গল্পের নাম: তাওবার চাদর গায়ে জড়িয়ে

‎লেখিকা: ফাতেমা বিনতে সৈয়দ

‎ধরণ: নৈতিক শিক্ষা ও আত্মাশুদ্ধি।

‎নিস্তব্ধ শহর যেন নীরব চিৎকারে মুখর।

‎সামনে বিশাল নদী, তার উপর স্থির দাঁড়িয়ে আছে একটি পুরোনো ব্রিজ। গভীর রাতের কুয়াশা সেই ব্রিজটিকে যেন রহস্যময় এক আবরণে ঢেকে রেখেছে। ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলো আর জোছনার স্নিগ্ধ আভা মিলেমিশে নদীর জলে এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের রেখা এঁকে দিয়েছে।

‎ক্লান্ত শরীর টেনে টেনে সেই ব্রিজের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ফয়সাল।

‎সে একা। খুব একা।

‎হাঁটছে… শুধু হাঁটছে…

‎কিন্তু সে নিজেও জানে না—কোথায় যাচ্ছে।

‎চারপাশে ছড়িয়ে আছে ঘুমন্ত মানুষ—

‎কেউ ভিখারী, কেউ পাগল, কেউ মাতাল, কেউ পথশিশু।

‎এইসব মানুষের মাঝেও ফয়সাল যেন ভীষণ অচেনা।

‎সে কারো মতো নয়—

‎আবার সবার মতোও।

‎গভীর রাতে ক্ষুধার্ত কুকুরের ডাক তাকে আর ভয় দেখায় না। বরং তারা যেন তার নীরব সঙ্গী হয়ে গেছে।

‎ইলমি পরিবেশ থেকে ছিটকে পড়া এক তরুণ।

‎শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এক আত্মা।

‎রাত কাটে রাস্তায়।

‎চোখের অশ্রু ভোরের কুয়াশার সাথে মিশে যায়।

‎প্রতিদিন সকাল হলে সে মিথ্যা হাসির মুখোশ পরে নেয়—

‎আর নীরবে লড়াই করে নিজের সাথেই।

‎ফয়সাল ছিল একজন আলেম ও ধার্মিক পরিবারের সন্তান।

‎তার পিতা মাওলানা সালেহ আহমেদ মাদানী—একজন সম্মানিত আলেম। তাদের বংশে প্রায় সবাই দ্বীনের ইলমে শিক্ষিত।

‎শৈশব থেকেই ফয়সাল বড় হয়েছে ধর্মীয় পরিবেশে।

‎ভোরের শীতল হাওয়ায় যখন সূর্যের আলো ধীরে ধীরে পৃথিবীকে ছুঁয়ে দিত, তখন ফয়সালের দিন শুরু হতো কুরআনের তিলাওয়াত দিয়ে।

‎সে ছিল একজন হাফেজ।

‎তার সুমধুর তিলাওয়াতের সুরে পরিবারের সবার ঘুম ভাঙতো।

‎মাদ্রাসায় সে ছিল কাফিয়া জামাতের একজন মেধাবী ও পরিশ্রমী ছাত্র।

‎কিন্তু মানুষ কখন পথ হারায়?

‎খারাপ সঙ্গ যখন হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে।

‎আল্লাহ তাআলা কুরআনে সতর্ক করে বলেছেন।

‎          মুফতী তাকী উসমানী অনুবাদ করেন:__

‎    یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَکُوۡنُوۡا مَعَ الصّٰدِقِیۡنَ.

‎তরজমা:হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক। ১০৩

‎          —(আত তাওবাহ্) – (১১৯)

‎রমজানের ছুটিতে ফয়সাল বাড়িতে এলো।

‎এবারের রমজানটা তার জন্য একটু অন্যরকম। কারণ সে এলাকার বড় মসজিদে তারাবীহ নামাজ পড়াবে।

‎আর বহুদিন পরে তার ছোটবেলার বন্ধুরাও একত্র হবে।

‎একদিন যোহরের নামাজ পড়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিল সে।

‎হঠাৎ দরজায় কলিং বেল বাজল।

‎ছোট বোন নাবিলা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলতেই আনন্দে চিৎকার করে উঠল—

‎=“ফয়সাল ভাইয়া! বিশাল ভাইয়া এসেছে!”

‎বিশাল ছিল ফয়সালের স্কুল জীবনের বন্ধু।

‎কিন্তু সময় তাকে বদলে দিয়েছিল।

‎ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার জীবনযাপন একেবারে বদলে যায়।

‎মাদক, অশ্লীলতা, বাজে বন্ধুত্ব—এসবই হয়ে ওঠে তার নিত্যসঙ্গী।

‎ফয়সাল তখনও বুঝতে পারেনি—

‎এই বন্ধুত্ব তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হবে।

‎বিশাল কয়েকদিনের জন্য তাদের বাসায় থেকে গেল।

‎দিনে স্বাভাবিক আচরণ করলেও রাত হলেই তার ফোনে শুরু হতো অশ্লীল ভিডিও, গান, মুভি আর মেয়েদের সাথে ভিডিও কল।

‎এক রাতে ফয়সাল কুরআন তিলাওয়াত করছিল।

‎হঠাৎ পাশ থেকে ভেসে আসা কিছু শব্দ তার কানে লাগে।

‎তার মনে এক অদ্ভুত কৌতূহল জাগে।

‎বিশাল হাসতে হাসতে বলল—

‎=“তোর ফোন নেই নাকি?”

‎ফয়সাল বলল,

‎=“না। বাবা বলেছেন কাফিয়া শেষ হলে কিনে দিবেন।”

‎বিশাল হেসে বলল—

‎=“এই যুগে ফোন ছাড়া মানুষ বাঁচে নাকি? তুই তো একদম বোকা!”

‎সেদিন থেকেই ফয়সালের মনে এক অদ্ভুত অস্থিরতা জন্ম নেয়।

‎ধীরে ধীরে বিশাল তাকে গান শোনায়… মুভি দেখায়…

‎অবশেষে এক মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

‎হারাম সম্পর্কের দরজা খুলে যায়।

‎যে ছেলে একসময় রাত জেগে কুরআন তিলাওয়াত করত—

‎সে এখন রাত জাগে গুনাহের অন্ধকারে।

‎🚫কুরআনে এমন বন্ধুদের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।

‎          یٰوَیۡلَتٰی لَیۡتَنِیۡ لَمۡ اَتَّخِذۡ فُلَانًا خَلِیۡلًا

‎          মুফতী তাকী উসমানী

‎হায় আমার দুর্ভোগ! আমি যদি অমুক ব্যক্তিকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!

‎          —(আল ফুরকান) – (২৮)

‎          وَیَوۡمَ یَعَضُّ الظَّالِمُ عَلٰی یَدَیۡہِ یَقُوۡلُ یٰلَیۡتَنِی اتَّخَذۡتُ مَعَ الرَّسُوۡلِ سَبِیۡلًا

‎          মুফতী তাকী উসমানী

‎এবং যে দিন জালেম ব্যক্তি (মনস্তাপে) নিজের হাত কামড়াবে এবং বলবে, হায়! আমি যদি রাসূলের সাথে পথ ধরতাম!

‎          —(আল ফুরকান) – (২৭)

‎একসময় ফয়সাল তার কিতাব কেনার টাকা দিয়ে গোপনে একটি স্মার্টফোন কিনে ফেলে।

‎মাদ্রাসায় ফিরে যাওয়ার পর তার পরিবর্তন দ্রুত চোখে পড়ে।

‎একদিন তার উস্তাদ—

‎দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে দাওরা করা আলেম

‎মাওলানা আব্দুল্লাহ হালিম সাহেব—ফয়সালের ফোনটি ধরে ফেলেন।

‎এশার নামাজের পর মসজিদের হলরুমে তিনি ফোনটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন।

‎ফয়সালের চোখে তখন রাগের আগুন।

‎হঠাৎ সে উস্তাদের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়ে।

‎রাগের মাথায়—

‎সে উস্তাদের গালে একটি চড় মেরে বসে।

‎মসজিদের ভেতর নেমে আসে নিস্তব্ধতা।

‎এবং হুজুরের সাথে বেয়াদবি করে ও তর্ক।

‎মুহূর্তেই সে ফোন তুলে নিয়ে বেরিয়ে যায়।

‎ফয়সাল বলতে থাকে—

‎=“এই মাদ্রাসায় আমি আর পড়ব না!”

‎যখন খবরটি পৌঁছায় তার পিতা মাওলানা সালেহ আহমেদ মাদানীর কাছে—

‎তিনি স্তব্ধ হয়ে যান।

‎একজন আলেম পিতা…

‎যার স্বপ্ন ছিল ছেলেকে বড় আলেম বানানো।

‎তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন—

‎=“হে আল্লাহ… আমার ছেলেকে আপনি ফিরিয়ে দিন…”।

‎তার মা আমেনা খাতুন সেদিন থেকে রাতের পর রাত তাহাজ্জুদে দাঁড়াতে থাকেন।

‎অশ্রুভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন—

‎=“হে রব!

‎আমি তাকে দশ মাস গর্ভে রেখেছি…

‎আজ সে যদি পথ হারায়—

‎তুমি তাকে আবার হেদায়েতের পথে ফিরিয়ে দাও।”

‎নফল রোজা, নফল নামাজ, অশ্রু আর দোয়া—

‎সবকিছু দিয়ে তিনি আল্লাহর দরবারে মিনতি করতে থাকেন।

‎আর সেই সময়…

‎নিস্তব্ধ শহরের সেই ব্রিজের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ফয়সাল।

‎ভাঙা হৃদয় নিয়ে।

‎পাপের ভারে নুয়ে পড়া এক আত্মা।

‎হয়তো কোনো এক রাতেই—

‎সে আবার ফিরে আসবে।

‎তাওবার চাদর গায়ে জড়িয়ে।

‎তার চাদরের এক পার্শ্ব ভেজা, পাপে বুঝায় ভারি হয়ে আছে চাদর।

‎কারণ আল্লাহ বলেন—

‎          قُلۡ یٰعِبَادِیَ الَّذِیۡنَ اَسۡرَفُوۡا عَلٰۤی اَنۡفُسِہِمۡ لَا تَقۡنَطُوۡا مِنۡ رَّحۡمَۃِ اللّٰہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یَغۡفِرُ الذُّنُوۡبَ جَمِیۡعًا ؕ اِنَّہٗ ہُوَ الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ

‎          মুফতী তাকী উসমানী

‎বলে দাও, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজ সত্তার উপর সীমালংঘন করেছে, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন।  নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

‎আয়াতের শানে নুজুলঃ

‎যারা শিরক করে, স্বীয় কামনা ও প্রবৃত্তির বশে থাকে, নানা অবাধ্যতা ও অপরাধ প্রবণতা, হত্যা ব্যভিচার ইত্যাদি জঘন্য অপরাধে লিপ্ত একদল একবার রাসূল( সা:) এর নিকট এসে বলল, হে মুহাম্মদ। তুমি যে ঈমান ও তাওহীদের প্রতি আমাদেরকে আহ্বান করছ তা অবশ্যই সুন্দর ও সত্য। কিন্তু এটা বল দেখি, ঈমান গ্রহণের ফলে আমাদের অতীত অবাধ্যচরণ ও পাপসমূহ মাপ হবে কি না? তখন এ আয়াতটি নাযিল হয়।

‎— (সূরা যুমার ৩৯:৫৩)

‎‎কারণ আল্লাহ বলেন—

‎          قُلۡ یٰعِبَادِیَ الَّذِیۡنَ اَسۡرَفُوۡا عَلٰۤی اَنۡفُسِہِمۡ لَا تَقۡنَطُوۡا مِنۡ رَّحۡمَۃِ اللّٰہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یَغۡفِرُ الذُّنُوۡبَ جَمِیۡعًا ؕ اِنَّہٗ ہُوَ الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ

‎          মুফতী তাকী উসমানী

‎বলে দাও, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজ সত্তার উপর সীমালংঘন করেছে, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন।  নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

‎আয়াতের শানে নুজুলঃ

‎যারা শিরক করে, স্বীয় কামনা ও প্রবৃত্তির বশে থাকে, নানা অবাধ্যতা ও অপরাধ প্রবণতা, হত্যা ব্যভিচার ইত্যাদি জঘন্য অপরাধে লিপ্ত একদল একবার রাসূল( সা:) এর নিকট এসে বলল, হে মুহাম্মদ। তুমি যে ঈমান ও তাওহীদের প্রতি আমাদেরকে আহ্বান করছ তা অবশ্যই সুন্দর ও সত্য। কিন্তু এটা বল দেখি, ঈমান গ্রহণের ফলে আমাদের অতীত অবাধ্যচরণ ও পাপসমূহ মাপ হবে কি না? তখন এ আয়াতটি নাযিল হয়।

‎— (সূরা যুমার ৩৯:৫৩)