
পথশিশুদের স্বপ্নপূরণে লিডোর ভোকেশনাল ট্রেনিং: দক্ষতায় বদলাচ্ছে জীবন
মাসুদ মাহাতাব,ঢাকা
লোকাল এডুকেশন এন্ড ইকোনোমি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (লিডো) ২০০০ সাল থেকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর অনুমোদনক্রমে দেশের সবচেয়ে অবহেলিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথশিশুদের সুরক্ষা, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও পুনর্বাসনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা শিশুদের উদ্ধার, পরিবারে পুনর্মিলন, পুনর্বাসন, মোবাইল স্কুল, পথশালা ও বহুমুখী মানবিক সহায়তার মাধ্যমে লিডো দীর্ঘদিন ধরে মানবিক সেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে।
এই ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে, স্টেশন ও বাস টার্মিনালে অবহেলায় ও যত্নহীন অবস্থায় বসবাসরত কর্মহীন কিশোর-কিশোরীদের স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী করে তুলতে Verein Hilfe Für Bangladesch ও Chairman Salim Howlader -এর সহযোগিতায় লিডো চালু করেছে দক্ষতা উন্নয়ন ভিত্তিক ভোকেশনাল ট্রেনিং।
এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে পথবাসী কিশোর-কিশোরীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে মোবাইল সার্ভিসিং, সেলাই, ইলেকট্রনিক হাউজ ওয়্যারিং এবং আইসিটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণের মতো যুগোপযোগী ও কর্মসংস্থানমুখী কারিগরি বিষয়ে।
কেবল প্রশিক্ষণ প্রদানেই সীমাবদ্ধ নয় লিডোর এই উদ্যোগ। প্রশিক্ষণকালীন সময়ে প্রতিটি কিশোর-কিশোরীর জন্য নিশ্চিত করা হয় নিরাপদ আবাসন, চার বেলা পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা সেবা, বিনোদনের ব্যবস্থা ও নতুন পোশাক। লিডোর দৃঢ় বিশ্বাস একটি শিশুর জীবন বদলাতে হলে শুধু দক্ষতা শেখানো যথেষ্ট নয়; তাকে দিতে হবে নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ।
এই প্রকল্পের বিশেষত্ব হলো, প্রশিক্ষণ শেষে শিশুদের একা ছেড়ে দেওয়া হয় না। কোর্স সম্পন্ন করার পর তাদের চাকরির ব্যবস্থা ও সহযোগিতা করা হয় পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রাথমিক মূলধন সরবরাহ করা হয়। এমনকি কর্মজীবনে স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত লিডো নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে পাশে থাকে একজন অভিভাবকের মতো।
ভোকেশনাল ট্রেনিং এর সেলাই প্রশিক্ষণ বিভাগের শিক্ষার্থী অন্তরা আজ তার জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু করেছে। বর্তমানে সে কুমিল্লার স্বনামধন্য জেবি নেটওয়ার্কস কো. লিমিটেড গার্মেন্টসে একজন অপারেটর হিসেবে কর্মরত।
অন্তরা জানায়,
“বাবা-মা হারিয়ে স্টেশনে থাকার সময় আমার জীবন ছিল চরম অনিশ্চয়তায় ভরা। প্রতিটি রাত ছিল ভয়ংকর। লিডো আমাকে নিরাপদ আশ্রয় ও সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দিয়েছে সেখান থেকেই আমার জীবনে আলো ফিরে আসে। আজ আমি কাজ করি, সম্মান নিয়ে বাঁচি, ভালোবেসে বিয়ে করেছি এবং নিজের সংসার গুছিয়ে নিচ্ছি।”
একইভাবে, ১৭ বছর বয়সী রাহুল, যে শৈশব থেকেই স্টেশন ও বাস টার্মিনালে বেড়ে উঠেছে বাবা-মায়ের স্নেহহীন জীবনে। দুই বেলা খাবারের জন্য ভিক্ষা কিংবা কুলির কাজই ছিল তার দৈনন্দিন বাস্তবতা। লিডোর ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের মোবাইল সার্ভিসিং বিভাগে প্রশিক্ষণ নিয়ে আজ সে গুলিস্তানের একটি মোবাইল সার্ভিসিং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
কিশোর রাহুল বলেন
“লিডোর সহায়তা না পেলে হয়তো আমি আজও রাস্তায় থাকতাম। এখন আমি নতুন করে বাঁচতে শিখছি।”
লিডোর এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো অবহেলায় ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পথে পড়ে থাকা শিশুদের কারিগরি দক্ষতার মাধ্যমে জীবনমান উন্নয়ন করে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা। লিডো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, প্রতিটি শিশুর ভেতরেই লুকিয়ে আছে অসীম সম্ভাবনা ও প্রতিভা। প্রয়োজন শুধু সময়মতো পাশে দাঁড়ানো, সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং একটি নিরাপদ পথ তৈরি করা।
কারণ প্রতিটি শিশুরই সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।
মোঃ তানজিমুল ইসলাম 




















