আমাদের ই-পেপার পড়তে ভিজিট করুন
ই-পেপার 📄
ঢাকা ০৫:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

“আলো নামার রাত….” গল্পটি লিখেছেন মোঃ হাছিবুর রহমান হাছিব

  • Reporter Name
  • প্রকাশিত হয়েছে: ১০:০৬:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৭১ পড়া হয়েছে

{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":[],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":false,"containsFTESticker":false}

৯২

 

গ্রামের নামটা খুব কম লোকই মনে রাখে। সবাই একে বলে মজিদ বাড়ী গ্ৰাম। কেন বলে, সেটার কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। তবে বয়স্করা বলেন—এই পাড়ায়

এমন কিছু রাত আসে, যেদিন আকাশের দরজাগুলো নাকি খুলে যায়।

শবেবরাত তেমনই এক রাত।

মাগরিবের পর থেকেই বাতাসটা কেমন বদলে গিয়েছিল। শীতের হালকা কাঁপুনি, ভেজা মাটির গন্ধ আর নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে ভেসে আসা কোরআন তিলাওয়াত—

সব মিলিয়ে মনটা অজান্তেই থমকে যাচ্ছিল। হাফিজ হাঁটছিল, হঠাৎ থেমে গেল। কেন থামল, সে নিজেও ঠিক জানে না। শুধু মনে হলো, আজ শব্দগুলো কানে ঢুকেই

শেষ হচ্ছে না।

হাফিজের বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। শহরে চাকরি করে, মাস শেষে বাড়িতে টাকা পাঠায়। বাইরের হিসাবে সে দায়িত্বশীলই। কিন্তু নিজের ভেতরের হিসাব সে কখনো

ঠিকমতো মিলিয়ে দেখেনি। নামাজ-রোজা আছে, অভ্যাসের মতো। অনেক সময় নিজের কাছেই সে নিজের দায় এড়িয়ে গেছে।

আজ সে বাড়ি এসেছে বাবার কবর জিয়ারত করতে।

কবরস্থানে ঢুকেই চোখে পড়ল একটা ছোট প্রদীপ। কে জ্বালিয়েছে, জানা নেই। আলোটা খুব উজ্জ্বল নয়, আবার নিভেও যায়নি। হাফিজের বুকের ভেতর কেমন একটা

মোচড় খেলল। বাবার কথাই মনে পড়ে গেল—কম কথা বলতেন, কিন্তু উপস্থিতিটা ছিল ভারী।

সে কবরের পাশে বসে পড়ল। হঠাৎ বাবার শেষ দিনের কথাগুলো মনে ভেসে উঠল—

“ভুল করলে মানুষ হও, ক্ষমা চাইতে শেখো। আল্লাহর দরজা কখনো বন্ধ হয় না।”

তখন কথাগুলো সে এড়িয়ে গিয়েছিল।

আজ আর পারল না।

চোখ বন্ধ করতেই নিজের জীবনের অনেক অস্বস্তিকর দৃশ্য ভেসে উঠল। মায়ের সঙ্গে অহেতুক বিরক্তি, ছোট ভাইয়ের চুপচাপ কষ্ট, কারও সাফল্য সহ্য করতে না পারা,

আবার কারও ব্যথায় নির্বিকার থাকা। ভাবতেই বুকটা ভারী হয়ে এল।

চোখের পানি ধরে রাখা গেল না।

এই কান্না কাউকে দেখানোর জন্য নয়। এই কান্না নিজের কাছে হেরে যাওয়ার।

খুব নিচু গলায় সে বলল,

“হে আল্লাহ, আমি জানতাম—তবু অনেক ভুল করেছি। আজ আমি ক্ষমা চাই।”

পূর্ণিমার চাঁদ তখন আকাশে স্থির। আলোটা কবরস্থানের ওপর পড়ে থাকলেও মনে হচ্ছিল, সেটা যেন মানুষের ভেতরেও ঢুকে পড়ছে। শবেবরাতের মাহাত্ম্য ঠিক

এখানেই—এই রাতে মানুষ নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহস পায়।

ফেরার পথে হাফিজের চোখ পড়ল রহিমা খালার দিকে। বৃদ্ধা নারীটি একা বসে আছেন। ছেলেমেয়েরা কেউ পাশে নেই, স্বামীও বহু বছর আগে চলে গেছেন। হাফিজ

একটু থামল। থামবে কি না, এই দ্বিধাটুকুও তার কাছে নতুন।

“খালা, কিছু লাগবে?”—বলেই ফেলল সে।

রহিমা খালার চোখে মুহূর্তের বিস্ময়, তারপর হালকা হাসি।

“দোয়া করিস বাবা। আর কিছু না।”

হাফিজ মাথা নত করল। সেই মুহূর্তে তার মনে হলো—ইবাদত বোধ হয় এখানেই এসে মিলে যায়, মানুষের মুখোমুখি দাঁড়ানোর জায়গায়।

 

রাতে মসজিদ ভরে উঠল। কেউ কাঁদছে, কেউ চুপচাপ বসে আছে। হাফিজ সিজদায় মাথা রাখল। অনেক দিন পর মনে হলো, বুকের ভেতরের চাপটা একটু কমেছে।

এই রাত তাকে নতুন কিছু শেখাল না, বরং ভুলে যাওয়া কথাগুলো মনে করিয়ে দিল— ক্ষমা চাইলে মানুষ ছোট হয় না।

তওবা মানে শুধু বলা নয়, দিক বদলানো।

আত্মশুদ্ধি মানে নিজেকে ছাড় দেওয়া নয়, ঠিক করা।

ফজরের আজান ভেসে এলে সে উঠে দাঁড়াল। আকাশ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে আসছে। রাত শেষ হচ্ছে, কিন্তু ভেতরের অন্ধকারটা আর আগের মতো নেই।

সে জানে, এক রাতেই সব ঠিক হয়ে যায় না। তবু এই রাত পথ দেখায়—কোথায় যেতে হবে।

মজিদ বাড়ী গ্ৰামের মানুষ বলে, শবেবরাতে আকাশের দরজা খুলে যায়।

হাফিজের মনে হলো,

আসল দরজাটা খুলে যায় মানুষের হৃদয়ের ভেতরেই।

Facebook Comments Box
এই বিষয়ের ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সাংবাদিকের তথ্য জানুন

“আলো নামার রাত….” গল্পটি লিখেছেন মোঃ হাছিবুর রহমান হাছিব

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:০৬:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
৯২

 

গ্রামের নামটা খুব কম লোকই মনে রাখে। সবাই একে বলে মজিদ বাড়ী গ্ৰাম। কেন বলে, সেটার কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। তবে বয়স্করা বলেন—এই পাড়ায়

এমন কিছু রাত আসে, যেদিন আকাশের দরজাগুলো নাকি খুলে যায়।

শবেবরাত তেমনই এক রাত।

মাগরিবের পর থেকেই বাতাসটা কেমন বদলে গিয়েছিল। শীতের হালকা কাঁপুনি, ভেজা মাটির গন্ধ আর নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে ভেসে আসা কোরআন তিলাওয়াত—

সব মিলিয়ে মনটা অজান্তেই থমকে যাচ্ছিল। হাফিজ হাঁটছিল, হঠাৎ থেমে গেল। কেন থামল, সে নিজেও ঠিক জানে না। শুধু মনে হলো, আজ শব্দগুলো কানে ঢুকেই

শেষ হচ্ছে না।

হাফিজের বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। শহরে চাকরি করে, মাস শেষে বাড়িতে টাকা পাঠায়। বাইরের হিসাবে সে দায়িত্বশীলই। কিন্তু নিজের ভেতরের হিসাব সে কখনো

ঠিকমতো মিলিয়ে দেখেনি। নামাজ-রোজা আছে, অভ্যাসের মতো। অনেক সময় নিজের কাছেই সে নিজের দায় এড়িয়ে গেছে।

আজ সে বাড়ি এসেছে বাবার কবর জিয়ারত করতে।

কবরস্থানে ঢুকেই চোখে পড়ল একটা ছোট প্রদীপ। কে জ্বালিয়েছে, জানা নেই। আলোটা খুব উজ্জ্বল নয়, আবার নিভেও যায়নি। হাফিজের বুকের ভেতর কেমন একটা

মোচড় খেলল। বাবার কথাই মনে পড়ে গেল—কম কথা বলতেন, কিন্তু উপস্থিতিটা ছিল ভারী।

সে কবরের পাশে বসে পড়ল। হঠাৎ বাবার শেষ দিনের কথাগুলো মনে ভেসে উঠল—

“ভুল করলে মানুষ হও, ক্ষমা চাইতে শেখো। আল্লাহর দরজা কখনো বন্ধ হয় না।”

তখন কথাগুলো সে এড়িয়ে গিয়েছিল।

আজ আর পারল না।

চোখ বন্ধ করতেই নিজের জীবনের অনেক অস্বস্তিকর দৃশ্য ভেসে উঠল। মায়ের সঙ্গে অহেতুক বিরক্তি, ছোট ভাইয়ের চুপচাপ কষ্ট, কারও সাফল্য সহ্য করতে না পারা,

আবার কারও ব্যথায় নির্বিকার থাকা। ভাবতেই বুকটা ভারী হয়ে এল।

চোখের পানি ধরে রাখা গেল না।

এই কান্না কাউকে দেখানোর জন্য নয়। এই কান্না নিজের কাছে হেরে যাওয়ার।

খুব নিচু গলায় সে বলল,

“হে আল্লাহ, আমি জানতাম—তবু অনেক ভুল করেছি। আজ আমি ক্ষমা চাই।”

পূর্ণিমার চাঁদ তখন আকাশে স্থির। আলোটা কবরস্থানের ওপর পড়ে থাকলেও মনে হচ্ছিল, সেটা যেন মানুষের ভেতরেও ঢুকে পড়ছে। শবেবরাতের মাহাত্ম্য ঠিক

এখানেই—এই রাতে মানুষ নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহস পায়।

ফেরার পথে হাফিজের চোখ পড়ল রহিমা খালার দিকে। বৃদ্ধা নারীটি একা বসে আছেন। ছেলেমেয়েরা কেউ পাশে নেই, স্বামীও বহু বছর আগে চলে গেছেন। হাফিজ

একটু থামল। থামবে কি না, এই দ্বিধাটুকুও তার কাছে নতুন।

“খালা, কিছু লাগবে?”—বলেই ফেলল সে।

রহিমা খালার চোখে মুহূর্তের বিস্ময়, তারপর হালকা হাসি।

“দোয়া করিস বাবা। আর কিছু না।”

হাফিজ মাথা নত করল। সেই মুহূর্তে তার মনে হলো—ইবাদত বোধ হয় এখানেই এসে মিলে যায়, মানুষের মুখোমুখি দাঁড়ানোর জায়গায়।

 

রাতে মসজিদ ভরে উঠল। কেউ কাঁদছে, কেউ চুপচাপ বসে আছে। হাফিজ সিজদায় মাথা রাখল। অনেক দিন পর মনে হলো, বুকের ভেতরের চাপটা একটু কমেছে।

এই রাত তাকে নতুন কিছু শেখাল না, বরং ভুলে যাওয়া কথাগুলো মনে করিয়ে দিল— ক্ষমা চাইলে মানুষ ছোট হয় না।

তওবা মানে শুধু বলা নয়, দিক বদলানো।

আত্মশুদ্ধি মানে নিজেকে ছাড় দেওয়া নয়, ঠিক করা।

ফজরের আজান ভেসে এলে সে উঠে দাঁড়াল। আকাশ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে আসছে। রাত শেষ হচ্ছে, কিন্তু ভেতরের অন্ধকারটা আর আগের মতো নেই।

সে জানে, এক রাতেই সব ঠিক হয়ে যায় না। তবু এই রাত পথ দেখায়—কোথায় যেতে হবে।

মজিদ বাড়ী গ্ৰামের মানুষ বলে, শবেবরাতে আকাশের দরজা খুলে যায়।

হাফিজের মনে হলো,

আসল দরজাটা খুলে যায় মানুষের হৃদয়ের ভেতরেই।

Facebook Comments Box