ল্যাম্পপোস্টের আলো
উম্মি হুরায়েরা বিলু

 

শীতের রাত নামলেই আকাশ যেন আরও নিচু হয়ে আসে—ক্লান্ত কোনো বুকের মতো। তারার আলো কুয়াশার পাতলা পর্দার ওপারে কাঁপতে থাকে, ঠিক যেন শীতের ভয়ে তারা নিজেরাই আলো জ্বালাতে দ্বিধা করছে। চাঁদও তখন পূর্ণ উষ্ণ নয়—ম্লান, বিবর্ণ; কারও না বলা কষ্ট বুঝে নীরবে তাকিয়ে থাকা একাকী সাক্ষীর মতো। বাতাস বইলে কোনো শব্দ হয় না, শুধু হাড়ের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে পড়া শীতল স্পর্শ—মনে হয় অদৃশ্য কোনো হাত ধীরে ধীরে প্রাণের উষ্ণতা চুরি করে নিচ্ছে। গাছের পাতা আর ডালগুলো স্তব্ধ হয়ে থাকে, যেন শীতের কাছে তারা সব শব্দ, সব প্রতিবাদ হারিয়ে ফেলেছে।

রাস্তাঘাটে নেমে আসে একরকম নিঃসঙ্গতা। দিনের কোলাহল সরে গিয়ে রাত জুড়ে থাকে শুধু দূরের কুকুরের কান্নাভেজা ডাক, ট্রেনলাইনের পাশে বয়ে যাওয়া হাওয়ার দীর্ঘশ্বাস, আর ল্যাম্পপোস্টের নিচে জমে থাকা ক্লান্ত, অবহেলিত আলো। শহরের জানালাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যায়—ভেতরে উষ্ণতার গল্প, হাসির শব্দ, চায়ের কাপের বাষ্প; আর বাইরে শীত দাঁড়িয়ে থাকে তার আসল রূপে—নির্দয়, নির্লিপ্ত, ক্ষমাহীন।

কুয়াশার ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে থাকা পথগুলো তখন আর পথ থাকে না—হয়ে ওঠে অপেক্ষা। শিশিরে ভেজা মাটি এতটাই ঠাণ্ডা যে খালি পায়ে দাঁড়ালে মনে হয়, মাটিও মানুষকে ফিরিয়ে নিতে চায় না। শীতের এই রাতগুলো কারও কাছে ঘুমের, কারও কাছে স্বপ্নের; আবার কারও কাছে কেবল বেঁচে থাকার যুদ্ধ—একটা রাত পার করার নীরব লড়াই।

সেই রাতে সামিরের ঘুম আসছিল না। বুকের ভেতর অজানা এক ভার, মাথার ভেতর এলোমেলো চিন্তার ভিড়। ইচ্ছে করছিল—শীতের এই নিস্তব্ধতায় চাদর গায়ে জড়িয়ে, এক কাপ গরম চা হাতে নিয়ে একটু নিঃসঙ্গ হাঁটতে। ভাবনাটা মনে এসেই আর থামল না। সে উঠে পড়ল। চাদরটা শরীরের চারপাশে শক্ত করে জড়িয়ে, ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে ধীরে হাঁটতে লাগল।

রাস্তার পাশে দু-একটা ছোট্ট চায়ের দোকান তখনও খোলা। জীবিকার তাগিদে এই কনকনে শীতেও তারা জেগে থাকে—কিছুটা রোজগারের আশায়, কিছুটা অভ্যাসের টানে। সামির এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিল। উষ্ণ কাপটা দু’হাতে চেপে ধরতেই আঙুলে যেন সামান্য প্রাণ ফিরে এল।

কিছু দূর যেতেই তার চোখ আটকে গেল।

ফুটপাথের ধারে, ভাঙা কার্টনের পাশে বসে আছে একটা ছোট শিশু। বয়স বড়জোর ছয় কিংবা সাত। গায়ে কোনো জামা নেই—শরীর জড়ানো একটা পাতলা পলি ব্যাগই তার শীতের একমাত্র ঢাল। পায়ে জুতা নেই; পা দুটো এমনভাবে মাটির সঙ্গে লেগে আছে, যেন শীত তাকে নিজের বলে মেনে নিয়েছে। চোখে এক অদ্ভুত সতর্ক ক্লান্তি—এই বয়সে যা থাকার কথা নয়। শীতের রাতে ঘুম তার জন্য আরাম নয়, বরং প্রতিদিনের অগ্নিপরীক্ষা।

সামির থমকে দাঁড়াল। বুকের ভেতর হঠাৎ করে কিছু একটা মোচড় দিয়ে উঠল।
দ্রুত কাছে এগোতেই ছেলেটা চমকে উঠল। ভয় পেয়ে আরও কাচুমাচু হয়ে বসে পড়ল। তবু সে পালাল না। সামির তার পাশে বসে মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল—মমতার নীরব স্পর্শে।

—নাম কী তোমার?

ছেলেটা নিচের দিকে তাকিয়েই ক্ষীণ গলায় বলল— —নীরব।

—এই শীতে রাতে কিছু খেয়েছ?

নীরব মাথা নেড়ে বলল— —না ভাই।

সামির চায়ের কাপটা এগিয়ে দিল। —এটা খাও। ঠাণ্ডাটা একটু কম লাগবে।
তারপর সে নিজের চাদরটা খুলে নীরবের গায়ে জড়িয়ে দিল। —তুমি এখানেই বসে থাকো। আমি তোমার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসছি।

দোকান থেকে কেক, বিস্কুট আর পানি এনে সামির নীরবের সামনে রাখল। খাবার পেয়ে নীরবের চোখে এমন এক আলো জ্বলে উঠল, যেন বহুদিন পর কেউ তাকে মানুষ বলে চিনেছে।
নিভু নিভু কণ্ঠে সে বলল— —এই সব খাওন আমার লাইগা?

—হুম।

সে খেতে লাগল—তাড়াহুড়া করে, ভয় পেয়ে; যদি আবার কেউ কেড়ে নেয়।

—তোমার বাবা-মা কোথায়?

—সামির ধীরে জিজ্ঞেস করল।

নীরব গিলতে গিলতে বলল— —আম্মা আল্লাহর লগে চইলা গেছে।

—আর বাবা?

নীরব একটু চুপ করল। তারপর খুব আস্তে বলল— —আব্বা আরেকডা আম্মা আনছিল। ওই আম্মাডা আমারে খুব মারত ভাই।
সামিরের বুকটা ভারী হয়ে এল। —তারপর?

—একদিন আমারে নিয়া ঢাকায় বেড়াইতে আইছিল। ওই দিন আমারে অনেক আদর করছিল। আমি খুব খুশি আছিলাম। বাস থেইকা নামার পর ওই আম্মা কইল,
‘এইখানে বইসা থাক, আমি এখনই আইতাছি।’

নীরব থামল। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। —সেই যে গেল… আর আইল না। জানো ভাই, আমি এখনো এইহানেই বইসা থাহি। যদি আম্মায় আসে, আর আমারে লইয়া যাইবো… আমি যদি অন্য জায়গায় যাই, যদি আমারে না পায়?

সামির আর কিছু বলতে পারল না। বুকের ভেতর যেন শব্দহীনভাবে রক্ত ঝরতে লাগল।

—তুমি কতদিন ধরে এখানে আছ?—গলা শক্ত করে জিজ্ঞেস করল সে।
নীরব আকাশের দিকে তাকাল। কুয়াশার আড়ালে লুকানো চাঁদের দিকে। তারপর খুব ধীরে বলল— —মেলা দিন ভাই… মেলা দিন।
—ভাই একটা কতা কমু?

—হুম, বলো।

—তুমি আমার লগে এমন কইরা কতা কইও না। আগে তো কেউ এমন কইরা কতা কয় নাই। তুমি আমারে ‘তুই’ কইরা কও।

—আচ্ছা।

—তা বস, লেখা-পড়া করতে ইচ্ছে করে?

—করে ভাই, কেমনে করুম? খাইতেই তো পাই না।
সামির গভীর স্বরে বলল— —শোন বস, কাল আমি তোর জন্য নতুন জামা, জুতা, সোয়েটার আর বই কিনে নিয়ে আসব।

—আমি তো পরতে পারি না, বই দিয়া কী করুম?

—রোজ রাতে আমি আসব।
এসে তোকে পড়াবো। তারপর তুই যখন পড়তে শিখবি আর একটু বড় হবি, তখন তোকে স্কুলে ভর্তি করে দেবো। আর পরে এইখানেই তোর ছোট একটা দোকান করে দেবো। চকলেট, বিস্কুট, চানাচুর—এই সব বিক্রি করবি। পারবি তো?

—হ ভাই, পারুম।

—তোর ব্যবসার টাকায় তুই পড়তে পারবি, ভালো করে খেতে পারবি। লেখা-পড়া শিখে একদিন বড় মানুষ হবি—কেমন?

—হ ভাই, আমি পারুম।
জানো ভাই, তোমার মতো কেউ এমন কইরা আমাগো ভালোবাসে না। সগলডি তো আমাগো খালি লাথি-ঝাটা মারে। আমাগো কেউ মানুষই ভাবে না।

তুমি কি সত্যি মানুষ ভাই?

সামিরের চোখ ঝাপসা হয়ে এল। —দূর বোকা, মানুষ না হলে আর কী হব?

—না ভাই… তুমি মনে হয় ফেরেস্তা।

সামির খুব ধীরে বলল— —না গো বস, আমিও মানুষ। আমার সামর্থ্য থাকলে তোকে একটা সুন্দর জীবন দিতাম। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও সব কিছু করা যায় না।

শীতের রাত আরও গাঢ় হয়। ল্যাম্পপোস্টের আলো কাঁপে। ফুটপাথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকে দুটো জীবন—একটা বয়সে ছোট, আরেকটা দায়ে বড়।

ভাই তোমার বাড়ি যাইবা না?

—হুম,সাবধানে থাকিস কেমন মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো সামির।

নীরবের মনে এক অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করলো জড়িয়ে ধরলো সামিরকে।

সামিরও দু’হাতে জড়িয়ে নিলো এ জানো এক মানবতার সম্পর্কে।

কালকে এখানেই থাকবি কেমন, আমি এসে তোকে মার্কেটে নিয়ে যাবো তারপর তোকে তোমার পছন্দের খাবার খাওয়াবো।

নীরব হাসলো, প্রশান্তির হাসি।এতো বড়ো শহরে ওর ও কেউ আছে যে তাকে ভালোবেসে খাওয়াবে নতুন জামা দিবে।
সামির হাটঁতে শুরু করলো
পিছন থেকে নীরব ডাক দিলো।
ভাই তোমার চাদর লইয়া যাও।
ওটা তোর কাছে রাখ ঠান্ডা একটু হলেও কম লাগবে।
ওটা গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়।

আনমনে সামির হাঁটতে লাগলো আর ভাবতে লাগলো রব তাদের কত ভালোবাসে,
থাকার জন্য সুন্দর বাড়ি দিয়েছে তিন বেলা ভালো খাবার দিয়েছেন,কত কত নেয়ামত দিয়েছেন।
তাও কত অপূর্ণতা আমাদের জীবন কিন্তু নীরব ও তো মানুষ আল্লাহ তাকে রেখেছে রাস্তায়।
আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে শেষ করা যাবে না।
ওর সামর্থ্য থাকলে রাস্তার অসহায় মানুষদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতো।
এসব ভাবতে ভাবতে চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো অশ্রু।
থমকে দাড়ালো সামির।
ও খেয়ালিই করে নেই বেখেয়ালে হাটতে হাটতে বাসা পিছনে রেখে এসেছে।
ও আকাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে বাসর দিকে হাটা দিলো। এটা নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের হাসি।

কারণ এই শহরের সব আলো ল্যাম্পপোস্টে থাকে না। কিছু আলো জন্ম নেয় মানুষের হৃদয়ে—আর সেই আলো দিয়েই কোনো কোনো শীতের রাত মানুষ হয়ে ওঠে।

মাদারীপুর সদর,মাদারীপুর