। আমাদের নতুন চাকরি পাওয়া অবিবাহিত তানিম সাহেবকে হুট করেই ঘিরে ধরল একদল ললনা (নারী পর্যটক)! হয়তো তাঁর সুদর্শন অবয়ব কিংবা ছন্নছাড়া চটপটে স্বভাব তাঁদের আকর্ষণ করেছিল। তানিম সাহেবের সেই অপ্রস্তুত অথচ আনন্দিত অবস্থা দেখে মোর্শেদ সাহেব ফোড়ন কাটলেন, “তানিম, চাকরি তো পেয়েছ, এবার ঝর্ণার জলেই বিয়ের সানাইটা বাজিয়ে নাও!” আমাদের যৌবনে উদ্দীপ্ত রসিকতা আর প্রাণচঞ্চল হাসিতে তখন সুপ্তধারার চারপাশ মুখরিত।

​ফিরতি ট্রেনের জন্য আমরা যখন কুমিরা রেলওয়ে স্টেশনে এসে পৌঁছালাম, তখন জানতে পারলাম ট্রেন আসতে কিছুটা দেরি হবে। স্টেশনে তখন চিরচেনা ব্যস্ততা খেটে খাওয়া মানুষের প্রাণপণ বেঁচে থাকার লড়াই, হকারদের চড়া গলার হাঁকডাক, আর ট্রেন দেরিতে আসায় যাত্রীদের চোখে-মুখে বিরক্তি।
​স্টেশনের এক কোণে স্বামীহারা মেহেরুন জীবনসংগ্রাম যখন আমাদের ভাবিয়ে তুলছিল, ঠিক তখনই কুমিরা প্লাটফর্মে আমাদের দেখা হলো ‘যৌবনপোড়া’ মেহেরুনের সাথে। মেহেরুন, যার দেহ অবয়বে এখনো রূপ-যৌবনের পূর্ণ আভা, চোখে এক অদ্ভুত মায়া, অথচ কপালে বিধাতার নিষ্ঠুর পরিহাস। স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর সমস্ত পরিবার-পরিজনের দায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে। চাকরি আর সংসার দুটোই একা হাতে সামলে নিচ্ছেন অসামান্য কর্মতৎপরতায়।

​কুমিরা স্টেশনের প্লাটুনে বসে মেহেরুন আপা যখন তাঁর আবেগময় স্মৃতিচারণ করছিলেন, তাঁর সেই নিদারুণ মিষ্টি হাসি আর পাগল করা কথামালায় মোর্শেদ সাহেব, তাফসির সাহেব এবং তাহের সাহেব যেন পুরো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলেন। জীবনের এত বড় ট্র্যাজেডি বুকে নিয়েও তাঁর এই প্রাণশক্তি, জীবনের প্রতি এই দায়বদ্ধতা আমাদের থমকে দিল। তাঁর কথাগুলো যেন একাধারে রোমান্টিক বিষাদ ও এক লড়াকু নারীর মহাকাব্য।

​কুমিরা স্টেশনে অপেক্ষার সেই প্রহরে আমাদের পরিচয় হলো এক টিভি সাংবাদিকের সাথে। তাঁর সাথে ট্রেন, রাজনীতি আর মেহেরুন আপার জীবনযুদ্ধ নিয়ে চলল দীর্ঘ আলাপ। চললো লুডু খেলা, গল্প কথন, ফেলে আসা সময়ের স্মৃতিচারণ। জীবন কত বৈচিত্র্যময়, একেক জনের কাছে একেক রকম। ফেরা হবে অন্য কোন গল্পে, অন্য কোন শহর কিংবা মফস্বলে।

উৎসর্গঃ
প্রিয় সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের।

এই বিষয়ের ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সাংবাদিকের তথ্য জানুন

🎉 Shapno24 প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী 🎉

আগামী ৩১ জুলাই www.shapno24.com এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হবে।

🎊 শুভেচ্ছা কার্ড তৈরি করুন 🎊

নিজের নাম দিয়ে আকর্ষণীয় Greeting Card তৈরি করুন।

Greeting Card তৈরি করুন

মেঘনার বাঁশি থেকে চন্দ্রনাথের চূড়া 🖊️ মুহাম্মদ কাউছার আলম রবি

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
১১৯

মেঘনার বাঁশি থেকে চন্দ্রনাথের চূড়া
🖊️ মুহাম্মদ কাউছার আলম রবি

​পৃথিবীর সমস্ত হিসেবি মানুষ যখন শুক্রবারের অলস সকালে ঘুম ভাঙার প্রতীক্ষায়, আমরা তখন হাজীগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে ট্রেনের হুইসেলের অপেক্ষা করছি। হঠাৎ করেই মনের ভেতর উঁকি দিয়েছিল আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টিকে দেখার তীব্র ব্যাকুলতা। যেই কথা, সেই কাজ! গন্তব্য ঠিক হলো চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চন্দ্রনাথ পাহাড় ও গহীন অরণ্যের সুপ্তধারা ঝর্ণা। ১৯ শে জুনের সেই সকালটা আমাদের পাঁচ সহকর্মীর জীবনে যে এভাবে রোমাঞ্চ আর স্মৃতির পসরা সাজিয়ে বসবে, তা কে জানত!

​আমাদের দলে ছিলেন অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে চলা শ্রদ্ধেয় তাহের সাহেব, আড্ডার প্রাণ হাস্যরসিক মোর্শেদ সাহেব, নতুন চাকুরিপ্রাপ্ত এবং দলের একমাত্র ‘খাঁটি অবিবাহিত’ তানিম সাহেব, আর সদ্য বিবাহিত, লাজুক ও সদা হাস্যোজ্জ্বল তাফসির আহমেদ সাহেব। আর সাথে ছিলাম আমি, প্রকৃতির রূপসুধা পানের এক ব্যাকুল যাত্রী।

​সকালের ‘মেঘনা এক্সপ্রেস’ যখন হাজীগঞ্জ স্টেশন ছাড়ল, আমাদের আনন্দের পারদ তখন তুঙ্গে। ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই চোখ জুড়িয়ে গেল রেললাইনের দুপাশে সবুজ ফসলি জমি, ছোট ছোট বসতি আর সারি সারি খেজুরগাছে ঝুলে থাকা পাকা থোকা থোকা খেজুর। ট্রেনের ভেতরের পরিবেশটা আরও চমৎকার হয়ে উঠল যখন খাবার গাড়িতে হাশেম চাচার আন্তরিক আপ্যায়নে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিলাম।

​চলন্ত ট্রেনেই জমে উঠল লুডু খেলা আর আড্ডা। এই আড্ডার মাঝেই সবার নজর কাড়লেন আমাদের সদ্য বিবাহিত তাফসির সাহেব। একটু পর পর পকেট থেকে ফোন বের করে নববধূর সাথে ভাব বিনিময়! আহ, তাঁর সেই লাজুক মুখচ্ছবি আর অনাবিল হাসি দেখে তানিম সাহেব ফোড়ন কাটলেন, “ভাই, বিয়ে তো করলেন, আমাদের এভাবে ঈর্ষায় না পোড়ালে হতো না?” তাফসির সাহেবের লাজুকতা যেন ট্রেনের কামরায় এক টুকরো রোমান্টিকতার হাওয়া বইয়ে দিল। এর মাঝেই চলতে ফিরতে আমাদের স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পর্বটাও বেশ জমজমাটভাবে সম্পন্ন হলো।

​সীতাকুণ্ডে নেমে যখন চন্দ্রনাথের পাদদেশে পৌঁছালাম, তখন চারপাশের অগণিত পর্যটকের ভিড় আর আকাশচুম্বী পাহাড় দেখে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, আমরা প্রায় ১২০০ ফুট উপরের পাহাড়ি পথ সফর করতে শুরু করলাম! চারপাশের ঘন বৃক্ষরাজি, বুনো ফুল, বিলাতি গাব আর লেবু গাছের সুবাসে চারপাশটা ছিল মায়াবী। পথের ক্লান্তি দূর করতে আমরা কখনো পাহাড়ি আনারস খেলাম, আবার কখনো চুমুক দিলাম ঠাণ্ডা লেবুর শরবতে। গাছের ডালে ডালে বানরের দলের লাফালাফি আমাদের পাহাড়ি পথচলাকে আরও আনন্দময় করে তুলছিল। তাফসির সাহেব তাঁর ক্যামেরার পারদর্শিতা দিয়ে এই সব সুন্দর মুহূর্ত ফ্রেমবন্দী করতে লাগলেন।

​কিন্তু চ্যালেঞ্জটা শুরু হলো পাহাড়ের চূড়া থেকে নামার সময়। কিছু কিছু জায়গায় খাড়া সিঁড়িগুলো এতই বিপজ্জনক ছিল যে, উপর থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে বুকটা ধক করে উঠল। একপর্যায়ে আমাদের মনেও কিছুটা ভয়ের সঞ্চার হয়েছিল। ঠিক তখনই আমাদের অনুপ্রাণিত করল আশেপাশের কিছু প্রবীণ মানুষ আর শিশুরা। মনে মনে ভাবলাম, ষাট-সত্তর বছরের এই বুড়ো-বুড়ি ও ছোট শিশুরা যদি হাসিমুখে এই পথ পাড়ি দিতে পারে, তবে আমরা কেন পারব না? ইনশাআল্লাহ, আমরাও পারব।”

​সেদিন পাহাড় থেকে এক পরম শিক্ষা পেলাম। এই বিশাল আকৃতি নিয়ে পাহাড় যেন আমাদের বিনয়ী ও মহৎ হওয়ার শিক্ষা দেয়। পাহাড় আমাদের কানে কানে বলে গেল “হারার আগেই হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। জীবনে সফল হতে হলে সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে পরিশ্রমী হতে হবে, নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করতে হবে।”

​পাহাড়ের শিক্ষা বুকে নিয়ে আমরা যখন ‘সুপ্তধারা ঝর্ণা’র দিকে এগোলাম, তখন চারপাশের নীরবতা ভেঙে ঝর্ণার পতনের শব্দ আমাদের সম্মোহিত করল। ঝর্ণার অবিরাম ধারায় নেমে আসা হিমশীতল পানিতে যখন আমরা গা ভেজালাম, তখন পাহাড় ভাঙার সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল।

​ঝর্ণার পাড়েই ঘটল এক মজাদার ঘটনা। আমাদের নতুন চাকরি পাওয়া অবিবাহিত তানিম সাহেবকে হুট করেই ঘিরে ধরল একদল ললনা (নারী পর্যটক)! হয়তো তাঁর সুদর্শন অবয়ব কিংবা ছন্নছাড়া চটপটে স্বভাব তাঁদের আকর্ষণ করেছিল। তানিম সাহেবের সেই অপ্রস্তুত অথচ আনন্দিত অবস্থা দেখে মোর্শেদ সাহেব ফোড়ন কাটলেন, “তানিম, চাকরি তো পেয়েছ, এবার ঝর্ণার জলেই বিয়ের সানাইটা বাজিয়ে নাও!” আমাদের যৌবনে উদ্দীপ্ত রসিকতা আর প্রাণচঞ্চল হাসিতে তখন সুপ্তধারার চারপাশ মুখরিত।

​ফিরতি ট্রেনের জন্য আমরা যখন কুমিরা রেলওয়ে স্টেশনে এসে পৌঁছালাম, তখন জানতে পারলাম ট্রেন আসতে কিছুটা দেরি হবে। স্টেশনে তখন চিরচেনা ব্যস্ততা খেটে খাওয়া মানুষের প্রাণপণ বেঁচে থাকার লড়াই, হকারদের চড়া গলার হাঁকডাক, আর ট্রেন দেরিতে আসায় যাত্রীদের চোখে-মুখে বিরক্তি।
​স্টেশনের এক কোণে স্বামীহারা মেহেরুন জীবনসংগ্রাম যখন আমাদের ভাবিয়ে তুলছিল, ঠিক তখনই কুমিরা প্লাটফর্মে আমাদের দেখা হলো ‘যৌবনপোড়া’ মেহেরুনের সাথে। মেহেরুন, যার দেহ অবয়বে এখনো রূপ-যৌবনের পূর্ণ আভা, চোখে এক অদ্ভুত মায়া, অথচ কপালে বিধাতার নিষ্ঠুর পরিহাস। স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর সমস্ত পরিবার-পরিজনের দায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে। চাকরি আর সংসার দুটোই একা হাতে সামলে নিচ্ছেন অসামান্য কর্মতৎপরতায়।

​কুমিরা স্টেশনের প্লাটুনে বসে মেহেরুন আপা যখন তাঁর আবেগময় স্মৃতিচারণ করছিলেন, তাঁর সেই নিদারুণ মিষ্টি হাসি আর পাগল করা কথামালায় মোর্শেদ সাহেব, তাফসির সাহেব এবং তাহের সাহেব যেন পুরো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলেন। জীবনের এত বড় ট্র্যাজেডি বুকে নিয়েও তাঁর এই প্রাণশক্তি, জীবনের প্রতি এই দায়বদ্ধতা আমাদের থমকে দিল। তাঁর কথাগুলো যেন একাধারে রোমান্টিক বিষাদ ও এক লড়াকু নারীর মহাকাব্য।

​কুমিরা স্টেশনে অপেক্ষার সেই প্রহরে আমাদের পরিচয় হলো এক টিভি সাংবাদিকের সাথে। তাঁর সাথে ট্রেন, রাজনীতি আর মেহেরুন আপার জীবনযুদ্ধ নিয়ে চলল দীর্ঘ আলাপ। চললো লুডু খেলা, গল্প কথন, ফেলে আসা সময়ের স্মৃতিচারণ। জীবন কত বৈচিত্র্যময়, একেক জনের কাছে একেক রকম। ফেরা হবে অন্য কোন গল্পে, অন্য কোন শহর কিংবা মফস্বলে।

উৎসর্গঃ
প্রিয় সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের।