গল্প
*শাপলা চত্বরের রক্তাক্ত রাত: এক শহিদের গল্প*
জনি সিদ্দিক
মে মাসের ৫ তারিখে সেই তপ্ত দুপুরে আকাশের সূর্যটা যেন আগুনের পিণ্ড হয়ে মতিঝিলের রাজপথে নেমে এসেছিল। উত্তপ্ত পিচঢালা রাস্তার ওপর তখন লাখো মানুষের পদচারণা। কারো হাতে পানির বোতল, কারো হাতে তসবিহ। আর সবার মুখে অদম্য স্লোগান। ঢাকার শাপলা চত্বর সেদিন এক বিশাল জনসমুদ্রের মোহনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই সফেদ পাঞ্জাবি আর নানান ডিজাইনের টুপির মিছিলে মিশে গিয়েছিল মুজাহিদের বাবা আবু বকর সাহেবের মুখটিও। তিনি ফজর পড়েই মতিঝিলের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। সকালের নাস্তাও খান নি। সকালের নাস্তা তৈরি করে সোফায় বসে তসবিহ জপছিলেন মিসেস মারিয়া জাহান। সকালের পড়া শেষ করে জানালার গ্রিল ধরে বাইরের ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল ছোট্ট মুজাহিদ। কি যেন মনে করে সে ধীর পায়ে মায়ের পাশে এসে বসে বাবার কথা জিজ্ঞেস করল।
—“আম্মু, আব্বু কোথায় গেছেন?”
মারিয়া জাহান তসবিহ রেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ছেলের মাথায় হাত রেখে শান্ত স্বরে বললেন, ”তোর আব্বু মিছিলে গেছে রে বাপ। শাপলা চত্বরে।”
মুজাহিদ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “মিছিল কি আম্মু?”
মারিয়া জাহান বললেন, ‘‘ও মা! মিছিল কি তা তুই জানিস না? মিছিল হলো— অনেক মানুষের এক হওয়া। যখন অনেক লোক মিলে কোনো একটা দাবি নিয়ে বা কোনো আনন্দের খবর ছড়িয়ে দিতে স্লোগান দিতে দিতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, তাকেই মিছিল বলে। মিছিল অনেক রকমের হয় রে বাপ। কখনো অন্যায়ের প্রতিবাদে ‘প্রতিবাদ মিছিল’ হয়, আবার কখনো বিজয়ের খুশিতে ‘বিজয় মিছিল’ হয়।”
— “আব্বু কোন মিছিলে গেছেন, আম্মু?”
— “তোর আব্বু গেছে আমাদের বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষার দাবিতে। সেই যে তুই সেদিন বললি না, তোদের নতুন পাঠ্যবইয়ে আমাদের ইসলাম ধর্মের কথাগুলো কমিয়ে দেওয়া হয়েছে? তোর আব্বু সেই বিতর্কিত শিক্ষানীতি আর নাস্তিক্যবাদী মতবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেছে। ১৩ দফা দাবি নিয়ে আজ তারা মতিঝিল অবরোধ করেছে।”
মায়ের কথা শুনে মুজাহিদের বুকের ভেতরটা অজানা এক শঙ্কায় ধক করে উঠল। সে নিচু গলায় কিছুটা ভয়ার্ত স্বরে বলল, “আম্মু, যদি পুলিশ আব্বুকে গুলি করে? তখন কি হবে?”
মারিয়া জাহানের বুকটা কেঁপে উঠল। কিন্তু তিনি তা প্রকাশ করলেন না। অস্ফুট স্বরে বললেন, “আল্লাহর পথে বের হলে ভয় কিসের রে পাগল? যা, মাদ্রাসার ভ্যান চলে এসেছে, ক্লাসের সময় হয়ে গেছে। দেরি হয়ে যাবে।”
মাদ্রাসার ক্লাসরুমে আজ মাওলানা সাইফুল ইসলাম সাহেবের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তিনি পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সমসাময়িক বিষয়ের সবক দিচ্ছিলেন।এক কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরছিলেন ছাত্রদের সামনে। হঠাৎ এক সময় মুজাহিদ দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, “মুহতারাম, শাপলা চত্বরে তো আমার আব্বুও গেছেন। আমার খুব ভয় করছে। যদি পুলিশ গুলি করে দেয়, আমার আব্বু মারা যান? তাহলে কি হবে?”
মাওলানা সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন, “মুজাহিদ, শাপলা চত্বর আজ আমাদের ঈমান রক্ষার দুর্গ। ১৩ দফা দাবি হলো আমাদের অস্তিত্বের লড়াই। আমাদের আদর্শকে মুছে ফেলার যে চক্রান্ত চলছে, তার বিরুদ্ধে এই জনস্রোত এক জীবন্ত প্রতিরোধ। মনে রেখো, সত্যের পথে এই যে সংগ্রাম, এতে যদি কারো মৃত্যু হয়, তবে তিনি সরাসরি শহিদ। আর শহিদের সম্মান যে কত বিশাল, তা কেবল ঈমানদাররাই অনুভব করতে পারে। জালিম শাহীর গোলাম পুলিশ বাহিনী তো গুলি করতেই পারে। যদি পুলিশের গুলিতে কেউ মারা যায়, তাহলে তিনি শহীদ হবেন। তোমরা তো শহীদের গুরুত্ব মর্যাদা সবই জানো, তাই না? কুরআনের ভাষায়— শহীদরা মৃত নয়, বরং জীবিত!”
ক্লাসের সবাই সমস্বরে বলল,“জি মুহতারাম।”
দুপুরবেলা ক্লাস ছুটির ঘন্টা বাজল।
ছুটি শেষে মুজাহিদ যখন বাড়ি ফিরল, দেখল সারা দেশের মানুষের চোখ তখন টেলিভিশনের ওপর। ড্রয়িংরুমে বসে মারিয়া জাহান রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছেন টিভি স্ক্রিনের দিকে। তখন কেবল দিগন্ত টেলিভিশন আর ইসলামিক টিভি সরাসরি শাপলা চত্বরের দৃশ্য দেখাচ্ছিল। রাতের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে মতিঝিল এলাকা এক রহস্যময় নিস্তব্ধতায় ডুবে যেতে লাগল। লাখো মানুষের জিকির আর কান্নায় ঢাকার আকাশ-বাতাস তখন ভারী।
কিন্তু রাত যখন দুইটার কাঁটা ছুঁই ছুঁই, তখনই শুরু হলো এক নারকীয় তাণ্ডব। হঠাৎ করেই দিগন্ত টিভির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেল। স্ক্রিন জুড়ে শুধুই ঝিরঝির শব্দ। মুজাহিদ অবাক হয়ে রিমোট টিপে ইসলামিক টিভিতে গেল, সেখানেও একই অবস্থা! সাদা পর্দা।
আসলে সেই রাতে সরকারি আদেশে এই দুই সাহসী চ্যানেলের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। স্টুডিওতে ঢুকে তাদের সম্প্রচার যন্ত্র আর মেশিনপত্র জব্দ করা হয়েছিল, যাতে অন্ধকারের সুযোগে চলা সেই অভিযানের বীভৎসতা বাইরের কেউ দেখতে না পারে। মিডিয়ার বাতি নিভিয়ে দিয়ে মতিঝিলের সেই সাদা কাপড়ের মানুষগুলোর ওপর নামিয়ে আনা হলো টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড আর বুলেটের বৃষ্টি।
মারিয়া জাহান আর্তনাদ করে উঠলেন, “ওরা টিভি বন্ধ করে দিল কেন মুজাহিদ? নিশ্চয়ই ভেতরে খুব খারাপ কিছু ঘটছে, যা ওরা আমাদের দেখতে দিতে চায় না!”
সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দে ঢাকা শহরের ঘুমন্ত পাখিরা ডানা ঝাপটাচ্ছিল। আর মারিয়া জাহান জায়নামাজে সিজদাবনত হয়ে কাঁদছিলেন এক অজানা আশঙ্কায়।
পরদিন ৬ই মে। সকালের সূর্যটা যেন রক্তের লাল রং মেখে উদিত হলো। সারা রাত মুজাহিদের আব্বুর খবর নেই। পুরো ঢাকা শহর থমথমে, কিন্তু কিছুই যেন হয়নি! সকাল দশটার দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্স এসে থামল মুজাহিদদের বাসার গেটের সামনে। প্রতিবেশীদের ভিড় ঠেলে মুজাহিদ দৌড়ে সামনে গেল। সাদা কাফনে মোড়ানো এক নিথর দেহ বের করে আনা হলো। লাশের মুখটি খুলতেই মুজাহিদের শরীর হিম হয়ে গেল। ওর আব্বু যেন পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন। তার চেহারায় ভয়ের কোনো ছাপ নেই, বরং এক স্নিগ্ধ মুচকি হাসির আভা যেন পুরো শরীরকে উজ্জ্বল করে দিচ্ছে।
মারিয়া জাহান পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার চোখের জল শুকিয়ে গেছে তপ্ত মরুভূমির মতো। প্রবীণ আলেম ড. মাওলানা শামিম ওসমান মুজাহিদের মাথায় হাত রেখে ধীর কণ্ঠে বললেন, “বাবা মুজাহিদ, আপনি ও আপনার মা কাঁদছেন কেন? আপনারা তো এক অকুতোভয় শহিদের পরিবার! ৫ই মে-র এই কালো রাতে যারা কেবল আল্লাহর দ্বীনের দাবিতে রাজপথে জীবন দিয়েছে, তারা কখনো মরে না। মুজাহিদ, আপনার আব্বু আজ বিজয়ী। তিনি বাতিলের কাছে মাথা নত করেননি বলেই আজ তার কপালে শহিদি তিলক। এই সৌভাগ্য সবার হয় না।”
লাশ দাফনের আগে জানাজার মাঠে যখন হাজার হাজার মানুষ জড়ো হলো, মুজাহিদ তার আব্বুর চেহারার দিকে শেষবার তাকাল। তার মনে পড়ে গেল বাবাকে নিয়ে হাজারো স্মৃতির মুহূর্ত।
জানাজা শেষে মুজাহিদ ওর ছোট হাত দুটো আকাশের দিকে তুলল। সে মোনাজাত করল:
“হে রাব্বুল আলামিন! তুমি আমার আব্বুকে শহিদ হিসেবে কবুল করো। আর আমাদের এই দেশকে জালিমদের হাত থেকে এবং সকল প্রকার ষড়যন্ত্র ও হামলা-মামলা থেকে রক্ষা করো। আমার আব্বু যে কাজের জন্য শহিদ হলেন সে কাজকে তুমি সফল করো। আমাদের দেশকে ইসলামি দেশ হিসেবে গড়ার তাওফিক দাও। আমাদেরকে সকল বিপদাপদে ধৈর্য্যধারণ করার তাওফিক দাও। এই ফিতনার যুগে যেটুকু আমল যেভাবে করলে তোমার জান্নাতে যেতে পারবো সেইভাবে আমল করার তাওফিক দাও। যারা এই রাতে সত্যের কণ্ঠরোধ করতে দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি বন্ধ করে দিয়েছিল, যারা শাপলার চত্বরকে রক্তে রঞ্জিত করেছে, তাদের বিচার তুমি করো। আমার আব্বু সহ যারা যারা এই ১৩ দফা দাবির জন্য জীবন দিয়েছেন, সেই দাবি যেন এই জমিনে সফল হয়। ইসলাম বিরোধিদের সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দাও। আর আমাদেরকেও শহিদি মৃত্যু দাও।”
পেছন থেকে হাজারো মানুষের কণ্ঠে বজ্রের মতো ধ্বনিত হলো— ‘আ-মি-ন’। মুজাহিদ অনুভব করল, তার আব্বু মরে যাননি, তিনি এক অবিনাশী প্রেরণা হয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে জেগে উঠেছেন।