//√√| পাতালের গল্প

বনের ভেতর একদিন দশটি পাতা একসাথে দাঁড়িয়ে ছিল…..
নিম পাতা, আলো পাতা, খেজুর পাতা, ম্যাপের পাতা,বড়ই পাতা, তেজপাতা, বিচুটি পাতা, কচুপাতা, করোলা পাতা, আর অ্যালোভেরা পাতা।
দশ জন মানুষের মতোই তারা দশটি চরিত্র। দশ রকম স্বভাব, ১০ রকম আলাদা পৃথিবী।
—–নিম পাতা ছিল তাদের মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত। তার বাইরে থেকে সবকিছু হাসিখুশি থাকলেও,তার হাসির গভীরে লুকিয়ে থাকে এক গভীরতা, এক শূন্যতা।কেউ বোঝেনা সে হাসে বেশি কারণ তার ভেতরতা খুব বেশি নীরব।
—–এই দলে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিল আলোপাতা। তার হাসি এমন যে, তাকালেই সকাল মনে হয় । সে এতটাই হাসিখুশি,এতটাই প্রাণবন্ত,যে অন্যরা তার আশেপাশে থাকলেই মন ভালো হয়ে যায়।সবাই তাকে একটু বেশিই পছন্দ করে। কারণ সে যেখানে থাকে সেখানেই আলো জন্মায়। অন্ধকারের জায়গা থাকে না বিন্দুমাত্র।
—–খেজুর পাতা ছিল চুপচাপ, শান্ত স্বভাবের।তার কথা কম, তবে মাঝে মাঝে দুষ্টামি করত। কিন্তু তার উপস্থিতি ছিল ঠিক নদীর ঘুমন্ত ভাটার মত। নরম, নিশ্চিত, বিশ্বাসযোগ্য। সে কারো সাথে তর্কে যায় না। সবাই তাকে খুব ভালোবাসে। আর সত্যি বলতে সে তেমনি। সাদামাটা, শান্ত, কিন্তু নিঃশব্দে ভালো।
—–ম্যাপেল পাতা ছিল দলের সবচেয়ে রঙিন। তার হাসির রং অন্যদের চেয়ে উজ্জ্বল। সে সবার সাথে মিশে যায় চোখের পলকে। নতুন বন্ধু বানানো তার কাছে যেন শরতের বাতাসে রং ঝরার মত সহজ। তার গল্পে ছিল প্রাণ। তার ভাবনাতে ও ছিল ছায়া – সূর্যের খেলা।
—–দলের আরেক পাশে দাঁড়িয়ে আছে বড়ই পাতা। শান্ত, মিষ্টি, নরম। তার মুখে সব সময় এমন একটা হাসি থাকে, যা দেখে মনে হয় কোন ঝড় তাকে কখনোই ভাঙতে পারবে না। সে বেশি কথা বলে না। কিন্তু তার কথায় মিষ্টি একটা স্নিগ্ধতা থাকে। যা অন্যদের মন কোমল করে দিতে বাধ্য।
—–তেজপাতা ছিল সবচেয়ে ঝলমলে। সে কথায় কথায় ভন্ডামি করে। মিথ্যে সিরিয়াস হওয়ার অভিনয় করে। তার ভন্ডামি, দুষ্টামি গুলো কিছুটা খেজুর পাতার মত। বাইরে হাসি-ঠাট্টা,ভেতরে ভালোবাসা জমা। তারা স্বভাব দেখে সবাই হেসে ফেলে। কিন্তু সবাই জানে তার মনের গভীরতা কতটা স্বচ্ছ।
—– বিছুটি পাতাকে সবাই একটু ভয় পায়। কারণ একটু গম্ভীর সে।কিন্তু যারা সত্যিই তার সাথে সময় কাটায় তারা বোঝে। এই পাতার ভেতর লুকানো আছে কাব্যের নদী। তার ভেতরের মানুষটা নরম আর অনুভূতি প্রবণ। আসলে সে গল্পের মত। বাইরে বিবর্ণ, ভিতরে আলো।
—–কচু পাতা ছিল দলের সবচেয়ে দুষ্টু। সব সময় দুলে দুলে দুষ্টামি করে। হাসাহাসি, মজা কিন্তু দরকারে সেই সবার আগে হাজির।তার ভালবাসা ছিল দুষ্টামির ভেতরে মোরা, যেন এক পাগলাটে,চঞ্চল, কিন্তু সত্যিকারের ভালো বন্ধু।
—–করলা পাতার মুখে ছিল কঠিনতা। তার কথাতে তো তবে সোজা সাপ্টা। প্রথম দেখায় মনে হবে, এপাতা বোধহয় শক্ত, সবচেয়ে কঠিন।কিন্তু ধীরে ধীরে তার ভেতরটা খুলতে থাকলে বোঝা যায়।এই তেতো স্বভাবের নিচে লুকিয়ে আছে নরম গল্প।
—–সবার শেষে অ্যালোভেরা পাতা।দলটার নিরাময়কারী।কারো মন খারাপ হলে সে পাশে দাঁড়িয়ে যেত। তার স্পর্শে কষ্ট কমে যেত। তার নরম স্বভাব ছিল। একটা শীতল ছায়ার মত। যে তাকে চেনে, জানে এ পাতার ভালবাসা কখনো শেষ হয় না।

এইভাবে দশ পাতা মিলে দাঁড়িয়ে থাকে। হাসি, গল্প , দুষ্টামি, শান্তি, তেতো, সত্য সবকিছু নিয়ে একটি অদ্ভুত বন্ধুময় সম্পর্ক। তাদের মধ্যে কেউ গভীর, কেউ মিষ্টি, কেউ দুষ্টু, কেউবা কাব্যিক। কিন্তু সব পাতাই আপন আলোয় আলাদা।

তবুও যদি জিজ্ঞেস করা হয় —
সব পাতার মাঝে কোনটা সবচেয়ে উজ্জ্বল? তাহলে উত্তর একটাই,” আলোপাতা “।
কারণ, আলো সব সময় সবার জীবন বদলায়। সবার মনে জ্বালায় আলো এবং সবার গল্পকে করে আরো সুন্দর।

——নাদিরা আক্তার