ফাল্গুনের রঙে ভালবাসা
জেরিন জাহান দিশা

আজ ১৪ ই ফেব্রুয়ারি। একসাথে দুটো উৎসব -আর পহেলা ফাল্গুন। চারিদিকে যেন রঙের বিস্ফোরণ -হলুদ শাড়ি , লাল গোলাপ, কৃষ্ণচূড়ার আগুনরাঙা হাসি – সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নিজেই প্রেমের সাজে সেজেছে। মেঘলার সকালের ঘুম ভাঙল খলিসাকুন্ডির মিষ্টি প্রকৃতির ডাক শুনে। ঘুঘুর ডাক শালিকের কিচিরমিচির, দূরে কোকিলের গান শুনে।

মেঘলা শহরের মেয়ে আর রোহান শহরের ছেলে।
মেঘলা ফাল্গুনের এই বিশেষ দিনে রোহানের সঙ্গে গ্রাম দেখতে এসেছে সে ।রোহানের বাড়ির পিছনে বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেত। নরম রোদে ঝিলমিল করছে ধানের শিষ।সাদা বকগুলো মনের আনন্দে
ধানের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর পোকা-মাকড় খাচ্ছে। জানালার পাশ দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে সব দেখছিল মেঘলা । হঠাৎ রোহান ঘরে ঢুকে হেসে বলল , কি দেখছ অমন করে ?

মেঘলা মৃদু হেসে বলল ,ধানক্ষেতের ভেতরে সাদা বকগুলো কী সুন্দর করে খাবার খুঁজছে !যেন ছবির মতো লাগছে সব।রোহান বলল , চলো তোমাকে মাঠের ওই সরু পথটা ধরে হাঁটিয়ে আনি কাছ থেকে দেখলে আর ও ভালো লাগবে।
দু’জনে বেরিয়ে পড়ল । সরু মাটির পথ , দু’পাশে দুলছে সবুজ ধানক্ষেত।

মাঠের একপাশে বিশাল বড় ডুমুর গাছ । গাছে একটা কাঠবিড়ালী বসে ডুমুরের ফল খাচ্ছে।হালকা বাতাসে মেঘলার ওড়না উড়ছে। দূরে বকের ডানা ঝাপটানোর শব্দ। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মেঘলা থমকে দাঁড়াল। মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে লম্বা একটি মেশিনের দিকে তাকিয়ে সে বলল,
-আচ্ছা , ওই পাইপের মতো জিনিসটা কী ?

রোহান হেসে বলল, -ওটা সেচের মেশিন। এই মেশিন দিয়েই পুরো ক্ষেতে পানি দেওয়া হয়। মেঘলা কৌতূহলী হয়ে বলল, -চল ,কাছ থেকে গিয়ে দেখি। মেঘলা ক্যানালের কাছে গিয়ে দেখল সূর্যের আলো পানির উপর পড়ে চিকচিক করছে।
ক্যানেলের ধারে কয়েকটি শালিক গোসল করছে।
ক্যানেলের পানি এতটাই স্বচ্ছ যে তলদেশ পর্যন্ত দেখা যায়।

মুগ্ধ হয়ে মেঘলা ধীরে পানির ভেতর হাত ডুবিয়ে দিল। শীতল স্পর্শে তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো।-কি ঠাণ্ডা আর পরিষ্কার!মনে হচ্ছে মনটাও ধুয়ে যাচ্ছে।
রোহান শান্ত স্বরে বলল, -এই পানিই আমাদের গ্রামের প্রাণ। এই মাটি,এই প্রকৃতি -সব মিলিয়ে আমাদের জীবন। বিকেলের আকাশে তখন রঙের খেলা শুরু হয়েছে। ঘরে ফিরে মেঘলা হলুদ শাড়ি, খোঁপায় গুঁজল লাল কৃষ্ণচূড়ার ফুল।

কপালে লাল টিপ, হাতে কাঁচের রেশমি চুড়ি। আজ সে যেন ফাল্গুনের‌ই এক রূপসী প্রতিচ্ছবি। বাইরে অপেক্ষা করছিল রোহান। মেঘলা বেরিয়ে আসতেই সে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে র‌ইল।-আজ মনে হচ্ছে ফাল্গুন তোমার জন্য‌ই এসেছে , মেঘলা রোহানের কথায় লাজুক হেসে বলল,

-আর তুমি না থাকলে এই ফাল্গুন কি এত সুন্দর লাগত ? দু’জনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল গ্রামের কাঁচা পথ ধরে। পুকুরের জল লালচে আকাশের ছায়া। দূরে কোকিলের ডাক । চারিদিকে শান্ত,মায়াময় পরিবেশ।

রোহান একটু চুপ করে থেকে বলল,
—মেঘলা, আজ তোমার জন্য একটা কবিতা লিখেছি। শুনবে?

মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল, -তুমি কবিতা লেখো নাকি ? আমাকে তো কখনো বলোনি!রোহান মৃদু হেসে বলল ,- তোমার সৌন্দর্য আর ফাল্গুনের এই
রূপ দেখে কবিতা নিজেই এসে গেছে । তারপর রোহান সে বলতে শুরু করল।

তোমার শাড়ির রঙ মেশে,
কৃষ্ণচূড়ার আগুন ফুল ।
তোমার খোঁপায় এসে হেসে,
ধানের ক্ষেতে বাতাস যেমন ।
নিঃশব্দে দোলে ভালোবেসে,
তেমনি করে তোমায় চাই।
সারাজীবন পাশে এসে,
এই মাটি , এই আকাশ,
এই কোকিলের গান –
সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়
তুমি, আমার ফাল্গুনের প্রাণ।

কবিতা শেষ হতেই বাতাস যেন আরও নরম হয়ে উঠল। মেঘলার চোখে লাজুক আলো, মুখে মৃদু হাসি। ফাল্গুনের রঙে রাঙা সেই সন্ধ্যায় তারা দু’জন বুঝে গেল ভালোবাসা মানে শুধু বলা নয়, পাশে থাকা।