আমাদের ই-পেপার পড়তে ভিজিট করুন
ই-পেপার 📄
ঢাকা ০৫:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

“কুয়াশার ক্যানভাসে পাশ্চাত্য রেখা, বাঙালিত্বের নব্য সংস্কৃতি” ​আব্দুল কাদের

{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":["local"],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{"transform":1},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":true,"containsFTESticker":false}

১২৩

​কুয়াশার ক্যানভাসে পাশ্চাত্য রেখা: বাঙালিত্বের নব্য সংস্কৃতি

​আব্দুল কাদের

​কুয়াশাচ্ছন্ন পৌষের রাত। ঢাকা শহরের রাজপথে এখন ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপের চেয়ে ‘ক্যাপুচিনো’র সূক্ষ্ম ফেনা বেশি দৃশ্যমান। আমাদের ফেলে আসা দিনের সেই ম্লান কিন্তু মধুর স্মৃতিগুলো, যা একদা উঠোনময় লাজুক হাসিতে বিচরণ করত, তা আজ নাগরিক সভ্যতার প্রাবল্যে এক নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে। শীতের রাতে খড়কুটো জ্বালিয়ে উত্তাপ নেওয়ার দিনগুলো এখন ধূসর অতীত; আমরা এখন সেই সুরের অনুগামী হয়েছি, যেখানে দেশীয় শিকড় আর পাশ্চাত্য রুচি মিলেমিশে একাকার।
​রুচির রূপান্তর ও নাগরিক আড্ডা
​আমাদের আড্ডার ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে।

এক সময় যেখানে রাজনীতির উত্তাপ কিংবা কবিতার ছন্দ নিয়ে প্রাণবন্ত বিতর্ক চলত, সেখানে আজ স্থান করে নিয়েছে ‘সফিস্টিকেশন’ বা নাগরিক আভিজাত্য। রুচির এই পরিবর্তনটি বেশ লক্ষণীয়। জীবনপটে শুদ্ধ বোধের প্রদীপ জ্বালানোর চেষ্টা থাকলেও, তার শিখাটি আজ যেন ধার করা সংস্কৃতির আবরণে ঢাকা। আমরা পরিশীলিত হতে চাই ঠিকই, কিন্তু সেই পরিশীলতার মানদণ্ডটি অনেক ক্ষেত্রে বিজাতীয়। তবে ইতিবাচক দিক হলো, এই বিশ্বায়নের ছোঁয়ায় আমাদের মানসিক জড়তা দূর হয়েছে এবং আমরা নিজেদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলছি।

​পাশ্চাত্য সজ্জা ও দেশীয় সত্তার দ্বন্দ্ব
​পোশাক-পরিচ্ছদে পরিবর্তনের হাওয়া এখন প্রবল। শীতের চিরায়ত চাদরের স্থান দখল করে নিয়েছে ওভারকোট কিংবা ব্লেজার; যা এখন আভিজাত্যের প্রতীক। পাশ্চাত্য সজ্জার প্রতি আমাদের যে আকর্ষণ, তার সাথে দেশীয় প্রাণের এক অদৃশ্য টানাপোড়েন বিদ্যমান। সুরুচির প্রকাশ তখনই সার্থক হয়, যখন আধুনিকতার পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব সত্তা ও ঐতিহ্যের নান্দনিক ভারসাম্য বজায় থাকে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক হতে গিয়ে আমরা আমাদের স্বকীয়তাকেই বিসর্জন দিচ্ছি।

​ভাষিক বিচ্যুতি ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা
​সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং কিছুটা পীড়াদায়ক পরিবর্তনটি ঘটেছে আমাদের ভাষা ব্যবহারে। রুচিশীল প্রকাশে আমরা যে শুদ্ধতার প্রত্যাশা করি, প্রাত্যহিক নাগরিক জীবনে তার প্রতিফলন ভিন্ন। বর্তমানের আড্ডায় বাংলা ভাষার সাথে ইংরেজি শব্দের যে সংমিশ্রণ বা ‘ককটেল’ চলছে, তা এক অদ্ভুত ভাষিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। ‘বাংলিশ’ বলাটাই এখন আভিজাত্যের পরিচায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দৃষ্টিভঙ্গির এই বিচ্যুতিকে কৌতুক হিসেবে দেখা যায়, আবার দীর্ঘশ্বাস হিসেবেও গণ্য করা যায়। আমাদের অবহেলায় কি তবে শুদ্ধ বোধের প্রদীপটি ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে?

​আভিজাত্য ও শ্লীলতার সংজ্ঞা
​আভিজাত্য মানেই কি কেবল দামী ব্র্যান্ডের পোশাক আর বিদেশি বুলির অনুকরণ? নতুনের আবাহনে আমাদের মনন অবশ্যই সিক্ত হোক, তবে তার নিয়ন্ত্রণ যেন থাকে কৃষ্টি ও শ্লীলতার হাতে। আমরা পাশ্চাত্যের প্রযুক্তি আর সুযোগ গ্রহণ করব, কিন্তু ত্যাগ করব না আমাদের হাজার বছরের দেশজ সংস্কার। প্রকৃত মানুষ হওয়ার যে চিরন্তন সাধনা, সেখানেই আমাদের প্রকৃত আভিজাত্য নিহিত।

​পৌষের এই কুয়াশা ভেদ করে যখন নতুন রোদ উঠবে, তখন যেন আমরা দেখি., আধুনিকতার সজ্জায় সজ্জিত হয়েও আমরা আমাদের বাঙালিত্বের শিকড়কে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে আছি। নতুনের স্পর্শে মনন উদ্ভাসিত হোক, তবে সেই প্রবাহ যেন আমাদের নিজস্ব সত্তা থেকে বিচ্যুত না করে।

Facebook Comments Box
এই বিষয়ের ট্যাগ:

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সাংবাদিকের তথ্য জানুন

“কুয়াশার ক্যানভাসে পাশ্চাত্য রেখা, বাঙালিত্বের নব্য সংস্কৃতি” ​আব্দুল কাদের

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:৩৩:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬
১২৩

​কুয়াশার ক্যানভাসে পাশ্চাত্য রেখা: বাঙালিত্বের নব্য সংস্কৃতি

​আব্দুল কাদের

​কুয়াশাচ্ছন্ন পৌষের রাত। ঢাকা শহরের রাজপথে এখন ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপের চেয়ে ‘ক্যাপুচিনো’র সূক্ষ্ম ফেনা বেশি দৃশ্যমান। আমাদের ফেলে আসা দিনের সেই ম্লান কিন্তু মধুর স্মৃতিগুলো, যা একদা উঠোনময় লাজুক হাসিতে বিচরণ করত, তা আজ নাগরিক সভ্যতার প্রাবল্যে এক নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে। শীতের রাতে খড়কুটো জ্বালিয়ে উত্তাপ নেওয়ার দিনগুলো এখন ধূসর অতীত; আমরা এখন সেই সুরের অনুগামী হয়েছি, যেখানে দেশীয় শিকড় আর পাশ্চাত্য রুচি মিলেমিশে একাকার।
​রুচির রূপান্তর ও নাগরিক আড্ডা
​আমাদের আড্ডার ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে।

এক সময় যেখানে রাজনীতির উত্তাপ কিংবা কবিতার ছন্দ নিয়ে প্রাণবন্ত বিতর্ক চলত, সেখানে আজ স্থান করে নিয়েছে ‘সফিস্টিকেশন’ বা নাগরিক আভিজাত্য। রুচির এই পরিবর্তনটি বেশ লক্ষণীয়। জীবনপটে শুদ্ধ বোধের প্রদীপ জ্বালানোর চেষ্টা থাকলেও, তার শিখাটি আজ যেন ধার করা সংস্কৃতির আবরণে ঢাকা। আমরা পরিশীলিত হতে চাই ঠিকই, কিন্তু সেই পরিশীলতার মানদণ্ডটি অনেক ক্ষেত্রে বিজাতীয়। তবে ইতিবাচক দিক হলো, এই বিশ্বায়নের ছোঁয়ায় আমাদের মানসিক জড়তা দূর হয়েছে এবং আমরা নিজেদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলছি।

​পাশ্চাত্য সজ্জা ও দেশীয় সত্তার দ্বন্দ্ব
​পোশাক-পরিচ্ছদে পরিবর্তনের হাওয়া এখন প্রবল। শীতের চিরায়ত চাদরের স্থান দখল করে নিয়েছে ওভারকোট কিংবা ব্লেজার; যা এখন আভিজাত্যের প্রতীক। পাশ্চাত্য সজ্জার প্রতি আমাদের যে আকর্ষণ, তার সাথে দেশীয় প্রাণের এক অদৃশ্য টানাপোড়েন বিদ্যমান। সুরুচির প্রকাশ তখনই সার্থক হয়, যখন আধুনিকতার পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব সত্তা ও ঐতিহ্যের নান্দনিক ভারসাম্য বজায় থাকে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক হতে গিয়ে আমরা আমাদের স্বকীয়তাকেই বিসর্জন দিচ্ছি।

​ভাষিক বিচ্যুতি ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা
​সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং কিছুটা পীড়াদায়ক পরিবর্তনটি ঘটেছে আমাদের ভাষা ব্যবহারে। রুচিশীল প্রকাশে আমরা যে শুদ্ধতার প্রত্যাশা করি, প্রাত্যহিক নাগরিক জীবনে তার প্রতিফলন ভিন্ন। বর্তমানের আড্ডায় বাংলা ভাষার সাথে ইংরেজি শব্দের যে সংমিশ্রণ বা ‘ককটেল’ চলছে, তা এক অদ্ভুত ভাষিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। ‘বাংলিশ’ বলাটাই এখন আভিজাত্যের পরিচায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দৃষ্টিভঙ্গির এই বিচ্যুতিকে কৌতুক হিসেবে দেখা যায়, আবার দীর্ঘশ্বাস হিসেবেও গণ্য করা যায়। আমাদের অবহেলায় কি তবে শুদ্ধ বোধের প্রদীপটি ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে?

​আভিজাত্য ও শ্লীলতার সংজ্ঞা
​আভিজাত্য মানেই কি কেবল দামী ব্র্যান্ডের পোশাক আর বিদেশি বুলির অনুকরণ? নতুনের আবাহনে আমাদের মনন অবশ্যই সিক্ত হোক, তবে তার নিয়ন্ত্রণ যেন থাকে কৃষ্টি ও শ্লীলতার হাতে। আমরা পাশ্চাত্যের প্রযুক্তি আর সুযোগ গ্রহণ করব, কিন্তু ত্যাগ করব না আমাদের হাজার বছরের দেশজ সংস্কার। প্রকৃত মানুষ হওয়ার যে চিরন্তন সাধনা, সেখানেই আমাদের প্রকৃত আভিজাত্য নিহিত।

​পৌষের এই কুয়াশা ভেদ করে যখন নতুন রোদ উঠবে, তখন যেন আমরা দেখি., আধুনিকতার সজ্জায় সজ্জিত হয়েও আমরা আমাদের বাঙালিত্বের শিকড়কে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে আছি। নতুনের স্পর্শে মনন উদ্ভাসিত হোক, তবে সেই প্রবাহ যেন আমাদের নিজস্ব সত্তা থেকে বিচ্যুত না করে।

Facebook Comments Box