গল্প ..দোয়ার আলো
লেখক .. রাশেদুল ইসলাম হৃদয়

গ্রামের নাম মূলগ্রাম। ভোরের আলো ফুটতেই আজান ভেসে আসে মসজিদের মিনার থেকে। সেই আজানের শব্দে প্রতিদিনের মতোই ঘুম ভাঙে হামিদুলের। সে খুব সাধারণ একজন ছেলে—বয়স কম, স্বপ্ন বড়। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার ছোট্ট দোকানে সাহায্য করে। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল আল্লাহর উপর অগাধ ভরসা।
হামিদুল ছোটবেলা থেকেই দোয়ার গুরুত্ব বুঝত। মা তাকে বলতেন,
“বাবা, মানুষের দরজা বন্ধ হলে আল্লাহর দরজা খোলা থাকে। শুধু মন থেকে চাইতে জানতে হয়।”
একদিন গ্রামে বড় একটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো। এই পরীক্ষায় ভালো ফল করলে শহরে পড়ার সুযোগ মিলবে। হামিদুলের জন্য এটি ছিল জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ। কিন্তু পরীক্ষার দিন যত ঘনিয়ে আসছিল, তার দুশ্চিন্তাও তত বাড়ছিল। টাকার অভাব, পুরোনো বই, আর নিজের ওপর অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে সে ভীষণ ভেঙে পড়েছিল।
পরীক্ষার আগের রাতে সে মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ল। নামাজ শেষে হাত তুলে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে দোয়া করল,
“হে আল্লাহ, আমি জানি আমার শক্তি খুব কম। কিন্তু তুমি সব কিছুর মালিক। তুমি যদি চাও, অসম্ভবও সম্ভব হয়ে যায়।”
পরদিন পরীক্ষা শেষ হলো। প্রশ্নগুলো তার কাছে কঠিন লেগেছিল। বেরিয়ে এসে সে আর কোনো কথা বলল না। শুধু মনে মনে বলল, “আল্লাহ যা ভালো মনে করবেন, তাই হবে।”
দিন গড়িয়ে সপ্তাহ পার হলো। ফলাফল ঘোষণার দিন গ্রামের স্কুলের সামনে মানুষের ভিড়। হামিদুল ভয়ে তালিকা দেখতে সাহস পাচ্ছিল না। ঠিক তখনই তার এক বন্ধু দৌড়ে এসে বলল,
“হামিদুল! তোর নাম আছে! শুধু আছে না—তুই প্রথম!”
মুহূর্তের মধ্যে হামিদুলের চোখ ভিজে উঠল। সে মাটিতে বসে পড়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। তার মনে পড়ল সেই রাতের দোয়া, সেই অশ্রু ভেজা নামাজ। সে বুঝতে পারল—আল্লাহ কখনো দোয়া ফিরিয়ে দেন না, শুধু সময়টা নিজের মতো ঠিক করেন।
শহরে পড়তে গিয়েও হামিদুল বদলে যায়নি। নামাজ, দোয়া আর সততা—এই তিনটাকেই সে জীবনের মূল শক্তি বানাল। বড় হয়ে সে একদিন সফল মানুষ হলো। কিন্তু গ্রামের মানুষ আজও তাকে সবচেয়ে বেশি সম্মান করে এই কারণে যে, সে সাফল্যের শিখরে গিয়েও আল্লাহকে ভুলে যায়নি।
হামিদুল প্রায়ই বলত,
“আমি কিছুই নই। সবই দোয়ার বরকত। যে দোয়ার ওপর ভরসা রাখে, সে কখনো একা থাকে না।”

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}