কবিতা: আলোর আড়ালে আধার
লেখক: উম্মি হুরায়েরা বিলু
ঈদ মানেই আনন্দ,ভালোবাসা ভাগাভাগির এক পবিত্র উৎসব। হাসি, মজা, আনন্দ, নতুন পোষাক, নানা রকম মজাদার খাবার আর আলোর ঝলকানিতে ভরে যায় চারিপাশ।
কিন্তু এই আনন্দে মাঝেই লুকিয়ে থাকে এক ভয়াবহ আর্তনাদ, যা আমরা দেখি না,শুনি না কিংবা অনুভব করতে চাই না।
ঈদের রাতে আকাশজুড়ে ফুটে ওঠা আতসবাজি, তারাবাজি আর ফানুসের ঝলক আমাদের দেয় সীমাহীন আনন্দ, কিন্তু এই আলো এই শব্দই হয়ে ওঠে অসংখ্য বোবা প্রাণীর আতঙ্ক, ভয় আর অসহনীয় যন্ত্রণার কারণ।
যখন রাতের আকাশ রঙিন আলোয় ভরে ওঠে,চারিদিক আতসবাজি, তারাবাজির শব্দ মুখরিত হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই আতঙ্কে ছটফট করে ওঠে পাখিরা।
হঠাৎ বিকট শব্দে তারা দিকভ্রান্ত হয়ে ছুটতে থাকে অজানার পথে।
অনেকে থাক্কা খায় বিল্ডিংয়ে,কেউ গাছের সাথে, কেউ বা বৈদ্যুতিক তারে।কারো বাসা ভেঙে যায় ছোটাছুটি করতে গিয়ে।
ডিম নষ্ট হয়ে যায়।ছোট ছোট ছানা বাসা থেকে পড়ে মারা যায়।
অনেক পাখি আতঙ্কে হৃদরোগ আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে,আতসবাজির শব্দে পাখিদের হৃৎস্পন্দন কয়েকগুণ বেড়ে যায়—যা তাদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ।
শহরের কোনো এক কোণে,
একটি কুকুর আতঙ্কে কাঁপছে।
চোখে ভয়ের ছাপ—
সে বুঝতে পারছে না, কী হচ্ছে চারপাশে।
বিড়ালগুলো লুকিয়ে পড়ে অন্ধকারে।
এই আতঙ্ক শুধু এক রাতের নয়—
অনেক প্রাণীর মনে থেকে যায় দীর্ঘস্থায়ী ভয়,
যা তাদের স্বাভাবিক জীবনকেও করে তোলে অশান্ত।
আতসবাজির রঙিন আলো শুধু সৌন্দর্য নয়—
এর পেছনে লুকিয়ে থাকে বিষাক্ত ধোঁয়া।
সালফার, কার্বন আর ভারী ধাতুর মিশ্রণে তৈরি এই ধোঁয়া।
এটা বাতাসকে করে তোলে দুষিত।
এই বাতাসেই শ্বাস নেয় পশু-পাখি—
অসুস্থ হয়ে পড়ে, কষ্ট পায়,
আর আমরা তা টেরই পাই না।
আমাদের আনন্দের রাত—
কারো জন্য হয়ে ওঠে শেষ রাত।
কোথাও হয়তো পড়ে আছে একটি নিথর পাখি,
কোথাও কাঁপছে এক অসহায় কুকুর,
কোথাও হারিয়ে গেছে একটি ছোট্ট প্রাণ।
তাদের কষ্টের কোনো ভাষা নেই,
অভিযোগের কোনো জায়গা নেই—
শুধু নীরবে সহ্য করা ছাড়া আর কিছু করার নেই তাদের।
ঈদ আমাদের শেখায় দয়া, মায়া আর সহমর্মিতা।
এই আনন্দ যদি অন্য কোনো প্রাণীর কষ্টের কারণ হয়—
তবে কি তা সত্যিকারের আনন্দ?
আমরা চাইলে পারি এই কষ্ট কমাতে।
আতসবাজি ব্যবহার না করে,
বিকল্প আনন্দ বেছে নিয়ে,
আর চারপাশের প্রাণীদের প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হই।
ঈদের আনন্দে আলোকিত হোক ধরা, তবে কারো জীবনকে অন্ধকারে ঢেকে দিয়ে নয়।
শব্দ উঠুক, তবে তা মানবতার শব্দ, কারো হৃদয়ের স্পন্দন থামিয়ে দেওয়ার নয়।
এই ঈদে আসুন—
আমরা শুধু মানুষ নয়,
সব প্রাণীর জন্য আনন্দের পৃথিবী গড়ে তুলি।
কারণ সত্যিকারের আনন্দ উৎসব তো সেটাকে বলে—
যে আনন্দে যে উৎসবে কেউ কষ্ট পায় না,কারো হৃদস্পন্দন থেমে যায় না।
সুতরাং আমি, আপনি, আমরা—
চাইলেই পারি আনন্দটাকে অন্যভাবে আরো সুন্দর করে উপভোগ করতে।