মুখস্থ বিদ্যায় জ্ঞানের বিস্তার ও সীমাবদ্ধতার বিশ্লেষণ
মোঃ জাহিদুল ইসলাম জাহিদ
মানুষের সভ্যতার অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো জ্ঞান। কিন্তু সেই জ্ঞানের প্রকৃতি, অর্জনের পদ্ধতি এবং তার ব্যবহার নিয়ে বহুদিন ধরেই বিতর্ক বিদ্যমান। আমরা কি সত্যিই জ্ঞান অর্জন করছি, নাকি শুধু তথ্য মুখস্থ করে নিজেদেরকে শিক্ষিত বলে মনে করছি? এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে, যেখানে মুখস্থ বিদ্যার প্রাধান্য এখনো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।
মুখস্থ বিদ্যা বা রট লার্নিং এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে শিক্ষার্থী কোনো বিষয় না বুঝেই বারবার পড়ার মাধ্যমে তা মনে রাখে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য এই পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে, কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা অত্যন্ত স্পষ্ট। কারণ মুখস্থ করা তথ্যের সাথে বাস্তব জীবনের কোনো সংযোগ থাকে না। ফলে শিক্ষার্থী যখন বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হয়, তখন সে সেই মুখস্থ জ্ঞান প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়।
আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত যে ছাত্র পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে, সে-ই মেধাবী। এই ধারণা শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন একটি পথে নিয়ে গেছে, যেখানে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং প্রশ্ন করার মানসিকতা ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। একটি শিশুকে ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর। তাকে বলা হয় এটাই ঠিক, এটাই লিখতে হবে। ফলে তার চিন্তাশক্তি একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে যায়।
অথচ প্রকৃত শিক্ষা কখনোই গণ্ডিবদ্ধ নয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে শেখার কোনো শেষ নেই। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, যুক্তি খুঁজতে শেখায়, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিজস্ব চিন্তা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এই শিক্ষার মাধ্যমে একজন মানুষ শুধু তথ্য সংগ্রহ করে না, বরং সেই তথ্যকে বিশ্লেষণ করে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।
উন্নত রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তারা মুখস্থ বিদ্যার উপর নির্ভরশীল নয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেওয়া হয় প্রশ্ন করতে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে এবং নিজের মতো করে চিন্তা করতে। তাদের পাঠ্যক্রমে বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের উপর জোর দেওয়া হয়। ফলে তারা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফলই করে না, বরং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করে।
এর বিপরীতে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো অনেক ক্ষেত্রে একই ধরণের সিলেবাস বছরের পর বছর ধরে চালু রয়েছে। শিক্ষকরা অনেক সময় সেই নির্দিষ্ট বইয়ের বাইরে যেতে আগ্রহী হন না। ফলে শিক্ষার্থীরা নতুন কিছু জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। যদিও সব শিক্ষক একরকম নন অনেক শিক্ষক আছেন যারা নিজেদের উন্নত করেছেন, নতুন পদ্ধতিতে পড়াচ্ছেন এবং শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করছেন। কিন্তু এই সংখ্যা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
মুখস্থ বিদ্যার একটি বড় সমস্যা হলো এটি শিক্ষার্থীর ধৈর্য বাড়ালেও তার চিন্তাশক্তিকে সীমাবদ্ধ করে। একজন ছাত্র হয়তো দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা করে অনেক কিছু মুখস্থ করতে পারে, কিন্তু সে যদি সেই জ্ঞানের অর্থ না বোঝে, তাহলে তা কোনো স্থায়ী মূল্য বহন করে না। পরীক্ষার পর সেই জ্ঞান খুব দ্রুতই ভুলে যায়।
অন্যদিকে, যে শিক্ষা বোঝার উপর ভিত্তি করে, তা দীর্ঘস্থায়ী হয়। কারণ মানুষ যা বোঝে, তা সহজে ভুলে যায় না। বরং সে সেই জ্ঞানকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে পারে। এই প্রয়োগের মাধ্যমেই নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি হয়, যা আবার নতুন জ্ঞানের জন্ম দেয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে সার্টিফিকেটের মূল্য কতটুকু? আমাদের সমাজে সার্টিফিকেটকে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়। একটি ভালো ফলাফল, একটি ভালো ডিগ্রি এগুলোকে সফলতার মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধুমাত্র সার্টিফিকেট একজন মানুষকে দক্ষ করে তোলে না। দক্ষতা আসে অভিজ্ঞতা থেকে, বিশ্লেষণ ক্ষমতা থেকে এবং সৃজনশীল চিন্তা থেকে।
অনেক সময় দেখা যায়, একজন ছাত্র বহু সার্টিফিকেট অর্জন করেও বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করতে পারে না। কারণ সে কখনো শিখেনি কিভাবে চিন্তা করতে হয়, কিভাবে নতুন কিছু তৈরি করতে হয়। তার শিক্ষা ছিলো শুধুমাত্র মুখস্থ নির্ভর।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন। প্রথমত, পাঠ্যক্রমকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু তথ্য মুখস্থ না করে, বরং তা বুঝতে পারে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের উপর জোর দিতে হবে, যাতে তারা আধুনিক পদ্ধতিতে পড়াতে পারেন। তৃতীয়ত, পরীক্ষার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে, যেখানে শুধু মুখস্থ জ্ঞান নয়, বরং বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও সৃজনশীলতাকে মূল্যায়ন করা হবে।
একই সাথে, অভিভাবকদের মনোভাবেও পরিবর্তন প্রয়োজন। তারা অনেক সময় সন্তানের ভালো ফলাফলকেই একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে দেখেন। কিন্তু সন্তানের প্রকৃত শিক্ষা ও দক্ষতার দিকে নজর দেওয়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে স্বাধীন করে, তাকে নতুন কিছু ভাবতে শেখায় এবং সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম করে। অন্যদিকে, মুখস্থ বিদ্যা মানুষকে নির্ভরশীল করে তোলে সে সবসময় নির্দিষ্ট নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকে।
অতএব, বলা যায় মুখস্থ বিদ্যা কখনোই প্রকৃত শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না। এটি একটি সীমাবদ্ধ পদ্ধতি, যা সাময়িক সাফল্য দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তি ও সমাজের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে।
আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত হবে, চিন্তার স্বাধীনতা থাকবে এবং প্রতিটি শিক্ষার্থী তার নিজস্ব মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ পাবে।
শেষ পর্যন্ত, জ্ঞানের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে তার প্রয়োগের উপর। যে জ্ঞান মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, নতুন পথ দেখায় এবং সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় সেই জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান। আর সেই জ্ঞান অর্জনের জন্য আমাদের মুখস্থ বিদ্যার খাঁচা থেকে বেরিয়ে এসে চিন্তার মুক্ত আকাশে উড়তে শিখতে হবে।
আগামী ৩১ জুলাই www.shapno24.com এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হবে।
নিজের নাম দিয়ে আকর্ষণীয় Greeting Card তৈরি করুন।
Greeting Card তৈরি করুন