গল্প
“বিশ্বাস—জনি সিদ্দিক”
-‘ও সাথিরন বু, শুনোনা আমার কথা ? তুমি চিন্তা করে দ্যাখো তোমার মেয়েকে তুমি মানুষ করতে পারবেনা। তুমি আমার কাছে ওকে দাও। আর আমার ওপর বিশ্বাস রাখো, আমি ওকে লেখাপড়া, কাজকর্ম শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করে সুপাত্রের হাতে বিয়ে দিয়ে দিবো। মাসে মাসে তোমাকে টাকা পাঠাবো ! দয়া করে তুমি রাজি হওনা সাথিরন বু ? আমি কথা দিচ্ছি, তোমার মেয়েকে আমার নিজের ছেলেমেয়ের মতো করে রাখবো ! প্রতি বছরে দুইবার করে এখানে আনবো।’
আজ বড্ড মনে পড়ছে মেয়েটার কথা। মেয়েটা সেই কবে ঐ দূর ঢাকা শহরে গেছে ! দুই বছর হলো মেয়েকে চোখে দেখেননি সাথিরন বেওয়া। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেদিনকার চিত্র। কতো অনুনয়-বিনয় করে মোল্লা সাহেবের স্ত্রী তার একমাত্র মেয়েকে শহরে নিয়ে গিয়েছিলো। মনে না চাইলেও মেয়ের সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে মোল্লা সাহেবের স্ত্রীর কথায় বিশ্বাস করে তার হাতে মেয়েকে তুলে দিয়েছিলেন সাথিরন বেওয়া। স্বামীটা আজ থেকে চার বছর আগে মরণরোগে আক্রান্ত হয়ে নশ্বর দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। তারপর একমাত্র মেয়ে সুমাইয়াকে নিয়ে গ্রামে এর ওর বাড়িতে কাজ করে কোনো রকমে দিন কাটাতে থাকে। তখন ওর বয়স ছিলো আট বছর । এরপর যখন দশ বছর হলো তখন হঠাৎ করেই গ্রামের পরিচিত মোল্লা সাহেবের স্ত্রী কত আশা-আকাঙক্ষা দেখিয়ে ওকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তারা আর গ্রামে আসেননা। ফোনে বলেন ও খুব ভালো আছে। খুব সুন্দর ফুটফুটে চেহারা হয়েছে ! খুব ভালো পড়াশোনা করে। আমরা এবার গরমের ছুটি পেলেই গ্রামে আসবো। তাদের কথায় সাথিরন বেওয়া আশ্বস্ত হয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকেন। মেয়ের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকেন। কিন্তু মেয়ের দেখা পাননা ! আজ কেনো জানি পৃথিবীটাকে খুব কঠিন মনে হচ্ছে। সব কিছুকে মিথ্যা মনে হচ্ছে।
-‘এই ছেমড়ি ! কথা কানে যায়না ? এতোবড়ো হয়েছিস অথচ কাজের কোনো ছিরি পত্তর হয়না ক্যান ? খালি খাওয়া আর ঘুম পাড়া না ?’ গরম গলায় বললেন মিসেস মোল্লা। শরীরটা চার-পাঁচদিন যাবত ভালো যাচ্ছেনা সুমাইয়ার। এই বাড়ির মধ্যে আর ভালো লাগেনা। সবার চতুর্মুখী নির্যাতনে সে আর টিকতে পারছেনা ! কতদিন হলো মায়ের মুখ দেখেনি। কথা বলেনি। মায়ের কথা বললেই অকথ্য গালাগাল শুনতে হয়। উনাদের মোবাইলে টাকা থাকেনা ! অথচ মোল্লা সাহেবের ছেলেমেয়েরা সবসময় এর ওর সাথে কথা বলে। সারাদিনই কানে মোবাইল আর হেডফোন থাকে ! মায়ের কথা মনে পড়ায় চোখের কোণা দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। উনারা বলেন ওর মা নাকি ভালোই আছেন। কিন্তু উনাদের কথা সুমাইয়ার বিশ্বাস হয়না। সুমাইয়ার কাছে মনে হয় এদের চেয়ে আর মিথ্যাবাদী লোক বুঝি এই দুনিয়ায় আর কেউ নেই ! কারণ ওকে এতো কষ্টে রাখার পরেও ওর মায়ের কাছে বলে খুব সুখে আছে, ওর হ্যাংলা পাতলা শরীরটাও এখন নাদুস-নুদুস হয়েছে, ভালো লেখাপড়া শিখেছে, অনেক বড়ো হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি আরো কতো ডাহা মিথ্যা কথা ! আসলে মনে হয় এরা সত্য কথা বলতেই জানেনা ! দীর্ঘ দুইটা বছর নানা নির্যাতন সহ্য করে চলেছে সুমইয়া। মাঝে মাঝে এ বাড়ি ছেড়ে চলেও যেতে চেয়েছে । কিন্তু পারেনি। কারণ কোনো উপায় নেই ! সারাদিন ঘরে বন্দি হয়ে থাকতে হয়।
দীর্ঘ নির্যাতন শেষে সুমাইয়া আজ শ্রান্ত ক্লান্ত। ১০৩ ডিগ্রিরও অধিক তাপমাত্রার জ্বর গায়ে ! শরীরটা আজ আর উঠছেনা। কিন্তু তারপরেও পাষাণ মিসেস মোল্লা অমানুষের মতো কাপড় কাঁচতে বলছেন। কিন্তু চাইলেও সুমাইয়া সহজে উঠতে পারেনা। রেগে গিয়ে মিসেস মোল্লা পিঠের ওপর একটা লাথি দিয়ে বললেন কিরে নবাবজাদী, এখনো উঠিসনি ? বাধ্য হয়ে চোখদুটো ডলতে ডলতে বাথরুমের দিকে গেলো সুমাইয়া। কাপড় কাঁচার একপর্যায়ে বাথরুমের মেঝেতে পড়ে যায় সুমাইয়া। মোল্লা সাহেব গোসল করতে এসে সুমাইয়াকে দেখলেন। গায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠলেন। প্রচন্ড জ্বর। তাড়াতাড়ি কোলে তুলে নিয়ে ওর ঘরে শুঁইয়ে দিয়ে আপাতত একটা প্যারাসিটামল খাইয়ে দিলেন। আজ শুক্রবার। তাই তিনি তাড়াতাড়ি মসজিদে গেলেন।
সুন্নাতগুলো পড়ে ইমাম সাহেবের বাংলা বয়ান শোনার অপেক্ষা করছেন। ইমাম সাহেব যথাসময়ে মিম্বারে উঠে সবাইকে সালাম জানিয়ে আল্লাহ ও রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম প্রশংসা করে তার খুতবা শুরু করলেন।
-“প্রিয় হাজেরীন! আজকে শিশু দিবস। তাই আমি এ সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। হাজেরীন, আমাদের কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় হলো আমাদের ছোট্ট ছেলেমেয়ে-সন্তান। আমরা তাদেরকে বেশি ভালোবাসি কারণ শিশুদেরকে ভালোবাসা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামে’র সুন্নাত। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম শিশুদেরকে অত্যধিক ভালোবাসতেন। কেননা মহান আল্লাহ এ ব্যাপারে বলেছেন,-‘তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করোনা।’ এছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, -‘তোমাদের সন্তানদের মধ্যে সমতা রাখবে।’(বুখারি শরিফ) প্রিয় হাজেরীন, আর শিশুদের প্রতি ভালোবাসা শুধু নিজ সন্তানের জন্যই নির্ধারিত নয়। বরং এটা সকল আত্বীয়-অনাত্বীয়, ধনী-গরিব শিশুদের জন্যই সাব্যস্ত। সম্মানিত হাজেরীন, লক্ষ্য করুন, আমরা অনেকেই কিন্তু আমাদের বাসায়, দোকানে কাজের মানুষ হিসেবে ছোট ছেলেমেয়েদের রাখি। এদের অনেকেরই পিতা অথবা মাতা নেই। এদের বেশিরভাগই এতিম। তাই আমাদের উচিৎ তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, -‘তোমাদের মধ্যে যার আচরণ সুন্দর, কিয়ামতের দিন সে আমার সবচেয়ে কাছে থাকবে।’(তিরমিযি শরিফ) এছাড়াও মহান আল্লাহ বলেছেন,-‘তোমরা এতিমদেরকে গলাধাক্কা দিওনা !’ কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আমরা এতিম কাজের ছেলেমেয়েদের অত্যন্ত ঘৃণা করি। আমরা তাদেরকে লেখাপড়ার সুযোগ দেইনা। ভালো কাপড়-চোপড় ও ভালো খাবার দেইনা। একটু ভুল হলে তাদের মারধর ও গালাগালি করি ! এটা ঠিক নয়। যারা এরূপ করেন তাদের উপর আল্লাহর লা’নত পড়বে ! আপনারা গ্রাম থেকে তাদের পিতা-মাতাকে কতো আশা আকাক্সক্ষা আর প্রলোভন দেখিয়ে শহরে নিয়ে আসেন ! অথচ তা পালন করেননা ! কিন্তু গ্রামে তাদের অভিভাবক আপনাদের বিশ্বাস করে বড়ো আশা নিয়ে তাদের যক্ষের ধনকে এখানে পাঠায়। হাযেরীন, আপনারা কাজের লোকদের সঙ্গে ভালো আচরণ করবেন। অন্যথায় আল্লাহ অখুশি হবেন। আর আল্লাহ অখুশি হলে আপনার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, -‘যে দয়া করেনা, সে দয়া পায়না !’ অতএব যদি আপনারা দয়া না করেন তাহলে অপরের কাছ থেকে দয়া বা অনুগ্রহ পাবেননা !”
মোল্লা সাহেব ইমামের কথাগুলো খুবই মনোযোগ সহকারে শুনছেন। ইমাম সাহেবের কথাগুলো যেনো তাকে উদ্দেশ্য করেই বলা হচ্ছে বলে মনে করলেন। তার দু’চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরছে ! তিনি একি আচরণ করেছেন সুমাইয়ার সঙ্গে ? তার অন্তর অনুতাপে পুড়ছে ! নামায শেষ করেই তিনি দ্রুত বাসায় আসলেন। দেখতে পেলেন স্ত্রী-পূত্র-কন্যা সবাই যে যার মতো মোবাইল ও টিভি দেখায় মত্ত ! কিন্তু সুমাইয়া নেই। তাড়াতাড়ি সুমাইয়ার ঘরে গেলেন। সুমাইয়ার জ্বর আরো বেড়ে গেছে। জ্বরের তাড়নায় কাঁপছে ! দ্রুত কোলে করে পাশের ক্লিনিকে নিয়ে গেলেন। কর্তব্যরত ডাক্তার অবস্থা শোচনীয় বলে জানালেন। মোল্লা সাহেব চিন্তায় পড়ে গেলেন ! তবে ইচ্ছে করেই বাসার কাউকে কিচ্ছু জানালেননা ! একঘন্টা পর। ডাক্তার জানালেন -‘আর সম্ভব নয়। আই অ্যাম সরি !’ মোল্লা সাহেব ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ভাবছেন তিনি এখন ওর মায়ের কাছে কি জবাব দিবেন ? তিনি একি করলেন ? গাঁয়ের একটি সহজ সরল মেয়েকে এভাবে বিনা অপরাধে গলা টিপে হত্যা করলেন !? একটা মায়ের বিশ্বাসকে এভাবে খুন করলেন ?! তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন !
ক্লিনিকটি বেসরকারি হওয়ায় একটি অপরাধের তদন্ত করতে সেখানে ঘটনাক্রমে একজন গোয়েন্দা পুলিশ উপস্থিত ছিলেন। তিনি বিষয়টি লক্ষ্য করেন এবং প্রথমত ডাক্তারের সঙ্গে তারপর মোল্লা সাহেবের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বললেন। সব জানার পর তিনি চুপি চুপি থানায় ফোন করে পুলিশ এনে মোল্লা সাহেবকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে গেলেন ! কিন্তু তখনো বাসার সবাই টিভি দেখায় মত্ত !!