
সংসার জীবনে ডিভোর্স:
সমস্যা, সমাধান এবং ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বপ্ন সাহিত্য পরিষদের বিশেষ প্রতিবেদন
সংসার জীবন শুধুই রূপকথার গল্প নয়। এটি বাস্তবতার এক দীর্ঘ পরীক্ষা, যেখানে ভালোবাসার পাশাপাশি প্রয়োজন দায়িত্ব, ধৈর্য, ত্যাগ এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজকের সমাজে বহু সংসার ছোটখাটো সমস্যার কারণে ভাঙছে। আর এই পরিস্থিতিতে ডিভোর্স শব্দটি ক্রমশ বেশি আলোচিত হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, ডিভোর্স কি সত্যিই সমস্যার সমাধান, নাকি সম্পর্ক থেকে পালানোর সহজ পথ?
সংসার ভাঙার প্রধান কারণ
দাম্পত্য জীবনে সমস্যা একদিনে তৈরি হয় না। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। সাধারণ কারণগুলো হলো—
- অর্থনৈতিক চাপ ও কর্মব্যস্ততা
- সময় কম থাকা এবং একে অপরের প্রতি অবহেলা
- পারিবারিক হস্তক্ষেপ
- অহংকার ও পারস্পরিক অসম্মান
- সন্দেহ ও অবিশ্বাস
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব
সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দেয় যখন কথা বলার জায়গা বন্ধ হয়। বোঝাপড়ার বদলে অভিযোগ জমে, আর সমাধানের পথে চলা কমে। ফলশ্রুতিতে সম্পর্ক ভাঙার ঝুঁকি বাড়ে।
ডিভোর্স: প্রয়োজন নাকি শেষ আশ্রয়?
বাস্তবতা হলো—কিছু পরিস্থিতিতে ডিভোর্স অপরিহার্য।
যেমন—শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, চরম অবহেলা, নিরাপত্তাহীন জীবন অথবা দীর্ঘদিনের বিশ্বাসঘাতকতা।
কিন্তু ইসলাম ডিভোর্সকে প্রথম পছন্দ হিসেবে দেখতে বলেনি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল কাজ হলো তালাক।”
(সুনানে আবু দাউদ)
অর্থাৎ, ডিভোর্স বৈধ হলেও এটি আল্লাহর কাছে প্রিয় নয়। ইসলাম ধৈর্য, বোঝাপড়া ও সমাধানের চেষ্টাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
ইসলামের নির্দেশনায় সমস্যার সমাধান
ডিভোর্সের আগে ইসলাম কিছু ধাপ অনুসরণের পরামর্শ দেয়,
১. খোলামেলা আলোচনা ও পারস্পরিক সম্মান
কুরআনে বলা হয়েছে,
“তোমরা তাদের সঙ্গে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করো।”
(সূরা নিসা: ১৯)
২. ধৈর্য ও সাময়িক দূরত্ব
রাগের মাথায় নয়, শান্ত অবস্থায় সমাধানের চেষ্টা করুন।
৩. পারিবারিক সালিশ ও মধ্যস্থতা
কুরআন নির্দেশ দেয়,
“যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে একজন সালিশ নিযুক্ত করো স্বামীর পক্ষ থেকে এবং একজন স্ত্রীর পক্ষ থেকে।”
(সূরা নিসা: ৩৫)
৪. শেষ উপায় হিসেবে তালাক
সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে সম্মান, ন্যায় এবং মানবিকতা বজায় রেখে আলাদা হওয়া যায়। ইসলাম নির্দেশ দেয়,
- তাড়াহুড়ো নয়
- রাগের মাথায় নয়
- নারীর অধিকার এবং ইদ্দতের বিধান মেনে চলা
- সন্তানের দায়িত্ব নিশ্চিত করা
- ডিভোর্সের সামাজিক ও মানসিক প্রভাব
ডিভোর্স কেবল স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ নয়। এটি একটি পরিবারের ভাঙন। প্রভাব পড়ে,
- সন্তানদের মানসিক নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসে
- পারিবারিক বন্ধনে
- সামাজিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক আস্থায়
বিশেষ করে সন্তানরা এই বিচ্ছেদের মানসিক ক্ষত দীর্ঘদিন বহন করে, যা তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক ও জীবনেও প্রভাব ফেলে।
বাস্তবসম্মত ও ইসলামসম্মত করণীয়
সংসার টিকিয়ে রাখতে যা জরুরি,
- একে অপরকে সময় ও গুরুত্ব দেওয়া
- দায়িত্ব এড়িয়ে না যাওয়া
- অহংকার নয়, সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া
- আল্লাহর কাছে দোয়া ও তাওয়াক্কুল
- প্রয়োজনে আলেম বা পেশাদার কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া
এই ছোট অথচ আন্তরিক উদ্যোগগুলোই অনেক সংসারকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
উপসংহার
ডিভোর্স কোনো সহজ সমাধান নয়; এটি একটি কঠিন বাস্তবতা এবং শেষ আশ্রয়। ইসলাম কোনো সম্পর্ক ভাঙার দিকে উৎসাহ দেয় না, বরং ধৈর্য, বোঝাপড়া ও ন্যায়ের পথ অনুসরণ করতে বলে।
সমস্যা থাকবেই, কিন্তু সেই সমস্যার মধ্যে দিয়েই সম্পর্ককে বাঁচানোর চেষ্টা করাই মানবিক ও ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বোত্তম সমাধান।
কারণ—
সংসার ভাঙা সহজ,
কিন্তু ধৈর্য ধরে বাঁচিয়ে রাখা
আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।প্রকাশনায়
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বপ্ন সাহিত্য পরিষদ
(একটি অরাজনৈতিক, স্বেচ্ছাসেবী ও সাহিত্যভিত্তিক সংগঠন)
Reporter Name 

















