ছোটগল্প~ নিয়তির বাঁধন~
কলমে- ইরি অতনু

 

সন্ধ্যা নেমেছে। শহরের কোলাহল একটু যেন থিতিয়ে

এসেছে। কফির মগ হাতে জানলার পাশে বসে আছে

অর্ণব।

 

বিগত কয়েকটা বছর তার কাছে ছিল কেবল এক ধূসর

ক্যানভাস। নিজের একার জগতে সে যেন একাকী

নাবিক, যার কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। তার জীবনে ছিল

না কোনো বিশেষ রং, ছিল না কোনো উদ্ভাস। কেবল

একঘেয়ে পথে একা হেঁটে চলা।

​অর্ণব মনে মনে একটি ভালোবাসার সন্ধান করছিল— এমন এক বাঁধন যা তার এই শূন্যতা পূরণ করতে পারে।

কিন্তু প্রতিবারই তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, বারবার অনুভব

করেছে একাকীত্বের শীতল স্পর্শ।

​সেদিন ছিল একটি সাহিত্য উৎসব। বইয়ের গন্ধ আর

গুঞ্জনের মাঝে অর্ণব দেখল তাকে। ভিড়ের মধ্যে যেন

সে এক টুকরো স্নিগ্ধ আলো। তার নাম তিশা। হাসলে

তার ডান গালে একটি ছোট্ট টোল পড়ে, যা অর্ণবের

হৃদয়ে এক মিষ্টি সুরের জন্ম দিল। প্রথম দেখাতেই

অর্ণবের মনে হলো, ‘এ তো সেই মুখ, যাকে আমি

এতকাল ধরে খুঁজছিলাম।’

​একটু দ্বিধা নিয়ে অর্ণবই প্রথম কথা বলল। তিশার সঙ্গে

কথা বলার পর তার মনে হলো যেন এক অচেনা উষ্ণতা

তাকে জড়িয়ে ধরছে। তিশার সহজ হাসি, তার গভীর

চিন্তাধারা— সবকিছুই অর্ণবের একাকী জীবনে যেন এক

নতুন পথের ইঙ্গিত দিল।

​দ্রুতই তারা একে অপরের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে

উঠলো। অর্ণবের দিনলিপি এখন তিশাকে ঘিরেই।

সকালে উঠে তাকে একটি শুভদিনের বার্তা পাঠানো,

সারা দিন কাজের ফাঁকে তার খবর নেওয়া, আর রাতে

তার সঙ্গে তার ভালো লাগার গল্প শোনা— এ যেন এক

নতুন অভ্যাস, এক সুন্দর আসক্তি।

​”আমার এই একা পথ চলায় তুমি যে কখন সঙ্গী হলে,

আমি টেরও পাইনি, তিশা,” একদিন অর্ণব বলেছিল।

​তিশা হেসে বলেছিল, “আমিও কি জানতাম, অর্ণব?

মনে হয় নিয়তিই আমাদের কাছে টেনে এনেছে।

আমারও সারা দিনের ব্যস্ততা এখন তোমাকে ঘিরেই।”

​তিশাকে ঘিরেই এখন অর্ণবের সব স্বপ্ন। একসাথে একটা

ছোট্ট নীড় গড়ার স্বপ্ন, দুজন মিলে নতুন কোনো জায়গায়

ঘুরতে যাওয়ার স্বপ্ন। তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

মানুষটি আজ তিশা।

​অর্ণব প্রায়ই ভাবে, সে ভালোবাসা খুঁজতে গিয়েছিল,

আর পেয়েছে তিশাকে— যে তার জীবনের সবথেকে

মূল্যবান সম্পদ। এক সন্ধ্যায়, তারা যখন হাতে হাত

রেখে তারা দেখছিল, অর্ণব ফিসফিস করে বলল,

“তিশা, তোমাকে আমি সাত জন্মেও হারাতে চাই না।

কখনো ছেড়ে যাব না তোমায়।”

​তিশা অর্ণবের হাত শক্ত করে ধরে, তার কাঁধে মাথা

রাখল। “আমিও না, অর্ণব। এই নিয়তির বাঁধন যেন

কোনোদিন না টুটে।”

​অর্ণবের জীবনের ধূসর ক্যানভাস এখন তিশার

ভালোবাসার রঙে উজ্জ্বল, বর্ণিল। একাকীত্বের পথ আজ

ভালোবাসার সুবাসে ভরা। অর্ণব জানে, তার জীবনের

সবচেয়ে সুন্দর উপহার এই বাঁধন, আর সে এই

উপহারকে চিরকাল আগলে রাখবে।