
শান্তিনগর ছিল এক অজপাড়া গ্রাম। চারদিকে ধানের মাঠ, বাঁশঝাড় আর খাল-বিল মিলে যেন প্রকৃতির আঁকিবুকি। গ্রামের ভোর শুরু হতো মোরগের ডাক আর শিশিরভেজা ঘাসে হাঁটার শব্দে। সেই গ্রামেই জন্মেছিল রুবেল। বাবা ছিলেন ছোট্ট চায়ের দোকানের মালিক, মা সংসারের কাজ আর খেতখামারে সাহায্য করতেন। অভাব ছিল প্রতিদিনের সঙ্গী, কিন্তু রুবেলের চোখে সবসময় স্বপ্নের আলো ঝলমল করত।
ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিল। স্কুল শেষে সে বই নিয়ে বসে যেত, অন্যরা মাঠে খেললেও সে স্বপ্ন দেখত , একদিন সে গ্রামকে বদলে দেবে। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখল পাশের বাড়ির আমেনা খালা ধান কাটতে কাটতে ক্লান্ত হয়ে বসে আছেন। রুবেল ব্যাগ ফেলে দিয়ে দৌড়ে গেলো, হাতে ধান কাটতে শুরু করলো। বৃদ্ধা অবাক হয়ে বললেন,
“বাবা, মানুষ বড় হয় শুধু শহরে গিয়ে নয়, ভালোবাসা আর পরিশ্রম দিয়েই মানুষের হৃদয় জয় করতে হয়।”
এই কথা রুবেলের মনে অমর হয়ে রইলো।
সময় গড়াল। এসএসসি পাশ করে রুবেল শহরে পড়তে গেলো। শহরের জীবন তার জন্য সহজ ছিল না। টাকা কম, খাওয়া কম, ঘুম কম— তবুও সে হাল ছাড়ল না। মেসে থাকতো, টিউশনি করতো, আর রাতভর পড়াশোনা চালিয়ে যেতো। অনেকে উপহাস করে বলতো,
“গ্রামের ছেলে, শহরে এসে কতটুকুই বা পারবে?”
কিন্তু রুবেল মনে মনে জানতো, অধ্যবসায়ই তাকে এগিয়ে নেবে।
বছরের পর বছর সংগ্রামের পর সে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ফল করলো। পরে সরকারি চাকরিও পেল। সবাই ভেবেছিল, সে আর গ্রামে ফিরবে না। কিন্তু রুবেল সবার ধারণা ভুল প্রমাণ করলো।
চাকরি পেয়ে প্রথমেই সে গ্রামে ফিরে এলো। সবাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“এত কষ্ট করে শহরে জায়গা করলে, আবার কেন গ্রামে ফিরলি?”
রুবেল হেসে বলল,
“আমার স্বপ্ন শুধু নিজের জন্য নয়, এই গ্রামের প্রতিটি শিশুর জন্য।”
সে গ্রামের মাঝখানে একটা স্কুল বানানো শুরু করলো। অনেক বাধা এল, টাকা কম, জমি নেই, আবার কিছু লোক হাসাহাসি করলো। কিন্তু রুবেলের একাগ্রতায় শেষমেশ স্কুল দাঁড়িয়ে গেল। নাম রাখা হলো, শেষ আলো বিদ্যালয়।
দিন যায়, বছর যায়। সেই স্কুল থেকেই গ্রামের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে শহরে গিয়ে বড় বড় জায়গায় কাজ করতে শুরু করলো। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ শিক্ষক হয়ে ফিরে এলো। কিন্তু তারা সবাই বলতো,
“আমাদের জীবনে প্রথম আলো জ্বালিয়েছিল রুবেল ভাই।”
একদিন বিকেলে সূর্য ডোবার আগে রুবেল স্কুলের বারান্দায় বসে ছিল। সেই সময় আমেনা খালা এসে বললেন,
“দেখিস রে বাবা, তুই শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণ করোনি, সবার স্বপ্নও পূরণ করেছিস। তুই ঠিকই বড় হয়েছিস, কিন্তু নিজের গ্রামকেও বড় করে তুলেছিস।”
রুবেল আকাশের দিকে তাকাল। সূর্য ডুবে যাচ্ছে, কিন্তু শেষ আলো এখনো চারপাশে ছড়িয়ে আছে। তার মনে হলো, জীবনের আসল জয় মানে নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্য কিছু করে যাওয়া।
Reporter Name 

















