আমি এক অদ্ভুত জগতে বাস করি — এই জগৎটা কেবল আমার কল্পনার ভেতর। এই কল্পনার জগৎটা আমার নিজ হাতে তৈরি করা। আমার মাথার ভেতর সবসময় একরাশ কোলাহল—কখনো মনে হয় কিছু ভাবছি, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরেই ভুলে যাই। আমি কী করেছি, কী বলতে চেয়েছিলাম, কেন এমন করছি — সবকিছু যেন মুছে যায় মনের পর্দা থেকে। আমি জানি না কখন থেকে এমন হয়ে গেলাম। এখন আমি কিছুই বুঝি না—কি ভাবতে হবে, কাকে বিশ্বাস করতে হবে, কিংবা আমি আসলে কেমন আছি।

একাকীত্বটা প্রথমে ভালো লাগত — শান্ত, নির্জন, নিজের মতো সময়। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই নিঃসঙ্গতা আমার মধ্যে এমনভাবে ঢুকে পড়ল, যে এখন মনে হয়, আমি যেন ভেতর থেকে ফাঁকা হয়ে গেছি। কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে পারি না, কোনো কথা ঠিকভাবে শেষ করতে পারি না।
অনেক দিন হলো আমি কারো সঙ্গে ঠিকভাবে কথা বলিনি। আমি আমার নিজের দুঃখও ঠিকমতো অনুভব করতে পারি না।

আমি জানি না আমি অসুস্থ কিনা, আবার জানার ইচ্ছেও নেই।
দেহটা চলছে, কিন্তু মনটা যেন অন্য কোনো জগতে আটকে আছে—একটা কল্পনার জগৎ, যেখান থেকে আমি বের হতে পারছি না। আমার মন খারাপ হয়, আঘাত পেয়ে ভেঙ্গে পরি, মাঝে মধ্যে খুব ক্লান্ত মনে হয় কিন্তু কারোর দরজায় যাই না একটু স্বস্তির জন্য। সব কিছু গিলে ফেলি — কথা, কষ্ট, বিষাদ, অপমানগুলোও। কেউ এখন আর আমায় অবহেলা করলে আর কষ্ট পাইনা, নিঃশব্দে গিলে ফেলি হৃদয়ের জিহ্বা দিয়ে। কেউ আমায় নিয়ে কটাক্ষ করলে এখন আর কিছু বলি না, শুধু ভেতর থেকে পুড়ি।

আমি অযোগ্য — সব ক্ষেত্রেই, সবার কাছে। আমার মনে হয় কখনো আমার দ্বারা কিছুই হবে না। সফলতা স্বাদ কেমন আমার জানা নেই। আমার চারপাশে অনেক সফল মানুষ দেখতে পাই কিন্তু নিজেকে এখনো সফল মানুষের তালিকায় ধার করাতে পারিনি। আমি জানি এটা আমার‌ই ব্যর্থতা। নিজেকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নের কাঠগড়ায় ধার করাই!
জীবনের উনিশটা বছর পেরিয়ে ফেলেছি কোনো অর্জন ছাড়াই। জীবনের কোন মুড়ে দাঁড়িয়ে আছি আমার অজানা। অগোছালো জীবনটা কবে, কোথায়, কিভাবে, গুছিয়ে তুলতে পারব কিছুই জানি না।

আমি প্রায়ই ভাবি, এ জীবন ত্যাগ করতে পারলে হয়তো, জীবনের এই বেড়াজাল থেকে মুক্তি হতে পারবো। এই পৃথিবীর প্রতি এক‌ আকাশ সমান ঘৃণা জন্মে গেছে, আমার আর বেঁ/চে থাকতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু পরক্ষণে মনে পড়ে, আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে কি নিয়ে দাঁড়াব? কেননা এই পর্যন্ত আমার রব আমার কৃতকার্যে সন্তুষ্ট নয়! এই ভাবনা গুলো মাথায় আসলে আমি চুপ হয়ে যাই, আমাকে থামিয়ে দেয় এই প্রশ্ন গুলো।

এই সময়‌টা আমার কাছে খুবই বিরক্তিকর, ঘুমে চোখ জ্বলে অথচ ঘুম আসে না। আজ অনেকদিন হয় সকাল দেখিনি, সকালের মিহি রোদ আমার গাঁয়ে পড়ে না— খুব ভোরে পাখিরা আমায় আর ঘুম থেকে তুলে না!

প্রাপ্তির চেয়ে অ- প্রাপ্তি, না- পাওয়া হারিয়ে ফেলার পরিমাণ বারি। পাওয়ার চেয়ে প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়েছি। হারিয়ে ফেলার তালিকায় যেন রোজ কিছু না কিছু যুক্ত হচ্ছে। এই ধরুন, হারাতে হারাতে, হারিয়ে ফেললাম, আমি আমার নিজেকেই।

এই পৃথিবীতে কাল অব্দি থাকতে পারবো কিনা তাঁর-ও নিশ্চয়তা নেই।
কতকাল আয়ু নিয়ে এসেছি, কিছুই জানি না। জন্মানোর মূল উদ্দেশ্য কি? কেন এই পৃথিবীতে এসেছি তা-ও অজানা। নিশ্চয়ই কোনো না কোনো উদ্দেশ্য কিংবা লক্ষ্যে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় আমার জম্ম হয়েছে, রব’ই ভালো জানেন!

আমি যেন শূন্য মেরুর বালুচরে আটকা পরে গেছি, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। কোনো লক্ষ্য নেই, কোনো স্বপ্ন নেই। বেঁচে আছি, কিন্তু জীবিত নই। আমি দৃশ্যের আড়ালে থাকা এক অদৃশ্য মানুষ।

লেখা: অদৃশ্য মানুষ
—বিষাদের কবি✍️