
*খালেদা জিয়া: পরিচ্ছন্ন রাজনীতির জননী*
জনি সিদ্দিক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়া একজন অবিস্মরণীয় সত্তা। তাঁর রাজনৈতিক জীবন কেবল রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং তা ত্যাগ, দেশপ্রেম এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের গল্প। ১৯৮১ সালে এক মর্মান্তিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হারানোর পর তিনি যখন রাজনীতির অঙ্গনে পা রাখেন, তখন তাঁর সামনে ছিল কণ্টকাকীর্ণ পথ। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজপথের ‘দেশনেত্রী’ হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি যে দৃঢ়তা ও সততার পরিচয় দিয়েছেন, তা তাঁকে এ দেশের রাজনীতিতে ‘পরিচ্ছন্ন রাজনীতির জননী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থানের মূল ভিত্তি ছিল নয় বছরের দীর্ঘ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি যেভাবে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা সমকালীন ইতিহাসে বিরল। সেই দীর্ঘ সময়ে তাঁকে বহুবার কারারুদ্ধ ও গৃহবন্দী করা হয়েছে, টোপ দেওয়া হয়েছে ক্ষমতার। কিন্তু তিনি আপস করেননি। তাঁর এই ‘আপসহীন’ অবস্থানই বাংলাদেশের মানুষের মনে এক বিশাল আস্থার জায়গা তৈরি করে দেয়। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তাঁর আপসহীন সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয়ে এ দেশে স্বৈরাচারের পতন ঘটে এবং রুদ্ধ হওয়া গণতন্ত্রের দ্বার পুনরায় উন্মোচিত হয়।
১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তন করার এক বৈপ্লবিক উদ্যোগ নেন। তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য ছিল সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রপতির শাসন ব্যবস্থা বিলোপ করে সকল ক্ষমতা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত করেন। এই একক সিদ্ধান্তটিই তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়, কারণ তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত রূপের চেয়ে গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণকেই শ্রেয় মনে করেছিলেন। তাঁর এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক পরিচ্ছন্ন ও স্বচ্ছ ধারার সূচনা করে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান যুগান্তকারী। তাঁর শাসনকালেই বাংলাদেশে আধুনিক বাজার অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত হয়। ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো ‘মূল্য সংযোজন কর’ বা ভ্যাট প্রবর্তন ছিল একটি সাহসী ও দূরদর্শী অর্থনৈতিক পদক্ষেপ। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে উজ্জ্বল অবদান ছিল শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে। মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা এবং উপবৃত্তি কর্মসূচি চালুর ফলে বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হারে এক বিস্ময়কর পরিবর্তন আসে। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা এবং ‘খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা’ কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় শিক্ষার আলো পৌঁছে দেন।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রশাসনিক সততা এবং এতিমদের অধিকার রক্ষায় তাঁর কঠোর অবস্থানের একটি উদাহরণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ তখন সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে এতিমখানাগুলোর তদারকি করতেন। একদিন একটি এতিমখানায় আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে তিনি দেখেন, বাচ্চাদের খাবারের তালিকায় থাকা ইলিশ মাছের বদলে পচা সিলভার কার্প রান্না করা হচ্ছে। মন্ত্রী যখন সেই অসাধু পরিচালককে শোকজ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান, তখন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময়কর। শোকজের কথা শুনে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, “এতিমের খাবার নিয়ে যে এরকম করে, তাকে আবার শোকজ কী! আপনি রাস্তায় থাকার সময়ই আমি তার বহিষ্কার আদেশ রেডি করিয়েছি।” এতিমের অধিকার রক্ষায় তাঁর এই বজ্রকঠিন অবস্থান প্রমাণ করে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কতটা আপসহীন ছিলেন।
কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! যে নেত্রী এতিমের মুখে ভালো খাবার তুলে দিতে নিজের দলের পরিচয়ধারী ব্যক্তির বিরুদ্ধেও তাৎক্ষণিক বহিষ্কার আদেশ ও আইনানুগ ব্যবস্থার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁকে শেষ জীবনে এসে তথাকথিত ‘এতিমের মাল আত্মসাতের’ এক বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় বছরের পর বছর নির্জন কারাবাস ভোগ করতে হয়েছে। কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এই মিথ্যা মামলায় তাঁকে বন্দি করে রাখা ছিল ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়।
জাতীয়তাবাদ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে তিনি বরাবরই ছিলেন অটল। শহীদ জিয়া প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ দর্শনকে তিনি তাঁর রাজনীতির মূলমন্ত্র হিসেবে ধারণ করেছিলেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ছিল সবসময়ই দেশের স্বার্থকে কেন্দ্রে রেখে। যমুনা বহুমুখী সেতুর মতো মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করা এবং দেশব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন তাঁর উন্নয়নমুখী রাজনীতির পরিচয় বহন করে। একজন নেত্রীর সার্থকতা কেবল তাঁর শাসনকালেই নয়, বরং তাঁর ত্যাগের গভীরতায় পরিমাপ করা হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা জিয়াকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। ক্ষমতা থেকে দূরে থাকাকালে তাঁকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে, নিজের দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত ঘর ছাড়তে হয়েছে এবং চরম শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন।
বর্তমান সময়ে রাজনীতি যখন নীতি-আদর্শের চেয়ে সুবিধাবাদ ও প্রতিহিংসার ওপর বেশি নির্ভরশীল, তখন বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য এক শিক্ষা। এশিয়ার প্রথম মুসলিম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি’র মতো বৃহৎ দলের ৪১ বছর টানা নেতৃত্বদানকারী এই নেত্রী প্রমাণ করেছেন, জনগণের ভালোবাসা আর নিজের সততা থাকলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মাথা উঁচু করে টিকে থাকা যায়। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর ছোটখাটো ভুল হয়তো থাকতে পারে, কিন্তু দেশপ্রেমে তিনি ছিলেন নিখাদ। তিনি সগৌরবে বলতে পেরেছিলেন, “বাংলাদেশের বাইরে আমার আর কোনো ঠিকানা নেই।” গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং বাংলাদেশের নিজস্ব সত্তা রক্ষার আন্দোলনে তিনি আজীবন এক জননীসম ছায়া হয়ে থাকবেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
MD TANZIMUL 
















