দোআ কবুল হওয়ার নির্দিষ্ট কিছু সময়,ও ফযিলত।

দোআ (দোয়া) শব্দটি আরবি, যার আভিধানিক অর্থ হলো আহ্বান করা বা প্রার্থনা করা। ইসলামে দোআ হলো মহান রাব্বুল আলামীন আল্লাহর প্রতি বান্দার দীনতা, হীনতা ও বিনয় প্রকাশের এক বিশেষ মাধ্যম। এটি ইবাদতের মূল নির্যাস ও মুমিনের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।দোআ করার মাধ্যমেই বান্ধা আল্লাহর কাছ থেকে তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারে।দোআ করার আরো আরো অনেক ফায়দা রয়েছে:

কুরআনে বর্নিত তিনটি ফায়দা

১/আল্লাহ্‌র আদেশ ও কবুলের ওয়াদা

​وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ

​অর্থ: “আর তোমাদের রব (প্রভু) বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব (কবুল করব)।’”​(সূরা গাফির – ৪০: ৬০)

​২. আল্লাহ্‌র নৈকট্য ও সাড়া দেওয়ার নিশ্চয়তা

​وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ

​অর্থ: “আর যখন আমার বান্দারা তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন (তাদেরকে বলো) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে।”

​أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ

​অর্থ: “আহবানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে, আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই।”​(সূরা আল-বাক্বারা – ২: ১৮৬)

​৩. দুর্দশাগ্রস্তের ডাকে সাড়া দানকারী

​أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ

​অর্থ: “বরং তিনিই (আল্লাহ্), যিনি দুর্দশাগ্রস্তের ডাকে সাড়া দেন, যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদ দূর করেন।”(সূরা আন-নামল – ২৭: ৬২)

আয়াতগুলো থেকে প্রমানিত হয় আল্লাহর কাছে দোয়া করলে তিনি ডাকে সারা দেন ও দোয়া কবুল করেন।

হাদিসেও দোয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়েছে।

যথা:হাদিস:

لَيْسَ شَيْءٌ أَكْرَمَ عَلَى اللَّهِ مِنَ الدُّعَاءِ

অর্থ: “আল্লাহর কাছে দু’আর চেয়ে অধিক সম্মানিত কোনো কিছু নেই।”

الدعاء مُخُّ الْعِبَادَة

অর্থ: “দু’আ (প্রার্থনা) হলো ইবাদতের মূল বা সারবস্তু।”

من لَمْ يَدْعُ اللَّهَ سُبْحَانَهُ غَضِبَ عَلَيه

অর্থ: “যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে দু’আ করে না, তিনি তার প্রতি ক্রুদ্ধ হন।”

চিন্তা করুন,দুনিয়ার মানুষের কাছে কোনো কিছু চায়লে বা আবদার করলে সে রাগান্বিত হয়।কিন্তু মহান রব না চায়লে রাগান্বিত হয়।এমন সুযোগ থাকার পরও যে আল্লাহর কাছে চায়বে না তার চেয়ে বোকা আর কে আছে?

তবে দোআ করার নির্দিষ্ট কিছু সময় রয়েছে।যেই সময় গুলোতে দোয়া করলে আল্লাহর কাছে অবশ্যই দোয়া কবুল হবে। যদিও আল্লাহর কাছে সব সময় দোয়া করা যায়। কিন্তু হাদিসে কিছু খাস সময় পাওয়া যায়। যেমন:

১/ফরজ নামাজের পর :

أَبِي أُمَامَةَ (رضي الله عنه) قَالَ: قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَيُّ الدُّعَاءِ أَسْمَعُ؟ فَقَالَ: ” جَوْفُ اللَّيْلِ الْآخِرُ، وَدُبُرُ الصَّلَوَاتِ الْمَكْتُوبَاتِ “.

অর্থ: আবু উমামাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো: “হে আল্লাহর রাসূল! কোন দু’আ বেশি শোনা যায় (কবুল হয়)?” তিনি বললেন: “রাতের শেষ প্রহর এবং ফরয সালাতের শেষের (সালাম ফিরানোর আগের বা পরের) দু’আ।”

​ عَنِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ (رضي الله عنه) أَنَّ النَّبِيَّ (صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ) كَانَ يَدْعُو فِي دُبُرِ صَلَاتِهِ.

অর্থ: মুগীরাহ ইবনে শু’বাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নিশ্চয়ই নবী (সাঃ) তাঁর সালাতের শেষে দু’আ করতেন।(আত-তারিখুল কাবীর,খন্ড:৬,পৃষ্ঠা:৮০)

2/আযানের সময় দোয়া কবুল হয়

قال رسول الله ﷺ: ​ثِنْتَانِ لَا تُرَدَّانِ أَوْ قَلَّمَا تُرَدَّانِ: الدُّعَاءُ عِنْدَ النِّدَاءِ، وَعِنْدَ الْبَأْسِ حِينَ يُلْحِمُ بَعْضُهُمْ بَعْضًا

​অর্থ:দু’টি জিনিস (দোয়া) ফেরত দেওয়া হয় না,বা খুব কমই ফেরত দেওয়া হয়:​১. আযানের (ডাকে) সময় দোয়া।২. যুদ্ধের সময় দোয়া, যখন একে অপরের সাথে মিলে যায় (অর্থাৎ লড়াই তীব্র হয়)।(সহীহ্ আবু দাউদ, ২৫৪০)

(আযানের সময় মনে মনে আযানের জবাব দেওয়া ও ফাঁকে ফাঁকে আল্লাহর কাছে দোয়া করা)

৩/আজান শেষে আযানের জবাব দেওয়ার পর

​إِنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ الْمُؤَذِّنِينَ يَفْضُلُونَنَا، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قُلْ كَمَا يَقُولُونَ، فَإِذَا انْتَهَيْتَ فَسَلْ تُعْطَهْ»

অর্থ: ​এক ব্যক্তি বলল: “হে আল্লাহর রাসূল, মুয়াজ্জিনরা তো আমাদের চেয়ে বেশি ফযীলতপ্রাপ্ত হচ্ছে।”

​তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তারা যা বলে তুমিও তা বলো, তারপর যখন (আযান) শেষ করবে, তখন প্রার্থনা করো, (তোমাকে) তা দেওয়া হবে।”(সুনানে আবু দাউদ, ৫২৪)

৪/জুমআর দিন:

الْجُمُعَةُ اثْنَتَا عَشْرَةَ سَاعَةً، لَا يُوجَدُ عَبْدٌ مُسْلِمٌ يَسْأَلُ اللَّهَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِلَّا آتَاهُ اللَّهُ، فَالْتَمِسُوهَا آخِرَ سَاعَةٍ بَعْدَ الْعَصْرِ.

অর্থ:জুম’আর দিন এমন বারোটা সময় আছে,সেই সময় এমন কোনো মুসলিম বান্দা নেই যে আল্লাহর কাছে কিছু চায়,আর আল্লাহ তাকে তা দান করেন না।সুতরাং তোমরা তা আছরের পরের শেষ মুহূর্তে তালাশ করো।(অর্থাৎ দোয়া করো)​(সুনান আবু দাউদ, ১০৪৮)

এই হাদিস দ্বারা শুক্রবার আছরের পর মাগরিবের আগে দোয়া কবুল হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

৫/কোন মুসলমান যখন অন্য মুসলমানের জন্য দোয়া করে।

​مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَدْعُو لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ إِلَّا قَالَ الْمَلَكُ: وَلَكَ بِمِثْلٍ

অর্থ:কোনো মুসলিম বান্দা যখন তার (মুসলিম) ভাইয়ের জন্য তার অনুপস্থিতিতে দোয়া করে,তখন ফিরিশতা বলেন: ‘আর তোমার জন্যও অনুরূপ হোক।’​(সহীহ মুসলিম, ২৭৩২)

এই সময়গুলোতে দোয়া করলে আল্লাহর কাছে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে কেননা সময়গুলো হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আর আল্লাহর কাছে বান্দা দোয়া করলে আল্লাহ সেই দোয়া ফিরিয়ে দেন না।আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে বেশি বেশি দোআ করে মাকসাদ হাসিল করার তৌফিক দান করুন,আমীন।

লিখক:হাফিয মারজান বিন আব্দুল ওয়াধুদ।
জেলা:কিশোরগঞ্জ।