ছোটগল্প~~নেতিবাচক কর্মের পরিণতি
কলমে- ইরি অতনু

শুরুটা আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে। মজুমদার বাড়ির বড় কর্তা দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন অতিশয় নীতিবান মানুষ। বড় ছেলে অনিমেষের জন্য তিনি সম্বন্ধ করে আনলেন পাশের গ্রামের এক অতি সাধারণ কিন্তু অসামান্য সুন্দরী মেয়ে অপর্ণাকে। অপর্ণা ছিল লক্ষ্মী প্রতিমার মতো; তার আগমনে বাড়িতে যেন শ্রী ফিরল। কিন্তু অনিমেষের মন ছিল অন্য কোথাও। সে মজে ছিল পাড়ার ধূর্ত এবং প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন মেয়ে পুষ্পিতার মোহে।
​পুষ্পিতা জানত, মজুমদার বাড়ির বিশাল সম্পত্তি আর প্রতিপত্তি দখল করতে হলে অনিমেষকে হাতের পুতুল বানাতে হবে। সে আড়ালে অনিমেষকে প্ররোচিত করতে শুরু করল। অনিমেষও পুষ্পিতার মায়াজালে পড়ে নিজের বিবাহিত স্ত্রীকে উপেক্ষা করতে শুরু করল। অপর্ণা শত লাঞ্ছনা সহ্য করেও সংসার আঁকড়ে পড়ে থাকত, কিন্তু অনিমেষের অমানবিকতা সীমা ছাড়িয়ে গেল। একদিন মাঝরাতে পুষ্পিতার পরামর্শে অনিমেষ অপর্ণাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল। দেবেন্দ্রনাথ হার্ট অ্যাটাক করলেন, কিন্তু অনিমেষের মনে কোনো করুণা হলো না। সে পুষ্পিতাকে বিয়ে করে বাড়ির এক অংশ দখল করে আলাদা হয়ে গেল।

​যৌথ পরিবারের শান্তি সেখানেই শেষ হলো। অনিমেষ আর পুষ্পিতা আলাদা হওয়ার পর মেজ ভাই প্রতীক এবং তার স্ত্রী সুচরিতার ওপর শুরু হলো মানসিক অত্যাচার। পুষ্পিতা সারাক্ষণ ভাবত, মেজ ভাই আর তার পরিবার কেন এত শান্তিতে থাকবে? সে সুচরিতার নামে মিথ্যা কুৎসা রটাতে শুরু করল। এমনকি বাড়ির ভৃত্যদের টাকা দিয়ে হাত করে প্রতীকের দরকারি নথিপত্র সরিয়ে দিত।
​পুষ্পিতার মূল লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ সম্পত্তি আত্মসাৎ করা। সে অনিমেষকে দিয়ে বারবার মামলা ঠুকতে লাগল। অনিমেষও অন্ধের মতো পুষ্পিতার কথা শুনত। তারা ভুলেই গিয়েছিল যে, এই মামলা-মোকদ্দমার বিষবাষ্প তাদের নিজেদের সন্তানদের ওপরও পড়ছে। তাদের দুই সন্তান—আকাশ আর বৃষ্টি বড় হতে লাগল এক অস্থির আর ঘৃণ্য পরিবেশে। তারা দেখল মা-বাবা সারাদিন শুধু টাকা আর ষড়যন্ত্র নিয়ে ব্যস্ত। তাদের কাছে সম্পর্কের সংজ্ঞা হয়ে দাঁড়ালো—’স্বার্থ’।

​সময় কারোর জন্য থেমে থাকে না। পঁচিশ বছরে অনিমেষ আর পুষ্পিতা অনেক টাকার মালিক হয়েছে। জালিয়াতি আর জমি দখল করে তারা ঝিনাইদহ শহরে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। আকাশ এখন বড় ব্যবসায়িক পার্টনার, আর বৃষ্টি উচ্চশিক্ষিত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এক সফল পরিবার। কিন্তু ভেতরে ভেতরে উইপোকা ধরেছিল তাদের সম্পর্কের ভিত্তিতে।
​পুষ্পিতার অহংকার তখন আকাশচুম্বী। সে ভাবত, “যাদের একসময় তুচ্ছ করেছি, আজ আমি তাদের চেয়ে অনেক উপরে।” কিন্তু শান্তি? শান্তি ছিল না। আকাশ আর বৃষ্টির মধ্যে কোনো ভাই-বোনের টান ছিল না। তারা একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করত। পুষ্পিতা তার সন্তানদের এতটাই স্বার্থপর করে গড়ে তুলেছিল যে, তারা এখন মা-বাবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

​হঠাৎ একদিন অতীতের ছায়া পুনরায় হানা দিল। আকাশ প্রেমে পড়ল এক তরুণীর, নাম তার তানিয়া। তানিয়া ছিল উগ্র আধুনিক এবং আকাশকেও ছাড়িয়ে ধূর্ত। পুষ্পিতা যখন জানতে পারল তানিয়া আসলে কোনো এক পুরনো শত্রুর আত্মীয়, তখন সে এই বিয়েতে বাধা দিল। কিন্তু আকাশ তো তারই রক্ত! সে পুষ্পিতাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিল, “তুমি যেভাবে নিজের সুখের জন্য দাদুকে কষ্ট দিয়েছ, বাবাকে দিয়ে ঘর ভেঙেছ, আমি ঠিক তেমনই করব। আমার জীবনে তোমার হস্তক্ষেপ সহ্য করব না।”
​পুষ্পিতা আর অনিমেষ স্তব্ধ হয়ে গেল। তাদেরই শেখানো বুলি আজ তাদের দিকেই ফিরে আসছে। আকাশ তানিয়াকে নিয়ে শুধু আলাদাই হলো না, সে বাবার ব্যবসার বড় একটা অংশ জালিয়াতি করে নিজের নামে লিখিয়ে নিল। ঝিনাইদহের যে লোকগুলো একসময় অনিমেষকে ভয় পেত, তারা এখন আড়ালে হাসাহাসি শুরু করল।

​পুষ্পিতা তবুও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে নিজের পরাজয় মেনে নিতে পারছিল না। সে এবার প্রতীকের ছেলেমেয়ের ক্ষতি করার পরিকল্পনা করল। প্রতীকের মেয়ে দিয়া এক স্বনামধন্য ডাক্তার। পুষ্পিতা মিথ্যে মেডিকেল অবহেলার অভিযোগ তুলে দিয়ার ক্যারিয়ার ধ্বংস করার চেষ্টা করল। কিন্তু বিধির বিধান ছিল অন্য। তদন্তে বেরিয়ে এল যে, এই অভিযোগের পেছনে যে ভুয়া প্রমাণগুলো দেওয়া হয়েছে, তা পুষ্পিতার নির্দেশে করা।
​এই কেলেঙ্কারি জানাজানি হতেই সামাজিক সম্মানের শেষটুকুও ধূলায় মিশে গেল। সমাজ থেকে তারা একঘরে হয়ে পড়ল। এমনকি যে পুষ্পিতা অন্যের ঘর ভাঙতে পারদর্শী ছিল, আজ তার নিজের মেয়ে বৃষ্টি বাড়ি ছেড়ে চলে গেল এক অজানার উদ্দেশ্যে। যাওয়ার আগে বৃষ্টি বলে গেল, “তোমাদের এই বিষাক্ত নরকে আমি আর থাকতে চাই না। তোমাদের পাপের ভাগীদার আমি হবো না।”

​আস্তে আস্তে মজুমদার ভিলার সেই অংশটা অন্ধকারে ডুবে গেল। অনিমেষ এখন শয্যাশায়ী। উচ্চ রক্তচাপ আর দুশ্চিন্তায় তার শরীর ভেঙে পড়েছে। তার পাশে বসে সেবা করার কেউ নেই। পুষ্পিতা সারাদিন বড় বড় ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। সে দেখে, মেজ ভাই প্রতীকের ছোট বাড়িটা আলোয় ঝলমল করছে। তাদের নাতনিদের হাসির শব্দ ভেসে আসছে। অথচ পুষ্পিতার এত ঐশ্বর্য, এত প্রতিপত্তি আজ কোনো কাজে আসছে না।
​সে বুঝতে পারল, অন্যের সুখ সহ্য করতে না পেরে সে আসলে নিজের দুঃখের পথটাই পরিষ্কার করেছে। যারা অন্যের পারিবারিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে অশান্তি সৃষ্টি করে, তারা ক্ষণিকের জন্য আনন্দ পেলেও শেষ পর্যন্ত তাদের একাকীত্বের দহনেই পুড়তে হয়।

​একটি ঝোড়ো রাত। ঝিনাইদহ শহরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। অনিমেষ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, কিন্তু পাশের ঘরে পুষ্পিতা একা বসা। সে আজ সম্পূর্ণ নিঃস্ব। তার ব্যাংক ব্যালেন্স আছে, কিন্তু এক গ্লাস জল দেওয়ার মতো আপন মানুষ নেই। আকাশ তাকে ফোন করে জানিয়েছে, সে বাড়িটা বিক্রি করে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। পুষ্পিতার আজ আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
​সেদিন বিকেলে সে দেখেছিল প্রতীকের পরিবারকে। তারা সবাই মিলে অপর্ণার আশ্রমে খাবার বিতরণ করতে গিয়েছে। যে অপর্ণার জীবন সে নষ্ট করেছিল, আজ সেই অপর্ণা শত শত অনাথ শিশুর মা। আর পুষ্পিতা? সে নিজের সন্তানের কাছেও আজ পরিত্যক্ত।
​পুষ্পিতা আয়নার সামনে দাঁড়াল। তার চেহারায় এখন আর সেই আভিজাত্য নেই, আছে কেবল কুটিলতার ছাপ। সে বুঝতে পারল, সে বাস্তবিক পক্ষে কোনোদিন সুখ লাভ করতে পারেনি। অন্যের ক্ষতি চেয়ে সে শুধু নিজের সন্তানদেরই অমানুষ করে গড়ে তুলেছে। আজ মৃত্যুর জন্য ভিক্ষা চাওয়া ছাড়া আর কোনো গতি নেই। কিন্তু প্রকৃতি তাকে সহজে মুক্তি দেবে না; এই তিল তিল করে মরাটাই তার দীর্ঘ সময়ের যন্ত্রণা।

​মজুমদার বাড়ির সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আজ এক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। অনিমেষ আর পুষ্পিতার নেতিবাচক কর্মের পরিণতি আজ তাদের দোরগোড়ায়। তারা প্রমাণ করেছে যে, অন্যের অমঙ্গল কামনা করলে নিজের মঙ্গল কোনোদিন স্থায়ী হয় না। মায়া, অনুভূতি, প্রেম, আবেগ—সবই তারা বিসর্জন দিয়েছিল টাকার লোভে। আজ টাকা আছে, কিন্তু মানুষের অভাব তাদের জীবনকে এক দুঃসহ নরকে পরিণত করেছে।
​এভাবেই প্রকৃতি তার হিসাব মিলিয়ে নেয়। দিন শেষে পাশে কেউ থাকে না, শুধু থাকে কৃতকর্মের পস্তানি। ঝিনাইদহ শহরের সেই অন্ধকার ঘরে বসে পুষ্পিতা এখন বুঝতে পারে—নিজের ক্ষতিটাই সে সবচেয়ে বেশি করেছে। এটিই প্রকৃতির অমোঘ এবং অসংশোধনীয় নিয়ম।

অন্যের অনিষ্ট চিন্তা করে কেউ কখনো স্থায়ী সুখ পায় না। নিজের মনের অন্ধকার অন্যকে পোড়ানোর আগে নিজেকেই ভস্মীভূত করে।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}