✍ কবরের ঠিকানায় লেখা এক অনন্ত চিঠি

✒ লেখিকা: ফাতেমা বিনতে সৈয়দ

যদি কবরের ঠিকানায় চিঠি পাঠানো যেত, তবে আমি আমার আম্মার কাছে লিখতাম এক সমুদ্রভরা কথা,
অভিমান, শূন্যতা আর অপ্রকাশিত ভালোবাসার সবটুকু হিসাব।

 প্রিয় আম্মো,

আপনি চলে যাওয়ার পর আমার জীবন যেন থেমে থাকা এক ঝড়,
বাইরে নিস্তব্ধ, অথচ ভেতরে নিরবচ্ছিন্ন তাণ্ডব।

তখন আমার বয়স মাত্র ছয় বছর। আপনার চার বোন ছিলেন, কিন্তু আপনার অনুপস্থিতিতে কেউই আমার মাথায় স্নেহের হাত রাখেননি। বরং শুনতে হয়েছে,
“বোন নেই, বোনের মেয়ে কে?”

এই একটি বাক্যই আমার শৈশবকে নিঃস্ব করে দিয়েছে, আম্মা।

আপনার মা, আমার নানু, আপনি যেদিন পৃথিবী ছেড়ে গেলেন, সেদিনই বলেছিলেন,
“মেয়ে নেই, নাতনী কে?”

আম্মা…
এই কথাগুলোর ভার আজও আমার বুকের ভেতর জমে থাকা এক অদৃশ্য পাথর।

আমি আজও মানুষের মৃত্যুতে কাঁদি,
দূরের কারো জন্যও চোখ ভিজে যায়।

কিন্তু নানু মারা গেলে হয়তো আমার চোখ দিয়ে রক্ত ঝরবে, তবুও অশ্রু আসবে না।
কারণ ভালোবাসা তো কখনো পাইনি…
সম্পর্কের উষ্ণতা কখনো অনুভব করতে পারিনি।

আপনি চলে যাওয়ার পর বাবার কাছ থেকেও পেয়েছি অবহেলা।
শৈশবে কোনো দিন পেট ভরে খেতে পারিনি।

কেউ আমার মাথায় স্নেহের হাত রাখেনি,
কেউ আমার ছোট ছোট আবদার শোনেনি।

আমিও ধীরে ধীরে চাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।

আজ আমি বড় হয়েছি,
কিন্তু এই বড় হওয়া যেন শূন্যতার ভিতর দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃশব্দ অস্তিত্ব।

নিজের পরিবারই এখন আমার কাছে অপরিচিত লাগে।
তারা আছে, তবুও আমি একা।

আম্মা…

আমি আজও জানি না, আপনি আমাকে কতটা আদর করেছিলেন।
কারণ আমি বুঝে ওঠার আগেই আপনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

আমার স্মৃতিতে আপনি আছেন,
কিন্তু সুস্থ, হাসিমাখা মা হিসেবে নয়;
বরং নীরব যন্ত্রণায় আচ্ছন্ন এক ছায়া হয়ে।

এই রমজানে আমি আলেমা হব, ইনশাআল্লাহ।

কিন্তু পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।

অথচ পড়াশোনায় আমি ভালো,
উস্তাদগণ প্রশংসা করেন, ফলাফলও ভালো হয়।

পুরস্কার পাই,
কিন্তু সেই পুরস্কার নিতে কোনো অভিভাবক কোনো দিন পাশে দাঁড়ায়নি।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি একা ছিলাম,
যেমন একা আছি জীবনের প্রতিটি মোড়ে। মাদ্রাসা বন্ধ হলে ফুফুদের বাসায় থাকতাম।

সেখানেও অবহেলা ছিল নিত্যসঙ্গী।

নতুন বালিশগুলো তুলে রাখা হতো,
আর আমি পুরোনো কাপড় গুটিয়ে বালিশ বানিয়ে ঘুমাতাম।আম্মো…

আমার স্পষ্ট মনে আছে,

কারেন্ট চলে গেলে আপনি অসুস্থ শরীর নিয়েও আমাকে পাখা দিয়ে বাতাস করতেন।
কিন্তু সেই বাড়িতে গরমে আমার ঘুম হতো না।

ফ্যান একটু বেশি সময় চললেই বকুনি,
তারপর বন্ধ, এটাই ছিল নিয়ম।

শীত এলে পিঠার গন্ধ ভেসে আসত…

কিন্তু কোনো দিন বলিনি,
“আমাকেও দাও।”

ঈদ এখনো আসে, আম্মা,
কিন্তু আনন্দ আর আসে না।

আপনার সাথে ঈদের হাসি ভাগ করে নেওয়ার সুযোগও তো পাইনি।
আপনি তখন অসুস্থতার ঘেরাটোপে বন্দি ছিলেন।

আমার বড় বোন আপনার মতো দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করে,
কিন্তু তা কেবল টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সে ভাবে, টাকা দিলেই সব শূন্যতা ভরে যায়।

কিন্তু আম্মা…
টাকা কি কখনো মায়ের ভালোবাসার জায়গা নিতে পারে?

সব খরচ বহন করেও তারা আমার ভাঙা মন জোড়া লাগাতে পারেনি।
অসুস্থ হলে কেউ পাশে বসে না,
শুধু টাকা দেয়, বলে ঔষধ কিনে নিও।

এই পৃথিবীতে আমি যেন সবকিছুর মাঝেও এক নিঃসঙ্গ মানুষ।

 আম্মা…

আমি চাই,
পরকালে আপনার সাথে কিছু সময় কাটাতে, যা দুনিয়ায় কখনো পাইনি।

আপনাকে জড়িয়ে ধরে জানতে চাই,
মায়ের শরীরের ঘ্রাণ কেমন হয়।

আপনি আমার চুল বেঁধে দেবেন,
মাথায় বিলি কেটে দিবেন,
আমি চোখ বন্ধ করে সেই স্পর্শ অনুভব করতে চাই।

আমি আপনার বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে চাই,
একবার… শুধু একবার।

আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাই, সব কথা।
কারণ মানুষ বলে,
মায়ের কাছে নাকি সব কথা বলা যায়।

আম্মা…

আল্লাহ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত,
আপনাকে—আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন।

তারপর থেকে একের পর এক পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন।

তবুও আমি অকৃতজ্ঞ নই,
যেমন আছি, আলহামদুলিল্লাহ।

আমি লড়ছি, আম্মা…

তবে সত্যি বলতে, আমি ভীষণ ক্লান্ত।

এই দুনিয়ায় আমার এখন একমাত্র ভরসা,

আমার আল্লাহ।