“শরীয়তকে ভুলে গণতন্ত্রকে ধারণ করা একটি আত্মঘাতী পথ”
আবু সাঈদ
হে মুসলিম উম্মাহ! ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখুন, প্রতিটি শব্দের উচ্চারণে এ কথাই ধ্বনিত হয় একমাত্র শরীয়তই নিরাপত্তার আশ্রয়,আর গণতন্ত্র কেবলই এক ক্ষণস্থায়ী মরীচিকা। অথচ আজকের মুসলিম উম্মাহ,সেই মরীচিকার পেছনে দৌড়াচ্ছে। এই দৌড়ের পথটি যে কতটা বিপদসংকুল, তা বুঝতে আমাদের খুব বেশি দূর তাকানোর প্রয়োজন নেই। আল্লাহর আইনকে পিছনে ঠেলে দিয়ে মানুষের তৈরি ভোটকেন্দ্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেন নিজের হাতেই ধ্বংসের আগুন প্রজ্জ্বলন।
●”গণতন্ত্র: মানুষের সৃষ্টি একটি বিভ্রান্তিকর মায়া”
গণতন্ত্র হল মানুষের দ্বারা মানুষের জন্য আইন প্রণয়ন। এ ব্যবস্থায় আইন কলমের ডগায় নয়,বরং ভোটের বাক্সে তৈরি হয়। বাংলাদেশ মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ, কিন্তু গণতন্ত্রের নামে পশ্চিমা প্রভাবে শরীয়তকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ফ্যামিলি ল, ইনহেরিটেন্স -সবকিছুতে মানুষের আইন প্রাধান্য পায়। কখনো কি আপনি ভেবে দেখেছেন, মানবসৃষ্ট আইন যখন পারিবারিক জীবনের প্রতিটি অঙ্গীকারকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন কতখানি পবিত্রতা আমরা হারিয়ে ফেলি? ইসলাম আপনাকে পরিবারে ন্যায়বিচার শিখিয়েছে; কিন্তু গণতন্ত্র সেই সুন্দর বাগানে আগাছা ও বিষ চালিয়ে দিচ্ছে। যদি ভাবেন গণতন্ত্রে তো স্বাধীনতা আছে তবে মনে রাখুন, সেই স্বাধীনতা মদ বিক্রয়ের, জুয়ার টেবিল বসানোর, ট্রানজেন্ডারদের অনুমোদনে,ব্যভিচারের স্বীকৃতির। আর এই স্বাধীনতার আঘাত পড়বে আমার আপনার ভবিষ্যতের বিশ্বাসী সন্তানের উপর। এটি হলো জাহিলিয়্যাহর পুনরাবৃত্তি। রাসূল (সা.) বলেছেন:
“অবশ্য অবশ্যই তোমরা তোমাদের আগের লোকেদের নীতি-পদ্ধতিকে বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে অনুকরণ করবে। এমনকি তারা যদি দবের গর্তে ঢুকে, তাহলে তোমরাও তাদের অনুকরণ করবে। ”
(সহীহ বুখারী: ৭৩২০)
গণতন্ত্রে মানুষ নিজেরাই আইন প্রণয়ন করে, যা আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আইন প্রণয়নের অধিকার কেবল আল্লাহর।”
(সূরা ইউসুফ: ৪০)
● শরীয়ত থেকে বিচ্যুতি
ইতিহাস যেন এক রক্তাক্ত আয়না, যাতে প্রতিফলিত হয় শরীয়ত ত্যাগের ভয়ানক পরিণতি। শরীয়ত থেকে বিচ্যুতির এখানে কিছু উল্লেখ করলাম:
১.আন্দালুসিয়ার পতন (১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ) ঘটে যখন মুসলিম শাসকরা অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও শরীয়ত থেকে বিচ্যুতির কারণে দুর্বল হয়ে পড়েন, ফলে খ্রিস্টানরা গ্রানাডা দখল করে।
২.ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ দিনগুলো (১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ) স্মরণ করেন যখন শরীয়তকে দুর্বল করে ব্রিটিশের সেক্যুলার আইন গ্রহণ করা হল, তখন সিপাহী বিদ্রোহের আগুনে মুসলিম শাসন পুড়ে ছাই হয়ে গেল, এবং উপনিবেশবাদের অন্ধকার শৃঙ্খল বেঁধে দিল।
৩.তুরস্কের খিলাফতের পতন (১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ) উসমানী খিলাফতের শেষ দিনে কামাল আতাতুর্ক সেক্যুলার গণতন্ত্র চাপিয়ে দেন, শরীয়তকে উচ্ছেদ করে সুইস সিভিল কোড গ্রহণ করেন। ফলে মুসলিম উম্মাহ বিভক্ত হয়ে পড়ে, পশ্চিমা শক্তি মধ্যপ্রাচ্য দখল করে যেন এক সোনালি সাম্রাজ্যের দেহ থেকে আত্মা উড়ে গেল। আজও তুরস্কের সেক্যুলারিজম ইসলামী পরিচয়কে দমিয়ে রেখেছে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিচয়ের সংকট জন্ম দিয়েছে।
৪.পাকিস্তানের সেক্যুলার সংস্কার ও হুদুদ অধ্যাদেশ (১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ) যদিও ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত, জেনারেল জিয়া-উল-হকের আগে সেক্যুলার আইনের প্রভাবে শরীয়তকে দুর্বল করা হয়। পরে হুদুদ অধ্যাদেশ চাপিয়ে দেওয়া হলেও, এর অসম্পূর্ণতা সন্ত্রাসবাদ ও বিভাজন জন্ম দিয়েছে। ফলে পাকিস্তান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত, যেন শরীয়তের অর্ধেক আলোয় অন্ধকার ছড়িয়েছে।
৫.ইরানের সেক্যুলার যুগের অবসান (১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ): শাহের সেক্যুলার রাজত্বে শরীয়তকে উপেক্ষা করায় ইসলামী বিপ্লব ঘটে, কিন্তু তার আগের বিচ্যুতি অর্থনৈতিক অসমতা ও সামাজিক অশান্তি বাড়িয়েছে। আজ ইরানের থিওক্র্যাসি সংকটে ডুবে আছে, যা দেখায় শরীয়ত ত্যাগের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি।
এসব আমাদের জন্য এক আয়না। আজকের যুবকরা গণতন্ত্রকে “জনগণের শক্তি” বলে প্রচার করে, কিন্তু ভুলে যায় যে সত্যিকারের শক্তি আল্লাহর।
কুরআনের শব্দ সরল ও স্পষ্ট:
“আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, সে অনুযায়ী যারা বিচার ফায়সালা করে না তারাই কাফির।”
(আল-মায়েদা-৪৪)
এই আয়াত কেবল সতর্কতা নয়, বরং চরম সত্যের ঘোষণা। আপনার হৃদয়ে আর আত্মায় এই বাস্তবতা প্রতিধ্বনিত হোক।
●”শরীয়তের সার্বভৌমত্ব: ইসলামের মূল ভিত্তি”
ইসলামে শাসনব্যবস্থা আল্লাহর হুকুমের উপর নির্ভরশীল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীন থেকে এমন কিছু গ্রহণ করে যা তার অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।”
(সহীহ বুখারী: ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম: ১৭১৮)
পূর্বের ইতিহাসে চোখ রাখুন, দেখুন খিলাফতে রাশিদাহ ( ৬৩২-৬৬১খ্রিস্টাব্দ)-এ হযরত আবু বকর (রা.),হযরত উমর (রা.),হযরত উসমান (রা.) ও হযরত আলী (রা.) শুধুমাত্র কুরআন-হাদিস অনুসারে শাসন করেছেন।
হযরত উমর (রা.)-এর শাসন আমলে যখন কোনো বিষয়ে মতভেদ হতো, তিনি বলতেন: “আল্লাহর কিতাবে যা আছে তাই অনুসরণ করো।”
এই শরীয়তভিত্তিক শাসনের ফলে ইসলামী সাম্রাজ্য পারস্য থেকে স্পেন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। কিন্তু আমাদের সংবিধানে গণতন্ত্রকে প্রধান করে শরীয়তকে পাশ কাটানো হয়েছে। এটি সেই কাফিরদের অনুসরণ যাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করেছেন:
“তারা কি তবে জাহিলিয়্যাতের বিধান চায়? আর নিশ্চিত বিশ্বাসী কওমের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে কে অধিক উত্তম?”
(সূরা আল-মায়িদাহ: ৫০)
● “শরীয়ত: মানবতার শান্তির কপাটখোলা বসন্ত”
শরীয়ত কেবল শাসনব্যবস্থার নয়;এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি জীবনকে কাঠামো দেয়, শান্তি দেয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শাসন ছিল এই শরীয়তের উপর দাঁড়ানো। তাঁকে কেউ মুকুট পরিয়ে দেয়নি, ভোটে নির্বাচিত করেনি; তাঁকে নির্বাচিত করেছেন আল্লাহ।
হযরত উমর (রা.) যখন শাসন করতেন, তখন তাঁর বিচারালয়ে কোনো দরবারি ভাষা ছিল না, ছিল সত্যের ঈমানদারি উচ্চারণ। তিনি বলেছিলেন:
“যদি ইউফ্রাত নদীর ধারে কোনো ছাগলও ক্ষুধায় মারা যায়, উমর তার হিসাব দেবে।”
এই হচ্ছে শরীয়তের সেই সৌন্দর্য, যা কেবল আইন নয়; বরং মানব হৃদয়ে রচিত এক মুসাফির কবিতা।
●” ইতিহাসের আয়নায় আমদের দেশ: ভুলে যাওয়া বাস্তবতা”
১৯৭১-এর পরে প্রণীত সংবিধানে ‘সেক্যুলারিজম’কে আমরা আলিঙ্গন করেছিলাম গৌরব বলে। অথচ সেই সেক্যুলারিজম, গণতন্ত্র আজ আমাদের কুরআনবিহীন আদালতে, আলেমদেরকে জঙ্গি ট্যাগ দেওয়াতে, নিষিদ্ধ সুদের ব্যাংকে, ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ট্রানজেন্ডারদের স্বীকৃতি দেওয়ার অনুমোদনে, নগ্নতা অনুমোদিত পর্দায় নিয়ে এসেছে।
ইউরোপে যখন ইসলামিক খিলাফত পতন হলো,একটুও ভুলে যাবেন না সেই পতনের পেছনে ছিল শরীয়ত থেকে বিচ্যুতি, গণতন্ত্রের অন্ধ অনুসরণ অনুকরণ, পশ্চিমাদের আদর্শের বন্দিত্ব। আজকের বাংলাদেশ সেই পথেই হাঁটছে, তবে একদিন হয়তো খামখেয়ালি ঝড়েই ভেঙে পড়বে বিশ্বাসের ভিত্তি, আর কালের খাতায় লিখিত থাকবে, একদা মুসলিম জনপদ ছিল।
হে পাঠক, নিজেকে প্রশ্ন করুন। আর ভাবুন আপনি কি আল্লাহর আইনকে পরিপূর্ণভাবে মেনে চলছেন, নাকি মানুষের তৈরি আইন মেনে নিজেকে নিরাপদ ভাবছেন? গণতন্ত্রে ভোটার সংখ্যা আপনি বদলাতে পারেন, কিন্তু কিয়ামতের দিন আপনার হিসাব বদলাতে পারবেন তো?
আজকে আমরা চাই খিলাফত, কিন্তু সেটি স্লোগানে আসে না। যদি আসে তখন হৃদয় থেকে মুছে যাবে মানুষের আইন, আর জায়গা করে নেবে আল্লাহর হুকুম।
তাই আজই ফিরে আসুন শরীয়তের পথে, বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আলোকোজ্জ্বল শরীয়তের পথ, অন্যদিকে বিভ্রান্তির গণতন্ত্র। পরিবর্তনের সময় এখনই। আজই আপনার জীবনকে এবং সমাজকে শরীয়তের শাসনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করুন। এটিই প্রকৃত মুক্তি, সত্যিকারের স্বাধীনতা।
আল্লাহর কাছে বিশেষ প্রার্থনা:
“হে আল্লাহ! আমাদেরকে সেই পথে চালাও, যেটি তোমার সন্তুষ্টির, আর রক্ষা করো আমাদের জাতিকে সেই পথ থেকে, যেটি ধ্বংসের দ্বার উন্মোচন করে।”
আল্লাহ পরিবাবর্তনকারী। তাঁর প্রতি ভরসা রাখুন, তবেই জীবন মুসাব্বির হয়ে উঠবে রবের নূরানীতে আলোকিত।
আপনি কি প্রস্তুত এই পথে হাঁটার জন্য?